ফুপাতো ভাই যদি যৌন নিপীড়ন করে, তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ত্যাগ করা কি জায়েয?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তরের সারাংশ
যৌন নিপীড়নের শিকার ব্যক্তির জন্য নিপীড়নকারী ফুপাতো ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয। মামা/চাচার স্ত্রী (ফুপু) ও তার স্বামীর (ফুপা) সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাও জায়েয, বিশেষত যখন তারা নিপীড়ন অস্বীকার করে এবং দায়িত্ব নেয় না, যার ফলে নিপীড়িত ব্যক্তির মনে আঘাত সৃষ্টি হয়। তবে যদি সম্ভব হয়, ন্যূনতম সম্পর্ক (যেমন ফোনে খোঁজ-খবর) রাখা উত্তম। অন্যান্য ভাই-বোন ও আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা আবশ্যক।
দলিল ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. আত্মীয়তার সম্পর্কের গুরুত্ব ও সীমা
কুরআন ও হাদিসে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার (সিলাতুর রাহিম) গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ বলেন:
وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ
“আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাও এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করো না।” (সূরা আন-নিসা: ১)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (সহীহ বুখারী)
তবে শরয়ী অনুমতি ছাড়া আত্মীয়তা ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ। কিন্তু যদি সম্পর্ক বজায় রাখার কারণে ধর্মীয় বা দৈহিক ক্ষতি হওয়ার আশংকা থাকে, তাহলে তা ছিন্ন করা বা সীমিত করা জায়েয। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ উল্লেখ করেছেন:
يَجُوزُ هَجْرُ الْمُؤْذِي لِمَا فِي صِلَتِهِ مِنَ الضَّرَرِ
“ক্ষতিকর ব্যক্তিকে পরিহার করা জায়েয, কারণ তার সাথে সম্পর্ক রাখায় ক্ষতি আছে।” (রাদ্দুল মুহতার, ৫/৩৮৭)
২. নিপীড়নকারী ফুপাতো ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক
নিপীড়ন শৈশবে হলেও এটি একটি গুরুতর মানসিক ও আধ্যাত্মিক আঘাত। এই ধরনের অপরাধীর সাথে সম্পর্ক রাখা নিপীড়িত ব্যক্তির জন্য ক্রমাগত কষ্ট ও মানসিক অস্থিরতার কারণ। নিম্নোক্ত কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয:
- ক্ষতি থেকে বাঁচা: ইসলামে নিজেকে ক্ষতি থেকে বাঁচানো ওয়াজিব। এক্ষেত্রে সম্পর্ক রাখলে নিপীড়িত ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- অপরাধীর প্রতি ঘৃণা বৈধ: শরিয়ত অপরাধীকে ঘৃণা করাকে বৈধ বলেছে, যদি তা ন্যায়সংগত হয়।
- সুযোগ সৃষ্টির আশংকা: সম্পর্ক বজায় রাখলে ভবিষ্যতে আবারও নিপীড়নের আশংকা থাকলে তা আরও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
হাদিসে এসেছে:
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
“কোনো ক্ষতি করা যাবে না এবং কোনো ক্ষতির বিনিময়ে ক্ষতি করা যাবে না।” (মুসনাদে আহমদ)
সুতরাং নিপীড়নকারী ফুপাতো ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয ও সঙ্গত।
৩. ফুপু ও ফুপা (নিপীড়নকারীর পিতামাতা) সাথে সম্পর্ক
ফুপু (চাচি/মামি) ও ফুপা (তার স্বামী) নিপীড়ন সম্পর্কে অবগত হয়েও যদি তা অস্বীকার করেন এবং নিপীড়িতের প্রতি জবাবদিহি করতে রাজি না হন, তাহলে তাদের সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয। কারণ:
- তারা অন্যায়কে সমর্থন দিচ্ছেন: সাল্লাম ও সমর্থন দিয়ে অপরাধীকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন, যা গুনাহের কাজ। তাদের সাথে সম্পর্ক রাখলে নিপীড়িতের মনে হয় যেন এই অন্যায়কে নীরবে মেনে নেওয়া হয়েছে।
- মানসিক যন্ত্রণা: নিপীড়িত ব্যক্তি যখন তাদের সাথে দেখা করে, ছেলের (নিপীড়নকারী) কষ্টের স্মৃতি মনে পড়ে যায়। এটি ধারাবাহিক মানসিক নির্যাতনের শামিল।
- ইসলামী বিধান: ইমাম কাসানী (রহ.) ‘বাদায়িউস সানায়ি’-তে বলেন:
إِذَا كَانَ فِي صِلَةِ الرَّحِمِ ضَرَرٌ فِي الدِّينِ أَوْ الدُّنْيَا جَازَ الْقَطْعُ
“যদি আত্মীয়তা বজায় রাখায় দ্বীনি বা দুনিয়াবি ক্ষতি হয়, তাহলে তা ছিন্ন করা জায়েয।”
তবে মা-বাবার ক্ষেত্রে বিধান ভিন্ন। যেহেতু নিপীড়িত ব্যক্তি ফুপু-ফুপার বাড়িতে ১২ বছর ছিলেন, তারা তার দ্বিতীয় অভিভাবকের মতো। কিন্তু এখানে তারা প্রতিকার না দিয়ে বরং অস্বীকার করায় তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাও জায়েয। তবে যদি সম্ভব হয়, ন্যূনতম আত্মীয়তা (যেমন শুধু ঈদের সময় ফোন কল বা সালামের উত্তর দেওয়া) রাখার চেষ্টা করা উত্তম, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়।
৪. অন্যান্য ভাই-বোনের সাথে সম্পর্ক
নিপীড়িত ব্যক্তি বাকি ভাই-বোন (অর্থাৎ ফুপু-ফুপার অন্যান্য সন্তান) এবং অন্যান্য আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রেখেছেন। এটি শরিয়তসম্মত ও প্রশংসনীয়। তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি, যতক্ষণ না তারা নিপীড়নকারীকে সমর্থন না করে বা নিপীড়িতের ক্ষতি না করে।
৫. হানাফি ফিকহের মূলনীতি
- ‘দারুরাত’ ও ‘হারাজ’: কষ্ট ও অসুবিধা দূর করা ইসলামের মূলনীতি। (আল-হেদায়া)
- ‘আমর বিল মা’রুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার’: অন্যায়কারীকে পরিত্যাগ করাও নাহি আনিল মুনকারের অংশ।
- ফতোয়ায়ে উসমানী: মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেছেন, “ক্ষতিকর আত্মীয়কে এড়িয়ে চলা জায়েয, বিশেষত যদি সে দ্বীনের ক্ষতি করে বা মানসিক নির্যাতন চালায়।”
৬. ব্যবহারিক পরামর্শ
- নিপীড়নকারী ভাই: সাথে সকল প্রকার যোগাযোগ বন্ধ রাখুন। তাকে ক্ষমা করতে চাইলে সেটা নিজের ইচ্ছায় করুন, বাধ্য নন।
- ফুপু-ফুপা: প্রথমে তাদের সাথে চিঠি বা ফোনে কথা বলতে পারেন নিপীড়নের বিষয়টি স্বীকার করতে অনুরোধ করে। যদি তারা তা না করে, তাহলে তাদের সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয। যদি পরবর্তীতে তারা অনুতপ্ত হয় ও ক্ষমা চায়, ইচ্ছা থাকলে আবার সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন।
- অন্যান্য আত্মীয়: যারা নিরপেক্ষ ও সহানুভূতিশীল, তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা উত্তম।
সংক্ষিপ্ত উত্তর (সংক্ষেপে)
| সম্পর্ক | জায়েয? | মন্তব্য | |---------|---------|---------| | নিপীড়নকারী ফুপাতো ভাই | হ্যাঁ, জায়েয | সম্পর্ক রাখলে পুনরায় ক্ষতির আশংকা ও মানসিক কষ্ট। | | ফুপু (তার মা) | জায়েয, তবে উত্তম হচ্ছে ছোট সম্পর্ক রাখা | যদি তারা অস্বীকার করে ও দায়িত্ব না নেয়, তাহলে সম্পর্ক ছিন্ন করা যেতে পারে। | | ফুপা (তার বাবা) | জায়েয | একই কারণে। | | অন্যান্য ভাই-বোন | বজায় রাখা ওয়াজিব | যতক্ষণ তারা ক্ষতিকর না হয়। |
উপসংহার
ইসলাম আত্মীয়তা বজায় রাখার আদেশ দিয়েছে, তবে কোনো সম্পর্ক যদি ধর্মীয় বা দৈহিক ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে তা ছিন্ন করা শুধু জায়েযই নয়, কখনও কখনও আবশ্যকও। যৌন নিপীড়নের শিকার ব্যক্তির জন্য নিপীড়নকারী ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয, এবং তার পিতামাতার সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয, বিশেষ করে যখন তারা নিপীড়ন অস্বীকার করে ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে না।
মনে রাখবেন: ক্ষমা করা বা সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা ব্যক্তিগত ইচ্ছাধীন। আল্লাহ তায়ালা নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিকে ধৈর্য ও শক্তি দান করুন।
আল্লাহু আলাম।