সরকারি চাকরিতে বদলির জন্য ঘুষ দেওয়া কি জায়েজ,
Halal and Haram · Hanafi
Question
এখন আমার প্রশ্ন, এভাবে বদলি হলে আমি কি ঘুষের অংশীদার হয়ে যাব? আমার কি গুনাহ হবে অথবা চাকরির উপার্জন হারাম হয়ে যাবে?
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আপনি যদি জানেন যে, আপনার বদলির জন্য ঘুষ দেওয়া হবে (আপনার বন্ধু দিলেও), তাহলে আপনি ঘুষের অংশীদার হবেন এবং আপনার গুনাহ হবে। আপনার চাকরির উপার্জনও হারাম হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
দলিল:
১. ঘুষের হারাম হওয়া:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ
“আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না এবং বিচারকদের কাছে (ঘুষ) পেশ করো না, যাতে করে তোমরা অপরাধবশত মানুষের সম্পদের কিছু অংশ খেতে পার।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
لَعَنَ اللَّهُ الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ وَالرَّائِشَ
“আল্লাহর অভিশাপ ঘুষদাতা, ঘুষগ্রহীতা এবং তাদের মধ্যস্থতাকারীর উপর।” (মুসনাদ আহমদ, সুনান আবু দাউদ, তিরমিযী)
২. অংশীদার হওয়ার বিধান:
আপনি নিজে টাকা দিচ্ছেন না, কিন্তু আপনার বন্ধু আপনার বদলির জন্য ঘুষ দিচ্ছে—এতে আপনি ঘুষের উদ্যোক্তা ও উপকারভোগী হচ্ছেন। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) ফতোয়া দিয়েছেন:
إِذَا دَفَعَ إِلَى الْحَاكِمِ رِشْوَةً لِيَحْكُمَ لَهُ بِالْبَاطِلِ، فَالرِّشْوَةُ حَرَامٌ عَلَى الدَّافِعِ وَالْآخِذِ، وَكَذَا عَلَى مَنْ أَمَرَ بِدَفْعِهَا أَوْ رَضِيَ بِهَا
“যদি কেউ বিচারককে ঘুষ দেয় অন্যায় ফয়সালা করার জন্য, তাহলে ঘুষদাতা ও গ্রহীতার উপর তা হারাম। তদ্রূপ যে ঘুষ দেওয়ার নির্দেশ দেয় বা তাতে সন্তুষ্ট থাকে, তার জন্যও তা হারাম।” (রদ্দুল মুহতার, ৫/৩৬৯)
৩. বদলির জন্য ঘুষ দেওয়া:
সরকারি চাকরিতে বদলি সাধারণত নিয়ম ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। ঘুষ দিয়ে বদলি করানো সুস্পষ্ট অন্যায়। আপনার জানা সত্ত্বেও বন্ধুকে ঘুষ দিতে দেওয়া এবং তার মাধ্যমে বদলি হওয়া—এতে আপনি ঘুষের কাজে সহযোগিতা করছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা একে অপরকে সাহায্য করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সাহায্য করো না।” (সূরা আল-মায়িদা: ২)
৪. উপার্জন হারাম হওয়া:
আপনি বর্তমানে সরকারি চাকরি করেন, যা বৈধ। কিন্তু যদি আপনি ঘুষের মাধ্যমে বদলি করেন, তাহলে এই বদলি প্রক্রিয়া হারাম হওয়ার কারণে সেই বদলি পোস্টিং থেকে প্রাপ্ত বেতন-ভাতা হারাম হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক হানাফি ফকীহের মতে, এমন উপার্জন মাকরূহে তাহরীমি বা নাজায়েয। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেছেন:
مَنْ اكْتَسَبَ مَالًا مِنْ حَرَامٍ، ثُمَّ اسْتَفَادَ بِهِ شَيْئًا، فَذَلِكَ الشَّيْءُ حَرَامٌ عَلَيْهِ
“যে ব্যক্তি হারাম উপায়ে সম্পদ অর্জন করে, অতঃপর তা দ্বারা কোনো সুবিধা লাভ করে, সেই সুবিধা তার জন্য হারাম।” (ফতোওয়া আলমগীরী, ২/২৭২)
সুতরাং আপনার করণীয়:
১. বন্ধুকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন যে, এই পদ্ধতিতে বদলি করা আপনার জন্য জায়েয নয়, যদিও সব টাকা সে দেয়।
২. ঘুষ ছাড়া বদলির বৈধ উপায় খোঁজার চেষ্টা করুন—যেমন: নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করা, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলা ইত্যাদি।
৩. যদি ঘুষ ছাড়া কোনোভাবেই বদলি সম্ভব না হয়, তাহলে এই বদলির পরিকল্পনা বাতিল করুন এবং নিজ নিজ জায়গায় চাকরি চালিয়ে যান।
৪. তওবা-ইস্তিগফার করুন যদি ইতিমধ্যে কোনো পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন।
সারকথা:
বন্ধু টাকা দিলেও আপনি ঘুষের অংশীদার হবেন এবং গুনাহগার হবেন। আপনার উপার্জনও হারাম হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই এই পথ পরিহার করাই ঈমানের দাবি। আল্লাহ তওবা কবুল করুন ও হালাল রিজিক দান করুন। (আমিন)
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত কিতাব:
- ফতোওয়া উসমানী
- ইমদাদুল ফতোয়া
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফতোওয়া আলমগীরী
- বেহেশতী জেওর
- তাফসীরে মা‘আরিফুল কুরআন