সমসাময়িক ইনডোর কার্ড গেমস খেলার শরয়ী বিধান প্রসঙ্গে
Halal and Haram · Hanafi
Question
মুহতারাম ওলামায়ে কেরাম ও মুফতি সাহেব দ্বীন, আশা করি আল্লাহর রহমতে ভালো আছেন। আমি একজন ইলমে দ্বীনের শিক্ষার্থী। বর্তমান সময়ের তরুণ ও কিশোরদের মাঝে বহুল প্রচলিত কিছু ইনডোর কার্ড গেমসের শরয়ী বিধান হানাফি ফিক্বহের আলোকে বিস্তারিত জানতে চাচ্ছিলাম।
গেমগুলোর ধরণ ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. UNO (ইউনো): এটি মূলত রঙ (Color) এবং সংখ্যা (Number) মেলানোর একটি খেলা। এতে সাধারণ তাসের (যেমন: ইস্কাপন, হরতন ইত্যাদি) মতো ঐতিহ্যবাহী জুয়ার কোনো প্রতীক থাকে না এবং সাধারণত জুয়াড়িরা এটি জুয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে না।
২. Pokémon (পোকেমন): এটি কার্টুন ও ভিডিও গেমের বিভিন্ন চরিত্রের ছবিযুক্ত কার্ড। এই কার্ডগুলোতে বিভিন্ন চরিত্রের কাল্পনিক অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা এবং বিবর্তন (Evolution)-এর মতো কিছু থিম থাকে। এছাড়া এর 'বুস্টার প্যাক' ক্রয়ের ক্ষেত্রে এক ধরণের অনিশ্চয়তা (Gharar) থাকে, যেখানে টাকা দিয়ে প্যাকেট কিনলেও ভেতরে কী কার্ড আছে তা আগে থেকে জানা যায় না।
এই প্রেক্ষাপটে মুহতারামের কাছে আমার সুনির্দিষ্ট প্রশ্নসমূহ:
ক. এই খেলাগুলো যদি সম্পূর্ণ জুয়া, বাজি বা কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন ছাড়া, স্রেফ ঘরোয়া পরিবেশে বিনোদন বা সময় কাটানোর জন্য খেলা হয়, তবে হানাফি ফিক্বহ অনুযায়ী এর হুকুম কী হবে? এটি কি 'মুবাহ' (বৈধ) নাকি 'মাকরূহে তাহরিমি'র অন্তর্ভুক্ত হবে?
খ. পোকেমন কার্ডের ভেতরের কাল্পনিক ক্ষমতার ছবি/ধারণা এবং বুস্টার প্যাক কেনার ক্ষেত্রে যে অনিশ্চয়তা থাকে, তার কারণে এর কেনাবেচা ও খেলার বিধান কী?
গ. হানাফি ফিক্বহের 'লাহব ও লাইব' (অনর্থক কাজ) এবং জুয়াড়িদের চিরাচরিত অভ্যাসের সাথে সাদৃশ্যের (তাশাব্বুহ) যে মূলনীতি রয়েছে, তা এই আধুনিক গেমগুলোর ক্ষেত্রে কতটুকু এবং কীভাবে প্রযোজ্য হবে?
অনুগ্রহ করে নির্ভরযোগ্য ফিক্বহী গ্রন্থের স্পষ্ট রেফারেন্সসহ (যেমন: রদ্দুল মুহতার/হিদায়া ইত্যাদি) মাসআলাটি বুঝিয়ে দিলে অত্যন্ত উপকৃত হতাম।
জাজাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি বর্তমান সময়ের তরুণদের মধ্যে বহুল প্রচলিত দুটি ইনডোর কার্ড গেম (UNO ও Pokémon) সম্পর্কে হানাফি ফিক্বহের আলোকে বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন। নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর কুরআন, হাদিস ও নির্ভরযোগ্য হানাফি গ্রন্থের রেফারেন্সসহ দেওয়া হলো।
প্রশ্ন (ক): UNO ও Pokémon—জুয়া, বাজি বা আর্থিক লেনদেন ছাড়া শুধু বিনোদনের জন্য খেলা হলে হুকুম কী? মুবাহ না মাকরূহে তাহরিমি?
উত্তর:
হানাফি ফিক্বহে খেলা-ধুলার মূলনীতি হলো—যে খেলা সম্পূর্ণরূপে জুয়া, বাজি, বা এমন কোনো উপাদানমুক্ত যা শরিয়তে নিষিদ্ধ (যেমন: আনিমেট ছবি, মূর্তি, অশ্লীলতা, গান-বাজনা), এবং যা ধর্মীয় দায়িত্ব (নামাজ, রোজা ইত্যাদি) থেকে বিরত না রাখে ও সময় নষ্ট না করে, তাহলে তা সাধারণত মুবাহ (বৈধ) বলে গণ্য হয়। তবে যদি খেলাটি এমন হয় যা জুয়াড়িদের চিরাচরিত অভ্যাসের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ (তাশাব্বুহ) বা লাহব ও লাইব (অনর্থক কাজ) হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে তা মাকরূহে তাহরিমি বা নিষিদ্ধের কাছাকাছি হতে পারে।
UNO:
- UNO মূলত রঙ ও সংখ্যা মিলানোর একটি খেলা। এর কার্ডে কোনো প্রাণীর ছবি বা জুয়ার ঐতিহ্যবাহী প্রতীক (যেমন ইস্কাপন, হরতন) নেই এবং এটি সাধারণত জুয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় না।
- অর্থহীন সময় কাটানোর এবং কখনো কখনো অন্যকে বিরক্ত করার বা প্রতারণার উপকরণ হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হতে পারে, কিন্তু যদি তা থেকে বিরত থাকা হয় এবং তা নামাজ-রোজা থেকে গাফিল না করে, তবে এটি মুবাহ।
- তবে হানাফি ফিক্বহের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—যে কোনো খেলা যদি জুয়ার সাদৃশ্য রাখে, তাহলে তা অর্থহীন হলেও মাকরূহে তাহরিমি হয়ে যায় (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৫)। UNO-তে ভাগ্যের (chance) প্রভাব থাকায় এবং এটি তাসের মতো খেলার উপকরণ হওয়ায় কিছু ফকীহ এটিকে মাকরূহ বলেছেন। কিন্তু সাধারণত UNO-কে জুয়াড়িরা ব্যবহার করে না বলে মুবাহ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা।
- উত্তম হলো, এটি খুব সীমিত আকারে এবং বিশেষ প্রয়োজন না থাকলে পরিহার করা।
Pokémon:
- Pokémon কার্ডে বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্রের ছবি (যা প্রাণীর মতো দেখতে) এবং বিবর্তন (Evolution) ও অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার ধারণা রয়েছে। হানাফি ফিক্বহে যে কোনো প্রাণীর ছবি আঁকা বা রাখা সাধারণত হারাম (তবে ছোট শিশুর খেলনার জন্য কিছু শিথিলতা আছে, কিন্তু তা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রযোজ্য নয়) (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩৩৪; রদ্দুল মুহতার, ১/২৭৮)।
- তাছাড়া ‘বুস্টার প্যাক’ কেনার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা (ঘারার) স্পষ্টতই জুয়া ও লটারির মতো। আর ঘারারযুক্ত লেনদেন হারাম (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৯৪; আল-হিদায়া, ৩/৭৫)।
- তাই Pokémon কার্ড খেলা হারাম বা ন্যূনতমপক্ষে মাকরূহে তাহরিমি। তবে যদি কোনো শিশু শুধু ছবি দেখার জন্য বা খেলার জন্য এটি ব্যবহার করে এবং এতে জুয়া বা ঘারার না থাকে, তবে ছবির হারামের কারণে তা এখনও নাজায়েজ।
সারসংক্ষেপ:
- UNO (জুয়া ও বাজিহীন, শুধু ঘরোয়া বিনোদন): মুবাহ (কিন্তু সতর্কতা হিসেবে মাকরূহ তানজিহি হতে পারে)।
- Pokémon: হারাম/মাকরূহে তাহরিমি (ছবি ও ঘারার কারণে)।
প্রশ্ন (খ): Pokémon কার্ডের কাল্পনিক ক্ষমতা ও বুস্টার প্যাকের ঘারার কারণে কেনাবেচা ও খেলার বিধান কী?
উত্তর:
কেনাবেচা:
- বুস্টার প্যাকের ভেতরে কী কার্ড আছে তা আগে থেকে জানা যায় না। এটি একটি স্পষ্ট ঘারার (অনিশ্চয়তা) যা জুয়া (মাইসির)-এর অন্তর্ভুক্ত। হানাফি ফিক্বহে ‘মাজহুল’ (অজানা) বস্তু বা ‘ঘারার’যুক্ত বেচাকেনা নাজায়েজ ও ফাসিদ (রদ্দুল মুহতার, ৪/১৯২; আল-হিদায়া, ৩/৭৫)। তাই বুস্টার প্যাক কেনাবেচা জায়েজ নয়।
- পৃথক কার্ড কেনাবেচা (যেখানে নির্দিষ্ট কার্ড নির্ধারিত) এবং মূল্য নির্ধারিত হলে তা জায়েজ হবে, তবে কার্ডের ছবি থাকায় তা কবজা করা উচিত নয়।
খেলা:
- যেহেতু বুস্টার প্যাক কেনায় ঘারার ও জুয়ার উপাদান রয়েছে এবং খেলার উদ্দেশ্যে কার্ড সংগ্রহ করলেও তা সেই পথে পরিচালিত হয়, তাই এই কার্ড দিয়ে খেলা হারাম।
- এমনকি বিনা লেনদেনে শুধু খেলার জন্যও ছবির কারণে তা নাজায়েজ। হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি কোনো ছবি তৈরি করবে, কিয়ামতের দিন তাকে তাতে প্রাণ সঞ্চার করতে বাধ্য করা হবে, অথচ সে কখনো তা পারবে না” (সহিহ বুখারি, ২২৮৯)।
সিদ্ধান্ত:
- Pokémon কার্ডের কেনাবেচা ও খেলা—উভয়ই হারাম বা নাজায়েজ।
প্রশ্ন (গ): ‘লাহব ও লাইব’ ও ‘তাশাব্বুহ’র মূলনীতি এই গেমগুলোর ক্ষেত্রে কতটুকু প্রযোজ্য?
উত্তর:
হানাফি ফিক্বহে লাহব ও লাইব (অর্থহীন খেলা-ধুলা) এবং তাশাব্বুহ বিল ফুজ্জার (পাপী ও জুয়াড়িদের সাদৃশ্য গ্রহণ) দুটি পৃথক ধারণা, যা আধুনিক গেমের বিধান নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
১. লাহব ও লাইব (Frivilous Activity):
- হানাফি ফকীহগণ বলেছেন, যে কোনো কাজ যা সম্পূর্ণরূপে অর্থহীন এবং ধর্মীয় বা জাগতিক কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না, তা মাকরূহে তাহরিমি (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১৮৮)। তবে এটি তখনই প্রযোজ্য যখন খেলাটি অনর্থক সময়ক্ষেপণের বাইরেও কোনো অপকার বা অন্যায়ের দিকে নিয়ে যায়।
- UNO ও Pokémon উভয়ই সাধারণত বিনোদনের মাধ্যম। কিন্তু যদি এগুলো আসক্তিতে পরিণত হয় এবং নামাজ, পড়ালেখা ইত্যাদি থেকে বিরত রাখে, তবে ‘লাহব’এর আওতায় তা হারাম।
২. তাশাব্বুহ (Resemblance to Gamblers):
- ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেছেন, “জুয়াড়িরা যে উপকরণ ও পদ্ধতি ব্যবহার করে, সেগুলো ব্যবহার করলেও যদি জুয়া না হয়, তবুও তা মাকরূহ কারণ এটি তাদের সাদৃশ্যপূর্ণ” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৫)।
- UNO: তাসের মতোই খেলার কারণে এটি জুয়াড়িদের সাদৃশ্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা আছে, কিন্তু আধুনিক প্রেক্ষাপটে UNO জুয়ার সরঞ্জাম নয়, তাই তাশাব্বুহর প্রভাব কম। তবে কিছু ফকীহ একে মাকরূহ বলেছেন এবং সতর্কতা অবলম্বন করা ভালো।
- Pokémon: বুস্টার প্যাক খোলার পদ্ধতি (র্যান্ডম পুরস্কার) সরাসরি জুয়া ও লটারির সাদৃশ্যপূর্ণ। এটি স্পষ্ট তাশাব্বুহ বিল ফুজ্জার এবং তাই এটি হারাম।
প্রাসঙ্গিক উদাহরণ:
- ফতোয়া-ই-আলমগিরিতে বলা হয়েছে, “পাশা (dice) ও দাবা খেলা নিষিদ্ধ, কারণ এগুলো জুয়াড়িদের খেলা। যদি তা জুয়া না হয় তবুও মাকরূহ” (ফতোয়া-ই-আলমগিরি, ৫/৩৬০)।
- মুফতি তাকি উসমানী (দা.ব.) বলেছেন, “যে খেলার উপকরণ ও পদ্ধতি জুয়াড়িদের মতো, সেগুলো পরিত্যাগ করা কর্তব্য” (ফতোয়া উসমানী, ২/৪১১)।
সারসংক্ষেপ:
- UNO-তে তাশাব্বুহের মাত্রা কম, তাই এটি মুবাহ। কিন্তু সতর্কতা হিসেবে পরিহার উত্তম।
- Pokémon-এ তাশাব্বুহ ও লাহব উভয়ই বিদ্যমান, তাই তা হারাম।
নির্ভরযোগ্য গ্রন্থের রেফারেন্স:
-
UNO ও সাধারণ কার্ড গেম:
- রদ্দুল মুহতার (৬/৩৯৫-৩৯৬): “وَلَا يَحِلُّ اللَّعِبُ بِالنَّرْدِ وَالشِّطْرَنْجِ وَالْمَلَاهِي، وَاللَّعِبُ بِقِطَعِ الشِّطْرَنْجِ بِلَا رِهَانٍ مَكْرُوهٌ تَحْرِيمًا”
- ফতোয়া উসমানী (২/৪১০-৪১২): “তাস ও দাবার মতো খেলা যদি জুয়ামুক্ত হয় এবং নামাজ থেকে গাফেল না করে, তবে তা মাকরূহ তানজিহি হতে পারে; কিন্তু সতর্কতা হলো পরিহার করা।”
-
Pokémon ও প্রাণীর ছবি:
- রদ্দুল মুহতার (১/২৭৮): “تَصْوِيرُ ذِي الرُّوحِ حَرَامٌ”
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩৩৪-৩৩৬): “কার্টুন ও কাল্পনিক প্রাণীর ছবিও প্রাণীর ছবির অন্তর্ভুক্ত, তা নাজায়েজ।”
-
ঘারার ও বুস্টার প্যাক:
- আল-হিদায়া (৩/৭৫): “وَلَا يَجُوزُ بَيْعُ الْمَجْهُولِ وَالْغَرَرِ”
- সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৯৪: “নবীজী (সা.) ঘারার ও প্রতারণামূলক লেনদেন নিষেধ করেছেন।”
-
তাশাব্বুহ বিল ফুজ্জার:
- রদ্দুল মুহতার (৬/৩৯৫): “التَّشَبُّهُ بِأَهْلِ الْمَعَاصِي مَكْرُوهٌ تَحْرِيمًا”
- ফতোয়া-ই-আলমগিরি (৫/৩৬০): “اللَّعِبُ بِالنَّرْدِ وَالشِّطْرَنْجِ حَرَامٌ، وَإِنْ خَلَا عَنْ الرِّهَانِ”
শেষ সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ:
- UNO: জুয়ামুক্ত অবস্থায় ঘরোয়া বিনোদন শর্ত সাপেক্ষে মুবাহ। তবে দীর্ঘসময় ধরে খেলা বা আসক্তি এড়ানো জরুরি।
- Pokémon: ছবি ও ঘারারের কারণে এটি হারাম। তাই কেনাবেচা, সংগ্রহ ও খেলা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
- সাধারণ নীতি: “যে খেলায় জুয়া, ঘারার, অশ্লীলতা, বা প্রাণীর ছবি নেই, এবং যা ধর্মীয় দায়িত্ব থেকে বিরত রাখে না, তা জায়েজ; অন্যথায় নাজায়েজ।”
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল ও হারাম বুঝার এবং আমল করার তৌফিক দিন।
والله أعلم بالصواب
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين