হানাফি ফিকহ অনুযায়ী স্ত্রী স্বামীকে যাকাত দিতে পারে কি?
Zakat and Charity · Hanafi
Question
১) আমার স্বামীর কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ নাই। তার ঋণ আছে যেটা মাসিক বেতন দিয়ে পরিশোধ করতে পারছে না।
আমি কি যাকাতের টাকা তাকে দিতে পারবো পরিশোধ করার জন্য।
এই টাকা তো আমার কাছে ফেরত আসবে না। শায়খ আহমাদুল্লাহ বলছিলেন ঋণ পরিশোধ এর জন্য স্ত্রী দিতে পারবে। আমি হানাফি ফিকহ মানার চেষ্টা করি যেহেতু এটা আমাদের দেশে এভেইলেবল। তাই কি করব বুঝতে পারছি না। আমি ইতিমধ্যে যাকাতের নিয়তে ১৯,০০০ টাকা স্বামী কে দিয়ে ফেলেছি।
২) আমার মোহরানা ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ হয় যেটা আমাকে এখনও পরিশোধ করা হয়নি। এই টাকার যাকাত কি দিতে হবে?
৩) ১২ অক্টোবর ২০২৪ থেকে ১২ অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত আমার কাছে ৭.৪৪ ভরি স্বর্ণ আর ৩৫ হাজার টাকা ছিল। এইটার যাকাত আমি দিয়েছি।
বর্তমান এ আমার কাছে ৭.৪৪ ভরি স্বর্ণ ছিল কিন্তু কোন টাকা ছিল না।কিন্তু জুন ২০২৬ এ আমাকে ৬ আনা স্বর্ণ উপহার দেয়া হয়। ফলে ৭.৫ ভরির বেশি হয়ে গেছে।১২ অক্টোব ২০২৬ এ কি আমাকে এর যাকাত দিতে হবে নাকি জুন ২০২৭ এ দিতে হবে?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার তিনটি প্রশ্নের উত্তর নিম্নে হানাফি ফিকহের কিতাব ও উসূলের আলোকে দেওয়া হলো।
১. স্বামীর ঋণ পরিশোধের জন্য স্ত্রী কি যাকাত দিতে পারে?
উত্তর: না, হানাফি মতে স্ত্রী তার স্বামীকে যাকাত দিতে পারেনা।
২. অনাদায়ী মোহরানার উপর যাকাত কি ফরজ?
উত্তর: আপনার মোহরানা ৫ লাখ টাকা এখনও আপনার কব্জায় আসেনি, এবং আপনার স্বামী নিসাবের মালিক নন (তার কাছে ঋণ আছে ও সম্পদ নেই) – এই অবস্থায় এই টাকা আপনার ‘দুর্বল কর্জ’ (غیر واجب الأداء) হিসেবে গণ্য। হানাফি ফিকহে অনাদায়ী ঋণ (যার আদায়ের সম্ভাবনা নিশ্চিত নয়) তার মালিকের উপর যাকাত ফরজ নয়। বরং যখন টাকা হাতে পাবেন, তখন অতীতের একটি বছর (সালমান) এর যাকাত দেবেন। কিন্তু যতদিন টাকা হাতে না আসে, ততদিন যাকাত দিতে হবে না।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানি): “ঋণ বা মোহরানা যা এখনো গ্রহণ করা হয়নি এবং পাওনাদার নিশ্চিত নয় যে তা আদায় হবে, তার উপর যাকাত ফরজ নয়।”
- আল-হিদায়া: “ঋণ যতক্ষণ হস্তগত না হয়, ততক্ষণ তার জাকাত ওয়াজিব নয়।” (كتاب الزكاة)
সুতরাং আপনি বর্তমানে এই ৫ লাখ টাকার যাকাত দিতে বাধ্য নন।
৩. নতুন স্বর্ণ উপহার পাওয়ার পর যাকাতের সাল গণনা
উত্তর: যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য সম্পদ পূর্ণ এক চান্দ্র বছর (হাওল) নিজের কাছে থাকতে হবে এবং তা নিসাব পরিমাণ হতে হবে। আপনার ক্ষেত্রে:
-
১২ অক্টোবর ২০২৪ থেকে ১২ অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত: আপনার কাছে ৭.৪৪ ভরি স্বর্ণ ও ৩৫,০০০ টাকা ছিল। ৭.৪৪ ভরি স্বর্ণ = প্রায় ৮৬.৭৮ গ্রাম, যা স্বর্ণের নিসাব (২০ মিসকাল = ৮৭.৪৮ গ্রাম) থেকে সামান্য কম। ৩৫,০০০ টাকা রুপার নিসাব (প্রায় ৬৭,০০০ টাকা) থেকেও কম। তাই ঐ সময় আপনার উপর যাকাত ফরজ ছিল না, তবে আপনি দিয়েছেন – এটি নফল সাদকা হিসেবে গণ্য হবে (যাকাত আদায় হয়নি, কিন্তু সওয়াব পাবেন)।
-
তারপর ১২ অক্টোবর ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত: আপনার কাছে শুধু ৭.৪৪ ভরি স্বর্ণ (নিসাবের নিচে) এবং কোনো টাকা নেই – তাই আপনি যাকাতি ছিলেন না।
-
জুন ২০২৬ এ আপনি ৬ আনা (০.৩৭৫ ভরি) স্বর্ণ উপহার পেলেন। এর ফলে মোট স্বর্ণ = ৭.৪৪ + ০.৩৭৫ = ৭.৮১৫ ভরি, যা স্বর্ণের নিসাব (৭.৫ ভরি) অতিক্রম করে। সুতরাং আপনার যাকাতের সাল শুরু হবে জুন ২০২৬ থেকে (যেদিন আপনি নিসাবের মালিক হলেন)। তাই জুন ২০২৭ (এক চান্দ্র বছর পর) যখন পূর্ণ হবে, তখন আপনার ওপর যাকাত ফরজ হবে।
-
১২ অক্টোবর ২০২৬ এই সাল গত হয়নি, সেদিন যাকাত ওয়াজিব হবে না। যদি আপনি চান, তবুও আগে যাকাত দিতে পারেন (সাল পূর্ণ হওয়ার আগে), কিন্তু তা সুন্নত পদ্ধতি নয়। উত্তম হলো জুন ২০২৭ এ যাকাত আদায় করা।
রেফারেন্স:
- শরহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবি): “যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য সম্পদ এক বছর নিজের কাছে থাকতে হবে।”
- ফাতাওয়া উসমানী: “সম্পদ নিসাবের নিচে থাকলে নতুন করে নিসাব পূর্ণ হলে সাল গণনা শুরু হয়।”
সারসংক্ষেপ
- আপনার স্বামীকে যাকাত দেওয়া জায়েজ নয়।
- বকেয়া মোহরানার যাকাত এখন দিতে হবে না।
- জুন ২০২৬ এ নিসাব পূর্ণ হয়েছে, তাই জুন ২০২৭ এ যাকাত দেবেন।
والله أعلم بالصواب
(আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন)