ফরজে কেফায়া কী? ইসলামের দাওয়াত দেওয়া কি ফরজে কেফায়া?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আপু ফরজে কেফায়া যে বললো যে ফরজ কিছু লোক আদায় করলেই সকলের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়।আর এক জন ও না করলে গুনাহগার হয় সকলে।
তাহলে এখানে যেমন উদাহরণ দিয়েছে জানাজার তেমন ই কি ইসলামের দাওয়াত দেয়াটা ফরজে কেফায়া হবে???আপু তাহলে আমাদের মেয়েদের মধ্যে অনেকে দাওয়াতি কাজ করে আলহামদুলিল্লাহ।কিন্তু আমি বাইরে গিয়ে এটা করতে চাচ্ছিনা আপু যেহেতু আমার আরো বোনেরা বা আন্টিরা দাওয়াতি এর কাজ করছেন আলহামদুলিল্লাহ। তাহলেতো আমার দাওয়াত না দিলেও গুনাগার হবোনা তাইনা আপু???যেহেতু এটাও ফরজে কেফায়া।
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রথমেই ফরজে কেফায়া (فرض كفاية) এর পরিচয় জেনে নেওয়া জরুরি।
ইসলামি পরিভাষায়, ফরজে কেফায়া এমন একটি দায়িত্ব যা কিছু সংখ্যক মুসলিম আদায় করলে সকলের পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায়। কিন্তু যদি কেউই তা আদায় না করে, তাহলে সবাই গুনাহগার হয়। আর যদি অন্তত কিছু লোক তা আদায় করে, তবে বাকিদের থেকে দায়িত্ব সরে যায় এবং তারা গুনাহগার হয় না।
উদাহরণ: জানাজার নামাজ, জিহাদ, ইলমে দ্বীন অর্জন, ইসলামি শাসন ব্যবস্থা ইত্যাদি।
১. ইসলামের দাওয়াত দেওয়া কি ফরজে কেফায়া?
হ্যাঁ, ইসলামের দাওয়াত (تبليغ و دعوة) সাধারণভাবে একটি ফরজে কেফায়া।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
(سورة آل عمران: 104)
“আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা কল্যাণের দিকে ডাকবে, সৎকাজের আদেশ দেবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে; আর তারাই সফলকাম।”
এই আয়াতে ‘মিনকুম’ (তোমাদের মধ্যে) শব্দটি ইঙ্গিত করে যে, দাওয়াতের কাজ সবার ওপর ফরজে আইন নয়, বরং একটি দলের ওপর ফরজে কেফায়া। যদি একটি দল এই দায়িত্ব পালন করে, তবে বাকিরা দায়মুক্ত হয়।
হাদিসেও এসেছে:
بَلِّغُوا عَنِّى وَلَوْ آيَةً
(صحيح البخاري: 3461)
“আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও।”
তবে এটি প্রত্যেকের সামর্থ্য অনুযায়ী। দাওয়াতের বিভিন্ন স্তর আছে: মুখে বলা, লেখা, আচরণের মাধ্যমে দেখানো, অথবা অর্থ দিয়ে সাহায্য করা ইত্যাদি।
২. আপনার অবস্থার বিশ্লেষণ
আপনি বলছেন যে, আপনার বোনেরা ও আন্টিরা ইতিমধ্যেই দাওয়াতি কাজ করছেন। তাহলে প্রশ্ন হলো: তাদের কাজ কি এতটাই যথেষ্ট যে, আপনার ওপর থেকে দায়িত্ব সরে গেছে?
এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য করতে হবে:
ক. দাওয়াতের ক্ষেত্র ও পরিধি
দাওয়াত শুধুমাত্র বাইরে গিয়ে প্রচার করা নয়। বরং:
- নিজের পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে দাওয়াত দেওয়া,
- নিজের জ্ঞানের আলোতে সঠিক পথ দেখানো,
- বই-পুস্তক, সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদির মাধ্যমে দাওয়াত,
- নিজের আচরণ ও চরিত্রের মাধ্যমে দ্বীনকে তুলে ধরা।
এগুলো সবই দাওয়াতের অন্তর্ভুক্ত।
খ. আপনার ওপর ব্যক্তিগত দায়িত্ব
যদি আপনার বোনেরা এবং আন্টিরা দাওয়াতের কাজ করেন, তবুও আপনার জন্য সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকা উচিত নয়। দাওয়াত ফরজে কেফায়া হলেও, শুধু ‘অন্যরা করছে’ বলে নিজে একেবারে না করা নিরাপদ নয়। কারণ:
-
দাওয়াতের ফরজে কেফায়া তখনই সবার ওপর থেকে সরে যাবে, যখন পর্যাপ্ত সংখ্যক লোক তা আদায় করছে। কিন্তু সেই পর্যাপ্ততা নির্ধারণের ব্যাপারটি স্থান, সময় ও প্রয়োজনের ওপর নির্ভরশীল। যদি দেখা যায় যে, দাওয়াতের কাজ প্রয়োজনের তুলনায় কম হচ্ছে, তাহলে আপনার ওপরও তা আবশ্যক হতে পারে।
-
প্রত্যেক মুসলমানের ওপর নিজের সাধ্যমতো দ্বীনের শিক্ষা গ্রহণ ও অন্যদেরকে জানানোর চেষ্টা করা জরুরি। এটি ফরজে আইনের কাছাকাছি।
গ. মহিলাদের জন্য দাওয়াতের পদ্ধতি
মহিলাদের জন্য বাইরে গিয়ে দাওয়াত দেওয়া জরুরি নয়, বিশেষ করে যদি তা পর্দা ও শারঈ বিধানের পরিপন্থী হয়। বরং তারা নিজেদের স্বাভাবিক আওতায়—অর্থাৎ ঘর, আত্মীয়-স্বজন, মহিলাদের মজলিস ইত্যাদিতে দাওয়াত দিতে পারেন। আপনি যদি বাইরে যেতে অস্বস্তি বোধ করেন, তাহলে ঘরে বসেই অনলাইন বা অন্যান্য মাধ্যমে দাওয়াত দিতে পারেন।
ঘ. গুনাহ থেকে বাঁচার শর্ত
শুধু এই কারণে যে, অন্যরা দাওয়াত দিচ্ছেন, আপনি সম্পূর্ণ গুনাহমুক্ত হবেন যদি আপনার নিকট দায়িত্ব ফরজে কেফায়ার স্তরে থাকে। কিন্তু মনে রাখবেন, কখনো কখনো দাওয়াত আপনার ব্যক্তিগত ফরজে আইন হতে পারে—যেমন আপনার পরিবার, বাবা-মা, ভাই-বোনদের প্রতি দাওয়াত দেওয়া। সেটি অন্যরা দিলেও আপনার দায়িত্ব থেকে যায়। হাদিসে এসেছে:
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
(صحيح البخاري: 893, صحيح مسلم: 1829)
“তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।”
সুতরাং আপনার নিকটাত্মীয় ও পরিচিতদের মধ্যে দাওয়াতের কাজ যদি যথাযথভাবে হচ্ছে, তাহলে আপনি নিশ্চিন্ত হতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি জানেন যে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা এলাকায় দাওয়াতের প্রয়োজন আছে এবং অন্য কেউ সেটি করছে না, তাহলে আপনার জন্য চেষ্টা করা কর্তব্য।
৩. হানাফি ফিকহের আলোকে দিকনির্দেশনা
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে ‘আমর বিল মা’রুফ ও নাহি আনিল মুনকার’কে ফরজে কেফায়া গণ্য করা হয়েছে। ইবনে আবেদিন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’ (২য় খণ্ড, ৪৭৪ পৃষ্ঠা) এ বলেন:
وَأَمَّا الْأَمْرُ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّهْيُ عَنِ الْمُنْكَرِ فَفَرْضُ كِفَايَةٍ لِقَوْلِهِ تَعَالَى (وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ)
“আর সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা ফরজে কেফায়া, আল্লাহর বাণীর কারণে: ‘তোমাদের মধ্যে একটি দল থাকুক…’”
ইমাম কাসানী (রহ.) ‘বাদায়িউস সানায়ি’ গ্রন্থেও একই কথা উল্লেখ করেছেন।
তবে ইমামগণ আরও বলেন, যদি কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বিদআত বা পাপাচার ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানে পর্যাপ্ত দাওয়াতি কাজ না হয়, তাহলে সেখানকার অধিবাসীদের ওপর দাওয়াত দেওয়া ফরজে আইন হয়ে যেতে পারে।
৪. আপনার জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ
১. নিজের ঘর ও পরিবার থেকে শুরু করুন। আপনার স্বামী, সন্তান, ভাই-বোন, বাবা-মা—যারা আপনার নিকট, তাদের দ্বীনের শিক্ষা দেওয়া আপনার ওপর ফরজে আইন। এই দায়িত্ব অন্যদের কারণে সরে যায় না।
২. অনলাইনে বা লিখিতভাবে দাওয়াত দিন। বাইরে যেতে না চাইলে আপনি সামাজিক মাধ্যম, ব্লগ বা ফোনের মাধ্যমেও দাওয়াত দিতে পারেন। এতে পর্দার সমস্যাও নেই।
৩. জ্ঞান অর্জন চালিয়ে যান। দাওয়াতের জন্য নিজেকে যোগ্য করে তুলতে ইলম শিখুন। এটি আপনার ওপর ফরজে আইন (যেটুকু দৈনন্দিন জীবনে লাগে)।
৪. নিজের নিয়ত শুদ্ধ করুন। দাওয়াত দেওয়া একটি ইবাদত। শুধু গুনাহ থেকে বাঁচার জন্যই নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য চেষ্টা করুন।
৫. অন্য বোনদের কাজকে উৎসাহিত করুন। আপনি যদি সরাসরি দাওয়াত না-ও দেন, তবে তাদের কাজে সহযোগিতা করা, অর্থ দিয়ে সাহায্য করা, অথবা তাদের জন্য দোয়া করাও দাওয়াতের অংশ।
৫. চূড়ান্ত ফয়সালা
➡ হ্যাঁ, ইসলামের দাওয়াত সাধারণভাবে ফরজে কেফায়া।
➡ যদি আপনার এলাকায় বা আপনার পরিচিত মহলে পর্যাপ্ত দাওয়াতি কাজ চলছে, এবং আপনি নিজের পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের দায়িত্ব পালন করছেন, তাহলে বাইরে গিয়ে দাওয়াত না দিলে আপনার গুনাহ হবে না—ইনশাআল্লাহ।
➡ তবে আপনি যদি শুধু ‘অন্যরা করছে’ এই ভেবে নিজেকে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত মনে করেন, তাহলে সতর্ক থাকা উচিত। বিশেষ করে আপনার নিকটস্থ ব্যক্তিদের জন্য দাওয়াত দেওয়া আপনার ব্যক্তিগত দায়িত্ব।
➡ একজন মুসলিম হিসেবে নিজের সাধ্যমতো দাওয়াতের চেষ্টা করা উত্তম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
(سورة التغابن: 16)
“অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো।”
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান ও আমল করার তাওফিক দিন। আমিন।
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত হানাফি কিতাব:
- আল-হিদায়া
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন)
- বাদায়িউস সানায়ি (কাসানী)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী)
- তাফসীরে মা’রিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)