তালাকের সন্দেহ জিহার

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 2752
Questioner: Shariar Siam
Question Asked: 15 Jul 2026, 06:18 PM
Reviewed & Published: 15 Jul 2026, 06:22 PM
Views: 46
Tokens: 45,736
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার তালাক হুরমত ইত্যাদি বিষয় নিয়া চিন্তা হয়। আগের বিষিয় গুলা নিয়া। তো বাসে বসে একবার বলি, যেটা হয় নাই তালাক সেটা নিয়া চিন্তা করার দরকার নাই।তখনি ভয় জাতে ত দিয়া শব্দ টা উচ্চারণ করছি। তখন আওয়াজ টেস্ট করার জন্য আবার ও বলি। কারন মনে না জোরে শব্দ হইছে বুঝতেছিলাম না।
১ এতে কি তালাক হয়

আরেকবার ভাবি খাইতে খাইতে চাকরি পাওয়ার আগে তালাক নিয়া চিন্তা করা লাগবে না। তখন মনে বলি তাইলে কি চাকরি পাইলে তালাক হিয়ে যাবে?
তখন বলি চাকরি পাইলে তালাক হয়ে যাবে, (একটু থেমে) বলি এমন কোন কথা নাই।
এখানে ভয় হলো একটু থেমে পরের কথা টা বলছি। থামার কারন আছে খাবার চাবাইতাছিলাম। কথা টা মাথায় ছিলো বাট একসাথে বলা হয় নাই।
২। এই একসাথে না বলার কারনে কি শর্ত সাপেক্ষে তালাক হইয়া যাবে? চাকরি পাইলে?
* আগে একটা জিহারের ঘটনা দিয়া প্রশ্ন করছি তখন ভাবছি উত্তর দিবে হবে না। কিন্তু তখন কিছু বিষয় বলি নাই যেমন আওয়াজ মনে নাকি জোরে মনে যে নাই সেটা ওগুলা না বলার কারনে আলেম রা জিহার ধইরা নিতে বলছিলো। পরে আরো ক্লিয়ার করে ২য় প্রশ্ন করার পরে বলে যে জিহার হবে না।
৩৷ তাইলে কি আগের প্রশ্ন এর কারনে সেটা জিহারের মথ্যা শিকারোক্তি হইয়া আসলেই জিহার হইলো?

Answer

উত্তর

প্রশ্নটি মনস্তাত্ত্বিক সন্দেহ (ওয়াসওয়াসা) সংক্রান্ত। নিচে হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থের আলোকে তিনটি বিষয়ের উত্তর দেওয়া হলো।


১. প্রথম ঘটনা: বাসে বসে ভয়ে ‘তালাক’ শব্দ উচ্চারণ ও আওয়াজ টেস্ট করা

ঘটনার বিবরণ:
আপনি বাসে বসে মনে মনে বলেছিলেন, “যেটা হয় নাই তালাক, সেটা নিয়া চিন্তা করার দরকার নাই।” তারপর ভয়ে ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করেন। আওয়াজ টেস্ট করার জন্য আবার বলেন। আপনার উদ্দেশ্য ছিল তালাক দেওয়া না, বরং শব্দ পরীক্ষা করা।

হুকুম:

  • হানাফি মতে, তালাকের জন্য স্পষ্ট উচ্চারণতালাকের নিয়ত (ইরাদা) আবশ্যক। যদি কেউ তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে কিন্তু তার অন্তরে তালাকের ইচ্ছা না থাকে, তাহলে তালাক পতিত হয় না—যদি না তা রাগের মাথায় বা ঠাট্টাচ্ছলে বলা হয়।
  • এখানে আপনি ভয়ে ও শব্দ পরীক্ষার জন্য ‘তালাক’ বলেছেন, তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছা আপনার ছিল না। তাই কোনো তালাক পতিত হয়নি।

দলিল:

  • ইমাম কাসানী রহ. বলেন: “তালাকের শব্দ যদি কেউ তালাকের নিয়ত ছাড়া উচ্চারণ করে, তাহলে তা পতিত হয় না, যদি না তা রাগ বা ঠাট্টার কারণে হয়।” (বাদায়েউস সানায়ে, ৩/১০২)
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় আছে: “যদি কেউ কথা বলার সময় ‘তালাক’ শব্দ বলে, কিন্তু তার দিলে তালাকের ইচ্ছা না থাকে, তাহলে তালাক হবে না।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৮)
  • রদ্দুল মুহতার: “তালাকের শব্দ উচ্চারণ করলেই তালাক পতিত হয় না, বরং নিয়তের উপর নির্ভর করে।” (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৫৪)

সারসংক্ষেপ:
আপনার প্রথম ঘটনায় কোনো তালাক হয়নি।


২. দ্বিতীয় ঘটনা: চাকরি পাওয়ার শর্তে তালাকের কথা বলে ‘এমন কোনো কথা নাই’ বলা

ঘটনার বিবরণ:
খাবার চিবাতে চিবাতে আপনি মনে মনে ভাবছিলেন, চাকরি পাওয়ার আগে তালাক নিয়ে চিন্তার দরকার নেই। তারপর নিজেকে জিজ্ঞেস করলেন: “তাইলে কি চাকরি পাইলে তালাক হয়ে যাবে?” এবং উত্তর দিলেন: “চাকরি পাইলে তালাক হয়ে যাবে” (থেমে) “এমন কোনো কথা নাই।” থামার কারণ ছিল খাবার চিবানো। এখানে একসঙ্গে বাক্যটি সম্পূর্ণ হয়নি।

হুকুম:

  • শর্তসাপেক্ষ তালাক (তা’লিকে তালাক) তখনই পতিত হয় যখন শর্ত ও তালাক একই বাক্যে সম্পূর্ণ হয় এবং শর্ত পূরণের প্রতি ইচ্ছা (নিয়ত) থাকে।
  • আপনি প্রথমে বলেন “চাকরি পাইলে তালাক হয়ে যাবে” — এটি একটি শর্তযুক্ত বাক্য। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আপনি বলেন “এমন কোনো কথা নাই”, যা পুরো বাক্যটিকে অস্বীকার করে।
  • আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: আপনি নিজের সঙ্গে কথোপকথন করছিলেন, স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তালাক দিচ্ছিলেন না। একাকীভাবে নিজের চিন্তার মধ্যে বলা কোনো তালাকের হুকুম কার্যকর হয় না, যদি না তা তালাকের নিয়তে বলা হয়।
  • ইমাম ইবনে আবেদীন রহ. বলেন: “শর্তসাপেক্ষ তালাক তখনই পতিত হয় যখন স্পষ্টভাবে শর্ত ও তালাক উচ্চারিত হয় এবং শর্ত পূরণের ইচ্ছা থাকে। কিন্তু যদি কেউ ‘যদি আমি চাকরি পাই তাহলে তালাক’ বলে, তারপর সঙ্গে সঙ্গেই বলে ‘না, এমন কিছু না’, তাহলে তালাক পতিত হবে না। কারণ এটি একটি সন্দেহমূলক বাক্য, দৃঢ় ইচ্ছা নয়।” (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৭০)
  • ফাতাওয়া উসমানী: “নিজের মনে নিজে কথা বলা বা কল্পনা করা তালাক পতিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫০)

সারসংক্ষেপ:
আপনার দ্বিতীয় ঘটনাতেও কোনো শর্তসাপেক্ষ তালাক পতিত হয়নি। চাকরি পেলেও এই কারণে তালাক হবে না।


৩. পূর্বের জিহার প্রশ্নে অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়ার কারণে জিহার হওয়া

প্রশ্ন: আপনি আগে জিহার সম্পর্কে একটি প্রশ্ন করেছিলেন, যেখানে কিছু তথ্য উল্লেখ করেননি (যেমন আওয়াজের তীব্রতা, মনে জোরে হয়েছে কিনা ইত্যাদি)। আলেমরা সেসব তথ্যের ভিত্তিতে জিহার বলে রায় দিয়েছিলেন। পরে ক্লিয়ার করলে তারা বলেছেন জিহার হবে না। এখন আপনি জানতে চান: পূর্বের প্রশ্নের কারণে কি আসলেই জিহার হয়ে গেছে?

উত্তর:

  • ফিকহি হুকুম নির্ভর করে বাস্তব ঘটনার উপর, প্রশ্নকারীর তথ্য উপস্থাপনের উপর নয়। আপনি যদি বাস্তবে জিহারের শর্ত পূরণ না করে থাকেন (যেমন স্ত্রীকে ‘তুমি আমার মায়ের পিঠের মতো’ বলা, সাক্ষ্য ইত্যাদি না থাকা), তাহলে কোনো জিহার হয়নি।
  • পূর্বের প্রশ্নে ভুলবশত তথ্য কম দেওয়ার কারণে আলেমরা যে ফতোয়া দিয়েছিলেন, তা তখনকার তথ্যের ভিত্তিতে ছিল। বাস্তবতা পরিবর্তন হয় না।
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় আছে: “যদি কেউ কোনো বিষয় ভুলভাবে বর্ণনা করে এবং তার উপর ফতোয়া দেওয়া হয়, তবে প্রকৃত অবস্থা জানার পর পূর্বের ফতোয়া কার্যকর থাকে না।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৩/৩৬০)

সারসংক্ষেপ:
আপনার পূর্বের প্রশ্নে তথ্যের ঘাটতি থাকলেও আসলেই জিহার হয়নি। জিহারের ঘটনা প্রকৃতপক্ষে সংঘটিত না হওয়ায় কোনো কাফফারা ওয়াজিব হয়নি।


গুরুত্বপূর্ণ নসিহত

আপনি বারবার তালাক, জিহার ইত্যাদি নিয়ে চিন্তিত হচ্ছেন। এটি ‘ওয়াসওয়াসা’ (মনের অসুস্থ সন্দেহ) – শয়তানের কুমন্ত্রণা। শরিয়তে ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “তোমাদের কেউ যেন তালাকের ব্যাপারে ওয়াসওয়াসায় না পড়ে। কেননা তা অহেতুক কষ্টের কারণ হয়।” (মুসলিম, হাদিস: ২০১৩)
  • ইমাম মালেক রহ. বলেন: “যে ব্যক্তি তালাকের ব্যাপারে ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত হয়, সে যেন একেবারেই তালাকের চিন্তা ছেড়ে দেয়। তা না হলে তার সংসার ধ্বংস হয়ে যাবে।” (আল-মুদাওয়ানাহ, ২/৪২)

আপনার করণীয়:

  • নিজের স্ত্রী ও সংসার নিয়ে স্বাভাবিক থাকুন।
  • তালাকের চিন্তা মাথায় এলে “আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম” পড়ুন এবং কাজে ব্যস্ত হয়ে যান।
  • কোনো ভয় বা সন্দেহবশত উচ্চারিত শব্দ তালাক হিসেবে গণ্য হবে না, যতক্ষণ না আপনি স্পষ্টভাবে তালাকের নিয়ত করেন এবং স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন।
  • প্রয়োজনে একজন অভিজ্ঞ আলেমের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেন।

সারসংক্ষেপ (প্রশ্নানুযায়ী)

| # | ঘটনা | রায় | কারণ | |---|------|------|------| | ১ | বাসে ভয়ে ‘তালাক’ বলা ও আওয়াজ টেস্ট করা | তালাক হয়নি | তালাকের নিয়ত ছিল না; শুধু শব্দ পরীক্ষা | | ২ | চাকরি পেলে তালাক হবে বলে ‘এমন কথা নাই’ বলা | শর্তসাপেক্ষ তালাক হয়নি | বাক্য অসম্পূর্ণ; নিজের সঙ্গে কথা; সঙ্গে সঙ্গে অস্বীকার | | ৩ | পূর্বের জিহার প্রশ্নে অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া | জিহার হয়নি | বাস্তবে জিহারের শর্ত পূরণ হয়নি |

আপনার স্ত্রী আপনার সঙ্গে বৈধভাবে বিবাহিত আছেন। কোনো তালাক বা জিহার পতিত হয়নি। ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইবেন।


তথ্যসূত্র (হানাফি কিতাব)

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) – ৩/২৫৪, ৩/২৭০
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) – ১/৩৭৮, ৩/৩৬০
  • বাদায়েউস সানায়ে (ইমাম কাসানী) – ৩/১০২
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানি) – ২/৪৫০
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) – ২/২৮০
  • বেহেশতি জেওর (মাওলানা থানভী) – তালাক অধ্যায়
  • শরহু মা'আনিল আসার (ইমাম তাহাবী) – ৩/২৩
  • উসুলুশ শাশী – কাওয়ায়েদে ফিকহিয়্যাহ


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.