অভিভাবকের অজান্তে বিয়ের বিধান।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
এমতাবস্থায়, নিজেদের পবিত্র রাখতে আমরা পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিই। আমরা হানাফি মাজহাব অনুসরণ করি।
গত কিছুদিন আগে আমরা একজন রেজিস্টার্ড কাজি এবং চারজন যোগ্য মুসলিম সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিয়ের এজাব-কবুল সম্পন্ন করি। মেয়েটির বাবা বেঁচে নেই, তার অভিভাবক কেবল তার মা; তবে তিনি বা আমাদের পরিবারের কেউই এই বিয়ের ব্যাপারে অবগত নন। পড়াশোনা শেষ হওয়া মাত্রই আমরা সামাজিকভাবে অনুষ্ঠান করে পরিবারকে বিষয়টি জানানোর নিয়ত রেখেছি।
এই অবস্থায় হানাফি ফিকহের আলোকে আমাদের প্রশ্নগুলো নিম্নরূপ:
১. অভিভাবকের অজান্তে সম্পন্ন হওয়া আমাদের এই বিয়েটি কি শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ ও সহিহ হয়েছে?
২. আমাদের ওপর কি এখন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সব নিয়মকানুন ও পারস্পরিক অধিকার প্রযোজ্য হবে?
৩. আল্লাহর দরবারে আমাদের এই বিয়ে কবুল হওয়ার ব্যাপারে শরিয়াহ কী বলে?
দয়া করে কোরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর দিয়ে বাধিত করবেন।
Answer
উত্তর
হানাফি ফিকহ, কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি মুরাজ্জাহ (প্রাধান্যপ্রাপ্ত) গ্রন্থসমূহের আলোকে আপনাদের তিনটি প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১. অভিভাবকের অজান্তে সম্পন্ন হওয়া এই বিয়ে কি শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ ও সহীহ হয়েছে?
উত্তর: হ্যাঁ, আপনার বিয়ে শরিয়তসম্মত ও সহীহ (বৈধ) হয়েছে। হানাফি মাজহাবের মূলনীতি অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ-বুদ্ধিসম্পন্ন নারী নিজের বিয়ের চুক্তি সম্পাদন করতে পারেন, এবং এজন্য অভিভাবকের (ওয়ালির) অনুমতি বা উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়। বরং নারী নিজেই নিজের ওয়ালি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
প্রমাণ:
- কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “যখন তোমরা স্ত্রীদের তালাক দাও এবং তারা তাদের ইদ্দত পূর্ণ করে, তখন তারা নিজেদের মধ্যে (নিজেদের ইচ্ছায়) ভালোভাবে চুক্তি করলে (অন্য) স্বামী গ্রহণ করতে তাদের বাধা দিয়ো না।” (সূরা বাকারা, ২:২৩২) – এই আয়াত থেকে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) প্রমাণ করেন যে নারী তার নিজের বিবাহের ব্যাপারে স্বাধীন।
- হাদিসে এসেছে: “যে নারীর আগে বিবাহ হয়েছে, তার নিজের অধিকার তার অভিভাবকের চেয়ে বেশি।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪২১)
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহ:
- আল-হিদায়া (১/১৯০): “একজন স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিমতী নারীর নিজের বিয়ে দেওয়া জায়েয, যদিও সে কুমারী হয়, আর এ জন্য ওয়ালির অনুমতি আবশ্যক নয়।”
- রদ্দুল মুহতার (৩/৫৫): “ইমাম আবু হানিফার মতে বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার জন্য ওয়ালি শর্ত নয়।”
- ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ (১/২৮৫): “নারী নিজে নিজের বিয়ে পড়াতে পারে, যদি সে প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের হয় এবং সে যদি সমকক্ষ (কুফু) পাত্রের সাথে বিয়ে করে।”
শর্তসমূহ যা আপনার বিয়েতে পূর্ণ হয়েছে:
- ✅ দুই পক্ষের ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ) একই মজলিসে সম্পন্ন।
- ✅ দুইজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী (অথবা একজন পুরুষ ও দুই নারী) – আপনারা চারজন পুরুষ সাক্ষী নিয়েছেন, যা উত্তম।
- ✅ নির্ধারিত মোহর (যা সাধারণত কাজী নির্ধারণ করেছেন)।
- ✅ মেয়েটি বালিগা (প্রাপ্তবয়স্ক) ও সুস্থ মস্তিষ্কের – যেহেতু তিনি নিজে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এটি প্রমাণিত।
মেয়ের ওয়ালি সম্পর্কে: হানাফি মতে মেয়ের বাবা মারা গেলে তার মা ওয়ালি নন। বরং ওয়ালি হলো পিতার পক্ষের পুরুষ আত্মীয় (যেমন: দাদা, ভাই, চাচা)। কিন্তু যেহেতু হানাফি মতে নারী নিজেই নিজের ওয়ালি হতে পারে, তাই তাঁর মা বা অন্য কারও অনুমতি না থাকলেও বিয়ে বৈধ। তবে মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) হলো ওয়ালির মাধ্যমে বিয়ে করা। আপনি পরে পরিবারকে জানাবেন, ইনশাআল্লাহ এতে কোনো সমস্যা নেই।
উপসংহার: আপনার বিয়ে শরিয়তসম্মত ও সহীহ। এখন আপনারা আইনগতভাবে স্বামী-স্ত্রী।
২. আমাদের ওপর কি এখন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সব নিয়মকানুন ও পারস্পরিক অধিকার প্রযোজ্য হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, যেহেতু বিয়েটি সহীহ হয়েছে, তাই এখন থেকে আপনাদের ওপর স্বামী-স্ত্রীর সকল অধিকার ও দায়িত্ব প্রযোজ্য হবে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু হলো:
- স্বামীর অধিকার: স্ত্রীর আনুগত্য, সংসার পরিচালনায় সহযোগিতা, দাম্পত্য সম্পর্ক (যৌনমিলন) জায়েয, এবং স্ত্রীকে অন্য পুরুষ থেকে পর্দা করতে হবে।
- স্ত্রীর অধিকার: স্বামীর ওপর তার ভরণপোষণ (খোরপোশ, বাসস্থান, পোশাক) ফরজ, মোহরের সম্পূর্ণ টাকা প্রদান, এবং সম্মানজনক আচরণ।
- পরস্পরিক: উত্তরাধিকার (একে অপরের সম্পত্তির ওয়ারিস হবেন), সন্তান সম্পর্কিত অধিকার ইত্যাদি।
প্রমাণ:
- কুরআন: “আর নারীদের জন্যে (স্বামীর ওপর) তেমনি অধিকার রয়েছে, যেমনি তাদের ওপর স্বামীদের অধিকার রয়েছে নিয়মানুযায়ী।” (সূরা বাকারা, ২:২২৮)
- হাদিস: “তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো; তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানতরূপে গ্রহণ করেছো এবং আল্লাহর কালেমার মাধ্যমে তাদেরকে হালাল করেছো।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮)
হানাফি ফিকহ:
- রদ্দুল মুহতার (৩/৫৪৮) – সহীহ বিয়ের পর দম্পতির ওপর সমস্ত হুকুম ও অধিকার প্রযোজ্য হয়।
সতর্কতা: বিয়ে গোপন রাখা উত্তম নয় বরং উত্তম ও উচিত হল, এখনই বিয়ের প্রচার করা। সামাজিক অনুষ্ঠান ও পরিবারকে জানানো** অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাতাপিতার অগোচরে বিয়ে করা কখনো কোনো মুসলিম ছেলে মেয়ের জন্য কাম্য হতে পারে না।
৩. আল্লাহর দরবারে আমাদের এই বিয়ে কবুল হওয়ার ব্যাপারে শরিয়াহ কী বলে?
উত্তর: এই বিয়ে আল্লাহর দরবারে কবুল হবে, কারণ এটি শরিয়তের সব শর্ত মেনে সম্পন্ন হয়েছে। তবে কিছু বিষয় মনে রাখা জরুরি:
- তওবা: আপনারা আগের সম্পর্কের জন্য আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা করুন। তওবা কবুলের জন্য শর্ত হলো: (ক) গুনাহ থেকে বিরত থাকা, (খ) ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প, (গ) কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হওয়া। আপনার বিয়ের মাধ্যমে আপনি আগের পাপ থেকে বাঁচতে চেয়েছেন, এটি তওবারই একটি অংশ।
- নিয়ত: বিয়ের মূল উদ্দেশ্য যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নিজেদের পবিত্র রাখা হয়, তাহলে এটি ইবাদত ও সওয়াবের কাজ। হাদিসে এসেছে: “বিয়ে আমার সুন্নত। যে আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৩)
- গোপন বিয়ে: বিয়ে গোপন রাখা উচিত নয়, বরং প্রচার করা সুন্নত। আপনারা পরিবারকে জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এটি খুবই উত্তম। ওয়ালিমা (বিয়ের দাওয়াত) করা সুন্নত, যা পরে করে দিলেও হবে।
প্রমাণ:
- কুরআন: “আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কারণ এটি চোখকে অবনত রাখে ও লজ্জাস্থানকে সংরক্ষণ করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৬)
- ফাতাওয়া উসমানি (২/২৭৬): “সহীহ শর্তে সম্পন্ন বিয়ে আল্লাহর কাছে কবুল; তবে উত্তম হলো ওয়ালি ও সমাজের সম্মতি নিয়ে করা।”
উপসংহার: আপনার বিয়ে আল্লাহর কাছে কবুল হবে ইনশাআল্লাহ, যদি এটি সঠিক নিয়তে ও শরিয়তের শর্তে হয়। তবে ভবিষ্যতে পরিবারকে জানানো এবং ওয়ালিমা করা জরুরি, যাতে সামাজিক বৈধতাও লাভ হয় এবং পরবর্তী কোনো সমস্যা না হয়।
চূড়ান্ত পরামর্শ:
- এখন থেকেই স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ইসলামী জীবনযাপন শুরু করুন – নামাজ, পর্দা, ভালোবাসা ও সহানুভূতি বজায় রাখুন।
- পরিবারকে জানানোর আগ পর্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রাখুন – তবে মিথ্যা বলবেন না; প্রয়োজনে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করুন।
- বিয়েটি বৈধ হওয়ায় আপনারা একে অপরের হালাল সঙ্গী। তবে আগের সম্পর্কের কারণে কোনো অনৈতিকতার সন্দেহ থাকলে, তা থেকে তওবা করে সামনে এগিয়ে যান।
- ওয়ালিমা করার নিয়ত করুন, যাতে বিয়ে প্রচার হয় এবং সমাজে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।
আল্লাহ আপনাদের বরকত দিন, এই বিয়ে কবুল করুন এবং দুনিয়া-আখিরাতে উত্তম জীবন দান করুন। আমিন।
প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্র: আল-হিদায়া, রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ, ফাতাওয়া উসমানি, মাআরিফুল কুরআন, সহিহ বুখারি ও মুসলিম।