ব্যাংকের জব কি হারাম?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2788
Questioner: Jannat
Question Asked: 17 Jul 2026, 12:37 AM
Reviewed & Published: 17 Jul 2026, 02:56 AM
Views: 42
Tokens: 5,573
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম, এক বোনের হয়ে প্রশ্ন করা
উনি আলহামদুলিল্লাহ দ্বীন মেনে চলার চেষ্টা করেন, উনার পরিবার প্রায় দেড় বছর ধরে উনার বিয়ের চেষ্টা করছেন। ম্যাক্সিমাম প্রোপোজাল ব্যাংকার আসায় উনি এত দিন ধরে এ ধরনের প্রস্তাবে সম্মতি দেন নি। উনার পড়াশুনা শেষ।বয়স বাড়ছে, উনি জবও করবেন না। এ বিষয়গুলো নিয়েও উনার ফ্যামিলি বেশ চিন্তিত।

এমতাবস্থায়, সোনালী ব্যাংক এর সিনিয়র অফিসার এমন পাত্রকে বিয়ে করা ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক কি না? তার ইনকাম কি হারাম হবে? ছেলে পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে।

Answer

প্রশ্নের উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত। ইসলামের দৃষ্টিতে পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি বিবেচনা করতে হয় তা হলো দ্বীনদারি ও নৈতিক চরিত্র। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَأَنْكِحُوهُ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ كَبِيرٌ “যখন তোমাদের কাছে এমন কেউ (বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে) আসে, যার দ্বীনদারি ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তবে তাকে বিয়ে দাও। যদি তা না করো, তাহলে জমিনে ফিতনা ও বড় ফাসাদ সৃষ্টি হবে।”
[সুনান আত-তিরমিযী, হাদীস: ১০৮৪; ইবনে মাজাহ, হাদীস: ১৯৬৭]

এখানে পাত্রের নিয়মিত নামাজ পড়া একটি বড় ইতিবাচক দিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তিনি সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার; তার উপার্জন (ইনকাম) কী হালাল নাকি হারাম? এবং এই উপার্জন যদি হারাম হয়, তাহলে এই পাত্রকে বিয়ে করা কতটুকু জায়েজ?


১. ব্যাংক চাকুরির শরয়ী হুকুম

সুদের (রিবা) সাথে জড়িত প্রচলিত সুদি ব্যাংকে চাকরি করা হারাম ও বড় গুনাহের কাজ। কুরআন-হাদীসে সুদের সাথে জড়িত সকলকে কঠোরভাবে নিন্দা ও অভিশাপ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।”
[সূরা আল-বাকারা: ২৭৮]

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَعَنَ اللَّهُ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ “আল্লাহ লানত করেছেন সুদখোরকে, সুদ দাতাকে, তার লেখককে এবং তার দুই সাক্ষীকে।”
[সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৫৯৮]

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, এমন কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করা জায়েজ নয় যার অধিকাংশ কারবারই হারাম। সুদি ব্যাংকের পুরো ব্যবসাই রিবার উপর ভিত্তি করে চলে, সেখানে যে কোনো পদে চাকরি করা (অতি প্রয়োজন বা বৈধ বিকল্প না থাকলে) জায়েজ নয়। ফাতাওয়া উসমানী, ইমদাদুল ফাতাওয়া ও রদ্দুল মুহতার-এ এই মতই প্রতিষ্ঠিত।

“ব্যাংকে চাকরি করা মৌলিকভাবে নাজায়েজ এবং হারাম, যদি ব্যক্তি নিজে সরাসরি সুদের লেনদেন না-ও করে, কারণ সে সুদের ব্যবস্থার একটি অংশ।”
[ফাতাওয়া উসমানী, জিফ: ২/৪৪৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৭০]

তবে যদি কেউ এমন বিভাগে কাজ করে যেখানে সরাসরি সুদের লেনদেন বা তার সহায়তা নেই (যেমন: পিওন, নিরাপত্তা প্রহরী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, অথবা এমন আইটি বিভাগ যা সুদের কাজের সাথে সরাসরি জড়িত নয়), এবং তার বেতনও ব্যাংকের সামগ্রিক হারাম অর্থ থেকে না হয়ে পৃথক খাতে বরাদ্দ হয়, তাহলে সেটি জায়েজ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সিনিয়র অফিসার এমন দায়িত্বে থাকলে তা সাধারণত গ্রাহকের লোন/ডিপোজিট ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত, যা রিবা থেকে মুক্ত নয়। তাই তার ইনকাম প্রধানত হারাম বলেই গণ্য হবে।


২. হারাম ইনকামকারী পাত্রকে বিয়ে করার বিধান

ইসলাম পাত্র নির্বাচনে ইনকামের হালাল হওয়াকে অপরিহার্য শর্ত করে না—প্রধান শর্ত হলো দ্বীনদারি ও চরিত্র। তবে এই দ্বীনদারির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হালাল উপার্জন ও হারাম থেকে বিরত থাকা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

كُلُّ لَحْمٍ نَبَتَ مِنْ سُحْتٍ فَالنَّارُ أَوْلَى بِهِ “যে গোশত হারাম (মাল) থেকে উৎপন্ন হয়, তার জন্য জাহান্নামই বেশি উপযুক্ত।”
[মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ২৪২৭]

তাই যদি পাত্র তার বর্তমান ব্যাংক চাকরিকে হারাম বলে স্বীকার করে এবং ছাড়ার দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করে, অথবা কিছুদিনের মধ্যে চাকরি ছেড়ে হালাল পেশায় চলে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে তাকে দ্বীনদার (যেহেতু নামাজ পড়ে) এবং এ বিষয়ে সচেতন ও অনুতপ্ত বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে তাকে বিয়ে করা জায়েজ হবে। কিন্তু যদি তিনি এই চাকরিকেই হালাল মনে করেন (কারণ দেশের চাকরি বা সংসার চালানোর প্রয়োজন ইত্যাদি) এবং ছাড়ার কোনো ইচ্ছা না রাখেন, তাহলে বিয়ে করা মাকরূহ ও উচিত নয়। কারণ এতে স্ত্রীও হারাম উপার্জনের অংশীদার হবে এবং বংশধরও হারাম মালে লালিত-পালিত হবে।

“যে ব্যক্তি জেনে শুনে হারাম উপার্জন করে এবং তাতে প্রতিবাদ করে না, অথচ তাকে বিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে এ বিবাহ ফাসিকের সাথে বিবাহের মধ্যে গণ্য হবে, যা উপযুক্ত নয়।”
[ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৮০; বাহিশ्तি জেওর, বিবাহ অধ্যায়]

তবে মোটামুটি ফিকাহবিদদের মতে, গুনাহগার হলেও মুসলমান বিবাহ বাতিল হয় না। হারাম ইনকামকারীকে বিয়ে দিলে বিবাহ বৈধই হবে, কিন্তু স্ত্রী ও সন্তানের জন্য তা ক্ষতিকর এবং দায়িত্বশীলতা থেকে দূরে থাকাই উত্তম।


৩. ব্যবহারিক পরামর্শ (মাসয়ালার বাইরে)

১. পাত্র সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানুন: তিনি কি ব্যাংকের কাজকে হালাল মনে করেন? ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা আছে কি? যদি ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা থাকে এবং বাস্তব প্রচেষ্টাও চালিয়ে যান (যেমন: অন্য চাকরির চেষ্টা করছেন), তাহলে তাকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

২. তাকে দ্বীনের দাওয়াত দিন: তার ব্যাংক চাকরি যে হারাম এবং তা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি—এ সম্পর্কে কুরআন-হাদীসের দলিলসহ বোঝানোর চেষ্টা করুন। নামাজ পড়ে, কাজেই তিনি দ্বীনের ব্যাপারে উদাসীন নন; বোঝালে আশা করা যায় পরিবর্তন করবেন।

৩. বিকল্প পাত্রের সন্ধান চালিয়ে যান: সুদি ব্যাংকে কাজ করেন না এমন পাত্রও পাওয়া সম্ভব। বোনের বয়স বাড়লেও ধৈর্য ধরা উত্তম। আল্লাহ উত্তম বিনিময় দেবেন।

৪. নিজে জব করবেন না—এই সিদ্ধান্ত সম্মানজনক ও প্রশংসনীয়। ইসলামে নারীর জন্য উপার্জন ফরজ নয়; বরং পাত্রের দ্বীনদারি ও হালাল রিজিকই মুখ্য।


৪. সিদ্ধান্ত

সংক্ষেপে:

  • সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পাত্রের বর্তমান উপার্জন স্পষ্টত হারাম (যদি তাঁর কাজ সরাসরি সুদের সাথে জড়িত থাকে)।
  • তাকে বিয়ে করা জায়েজ, তবে তিনি যদি চাকরি ছাড়তে রাজি না হন বা এটাকে হালাল মনে করেন, তাহলে বিয়ে না করাই উত্তম
  • বিয়ে করলে স্ত্রী-সন্তানও সেই হারাম মালের ভাগীদার হবে এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে পরিবারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
  • বোনের জন্য পরামর্শ: ধৈর্য ধরে আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করুন, দ্বীনদার ও হালাল উপার্জনকারী পাত্র পান (অথবা বর্তমান পাত্রকে ব্যাংক ছাড়ার শর্ত দিন)।

“আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য (উত্তীর্ণ হওয়ার) পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।”
[সূরা আত-তালাক: ২-৩]

আল্লাহ তাআলা দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন এবং উত্তম পাত্রের সন্ধান দান করুন। (আমিন)

রেফারেন্স:

  • কুরআন: সূরা আল-বাকারা (২৭৫-২৭৯)
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) – ৪/১৭২-১৭৩ (ব্যাংক ও সুদি লেনদেন)
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী) – ২/৪৪৫; ৩/১৫২
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) – ৪/২৭০-২৭১
  • বাহিশ্তি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) – বিবাহ অধ্যায়, “পাত্র নির্বাচনের খেয়াল”
  • আল-হিদায়া (মারগীনানী) – ৩/২৪৬ (রিবা বিষয়ক)
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) – ১/২৮০


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.