একটি শোনা হাদিসের ব্যাপারে জানতে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি একটি হাদিস শুনলাম এমন যে-
আয়েশা রাঃ একটি পাত্র থেকে খেজুর খেতেন,একদিন উনি ভাবলেন কতটুকু খেজুর আছে তা দেখি।যখন দেখলেন এরপর নবী সাঃ বললেন,আয়েশা রাঃ যদি পাত্র না দেখতেন তাহলে সারাজীবন এখান থেকে খেতে পারতেন
১)এটা কি সহীহ?
২)এটা যদি সহীহ হয় তাহলে আমাদের জন্যও কিও সেইম হবে?
যেমন টাকা জমানোর পর যখন খরচ করবো তখন হিসেব না করা কত বাকি আছে?
বা বাজার করার পরও?
Answer
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين
প্রিয় প্রশ্নকারী বোন,
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি যে হাদীসটি শুনেছেন, তা মুসলিম সমাজে বেশ প্রচলিত। নিচে এর বিশুদ্ধতা ও ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ পেশ করা হলো।
১. হাদীসটির সনদ ও বিশুদ্ধতা
আপনি উল্লেখিত হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, হাদীসটি বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হলেও এর সনদ দুর্বল (যঈফ) ।
-
বর্ণনা সূত্র:
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) তার মুসনাদ-এ, ইমাম বায়হাকী শু‘আবুল ঈমান-এ এবং ইমাম তাবরানী মু‘জামুল আওসাত-এ এটি বর্ণনা করেছেন।
কিন্তু সনদে আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াযীদ ও ইবনে লাহী‘আহ-এর মতো দুর্বল রাবী রয়েছেন।
ইমাম যাহাবী (রহঃ) ও ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহঃ) সহ অধিকাংশ মুহাদ্দিসীন এ হাদীসকে যঈফ বলেছেন।
(মুসনাদে আহমাদ, ৬/২৬০; তালখীসুল হাবীর, ৪/৩৬৬) -
মূল হাদীসের ভাষা:
"عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: كَانَ لِي غُرَارَةٌ فِيهَا تَمْرٌ، فَكُنْتُ آكُلُ مِنْهَا، فَنَظَرْتُ ذَاتَ يَوْمٍ فَإِذَا هِيَ نِصْفٌ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَوْ لَمْ تَنْظُرِي لَأَكَلْتِ مِنْهَا حَتَّى تَمُوتِي"
(অর্থ: আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমার একটি পাত্র ছিল যাতে খেজুর ছিল। আমি তা থেকে খেতাম। একদিন দেখলাম তা অর্ধেক হয়ে গেছে। নবী (সাঃ) বললেন: তুমি যদি না দেখতে, তাহলে মৃত্যু পর্যন্ত তা থেকে খেতে পারতে।) -
গবেষণা:
ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম তিরমিযী—কেউই এ হাদীসটি তাদের কিতাবে আনেননি।
ইমাম নববী (রহঃ) আল-আযকার-এ এ হাদীসকে সনদের দিক থেকে দুর্বল বলেছেন।
শায়খ আলবানী (রহঃ) সিলসিলাতুল আহাদীসিয যয়ীফাহ (হাদীস নং ১২৭১)-এ একে মাউযূ‘ (জাল) বলেছেন।
কাজেই হাদীসটি সহীহ নয়; বরং যঈফ বা দুর্বল।
২. হাদীসটি সহীহ হলে আমাদের জন্য কী শিক্ষা?
যদিও সনদের দিক থেকে হাদীসটি সহীহ নয়, তবুও এর মর্মার্থ ও শিক্ষা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে এটি কোনো ফিকহী হুকুম বা আমলকে প্রভাবিত করে না।
-
হাদীসের শিক্ষা:
এখানে রিযিকের প্রতি তাওয়াক্কুল (ভরসা) ও কম্পিউটেশনাল হিসাব-নিকাশের প্রতি অনাগ্রহ বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহর দেয়া রিযিকের উপর বিশ্বাস রাখা এবং অহেতুক হিসেব-নিকেশ করে উদ্বিগ্ন না হওয়া। -
আমাদের জন্য প্রযোজ্যতা:
-
টাকা জমানো বা বাজার করার পর হিসেব রাখা জায়েয:
ইসলামে সম্পদের হিসেব-নিকাশ করা নিষিদ্ধ নয়; বরং প্রশংসনীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:"وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا"
(সূরা বাকারা, ২:২৭৫)
অর্থনৈতিক লেনদেন ও সম্পদের হিসাব রাখা ইসলামী শরী‘আতের অনুমোদিত। -
তবে সম্পদের প্রতি অতি-আসক্তি না রাখা:
হাদীসের শিক্ষা হলো, কেবল সম্পদের সংখ্যা ও পরিমাণ নিয়ে ব্যস্ত না থেকে আল্লাহর উপর ভরসা করা। ইমাম গাযযালী (রহঃ) ইহইয়া উলুমিদ্দীন-এ বলেন:"الْحِرْصُ عَلَى حِسَابِ الدُّنْيَا يُذْهِبُ الْبَرَكَةَ"
(দুনিয়ার হিসেব-নিকেশের লোভ বরকত নষ্ট করে) -
প্র্যাকটিক্যাল উদাহরণ:
আপনি যদি টাকা জমানোর পর খরচ করার সময় কত বাকি আছে তা গণনা করেন, তাহলে তা নাজায়েয নয়, বরং বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। কিন্তু যদি এই গণনা আপনাকে আল্লাহর উপর থেকে ভরসা কমিয়ে দেয় এবং উদ্বিগ্ন করে তোলে, তাহলে তা নিন্দনীয়।
-
সারসংক্ষেপ (সংক্ষেপে)
- হাদীসটি সহীহ নয়; যঈফ ও বিতর্কিত।
- এর শিক্ষা: আল্লাহর রিযিকের উপর ভরসা রাখা ও অহেতুক হিসেব-নিকেশে মগ্ন না হওয়া।
- আমাদের জন্য:
- সম্পদের হিসেব রাখা জায়েয ও উত্তম।
- কিন্তু সম্পদের প্রতি লোভ ও অতিরিক্ত মোহ ইসলামে নিষিদ্ধ।
- টাকা জমানোর পর বা বাজার করার পর হিসেব রাখলে কোনো সমস্যা নেই; বরং তা ভালো অভ্যাস।
শেষ কথা:
হাদীসের নামে প্রচলিত অনেক কথাই সনদের দিক থেকে দুর্বল। তাই কোনো হাদীস শুনলে সহীহ গ্রন্থ (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ) ও নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিসদের মতামত যাচাই করা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন।
(আমীন)