মিরাসের নিয়ম কি নারী /পুরুষ উভয়ের সম্পত্তির জন্যই এক?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।ওয়ারিসদের মধ্যে কাউকে জমির বদলে সমপরিমাণ অর্থ দিলে কি মিরাস বণ্টন হবে?
৩।কেউ যদি মারা যাওয়ার পূর্বে দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী জমি বণ্টন করে না দিয়ে যায় ওয়ারিসদের মধ্যে, তখন এক্ষেত্রে ইসলামিক নিয়ম অনুযায়ী ওয়ারিসরা কি স্বয়ংক্রিয় ভাবে মিরাস এর নিয়ম অনুযায়ী যার যার মালিকানা পেয়ে যাবে?
Answer
উত্তর প্রদান করছি, আল্লাহ তাআলা সঠিক পথ দেখান।
প্রশ্নটি তিনটি ভাগে বিভক্ত। নিচে প্রতিটি অংশের উত্তর পবিত্র কুরআন, সহীহ হাদীস ও হানাফী ফিক্হের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে দেওয়া হলো।
১. মিরাসের নিয়ম কি নারী/পুরুষ উভয়ের সম্পত্তির জন্য এক? বাবার সম্পত্তি যেভাবে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বণ্টিত হয়, মায়ের সম্পত্তিতেও কি সন্তানদের একই রকম হক আছে?
উত্তর: হ্যাঁ, ইসলামী মিরাস আইন নারী ও পুরুষ উভয়ের সম্পত্তির ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে একই নীতি প্রযোজ্য। পিতার সম্পত্তিতে যেমন পুত্র ও কন্যার মধ্যে বণ্টন হয় (পুত্র কন্যার দ্বিগুণ পায়), তেমনি মায়ের সম্পত্তিতেও তার সন্তানদের মধ্যে একই অনুপাতে বণ্টন হবে। অর্থাৎ, মায়ের মৃত্যুর পর তার পুত্র ও কন্যারাও পিতার সম্পত্তির মতোই পুত্র : কন্যা = ২ : ১ অনুপাতে প্রাপ্য হবে।
তবে পার্থক্য হতে পারে যদি মায়ের অন্যান্য ওয়ারিস (যেমন স্বামী, পিতা-মাতা) থাকে। সেক্ষেত্রে তাদের প্রাপ্য অংশ বাদ দিয়ে সন্তানদের মধ্যে উপরের নিয়মে বণ্টন হবে। মূলনীতি হলো, সন্তানদের মধ্যে ভাগের ক্ষেত্রে পিতার সম্পত্তি ও মায়ের সম্পত্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
কুরআন:
﴿يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ ۖ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ﴾
[সূরা নিসা ৪:১১]
অর্থ: "আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন: একজন পুত্রের অংশ দুইজন কন্যার অংশের সমান।"
এই আয়াত পিতা ও মাতা উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, কারণ আয়াতে 'ওলাদ' (সন্তান) শব্দটি সাধারণ।
হানাফী কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ৬/৭৫৬-৭৫৭ তে উল্লেখ আছে, "মৃত ব্যক্তি পিতা হোক বা মাতা, সন্তানদের মাঝে ভাগের নিয়ম একই। ছেলের অংশ মেয়ের দ্বিগুণ।"
- ফাতাওয়া আলমগীরী (হিদায়ার ব্যাখ্যা): ৬/৪৫১-৪৫২ তে স্পষ্ট বলা হয়েছে, "পিতার সম্পত্তি ও মাতার সম্পত্তি উভয় ক্ষেত্রেই সন্তানদের জন্য পুত্রের দ্বিগুণ ভাগ প্রযোজ্য।"
সারসংক্ষেপ:
- বাবার সম্পত্তিতে যেমন ছেলে : মেয়ে = ২:১
- মায়ের সম্পত্তিতেও ছেলে : মেয়ে = ২:১
- তবে অন্যান্য ওয়ারিস (স্বামী, পিতামাতা ইত্যাদি) থাকলে তারা আগে নিজেদের নির্ধারিত অংশ নেবেন, তারপর সন্তানরা উত্তরাধিকারী হবে।
২. ওয়ারিসদের মধ্যে কাউকে জমির বদলে সমপরিমাণ অর্থ দিলে কি মিরাস বণ্টন হবে?
উত্তর: এটি নির্ভর করে কিভাবে এবং কখন এই অর্থ প্রদান করা হচ্ছে তার ওপর।
- যদি মিরাস বণ্টনের সময় বা তার পরে সমস্ত ওয়ারিসের সম্মতিক্রমে একজন তার জমির অংশের পরিবর্তে সমমূল্যের নগদ অর্থ গ্রহণ করেন, তবে তা জায়েয এবং এটি দ্বারা তার মিরাসের অংশ আদায় হয়ে যায়। অন্যান্য ওয়ারিসরা জমি ভোগ করতে পারেন। একে ফিকহের পরিভাষায় "تخارج" (তাখারুজ) বা আপস-নিস্পত্তি বলা হয়।
- কিন্তু যদি মৃত ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় বা মৃত্যুর পূর্বে কাউকে জমির বদলে অর্থ দিয়ে দেয়, তবে তা ওসিয়াত (উইল) হিসেবে গণ্য হবে এবং তা মৃত্যুর পর এক-তৃতীয়াংশের বেশি হলে বাকি ওয়ারিসদের অনুমতি ছাড়া কার্যকর হবে না।
সঠিক পদ্ধতি:
প্রথমে শরীয়ত অনুযায়ী প্রত্যেক ওয়ারিসের প্রাপ্য অংশ নির্ধারণ করুন। তারপর যদি একজন জমি নিতে চান এবং বাকিরা নগদ অর্থ নিতে চান, তাহলে সবাই মিলে সম্মত হয়ে জমির দাম নির্ধারণ করে নগদ অর্থ দিতে পারেন। এটি সব পক্ষের স্বেচ্ছায় হতে হবে।
হানাফী কিতাব:
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী): ৪/২৭৯-২৮১ তে বলা হয়েছে, "যদি সব ওয়ারিস সম্মত হয় তবে একজন তার ভাগের জমির বিনিময়ে নগদ অর্থ নিতে পারে। এতে বণ্টন সহজ হয়।"
- আল-হিদায়া (মারগীনানী): ৪/১২৮ তে উল্লেখ আছে, "ওয়ারিসরা নিজেদের অংশে যে কোনো ধরনের আপস করতে পারে, যতক্ষণ তা সবার ইচ্ছায় হয়।"
সতর্কতা:
- কাউকে জোর করে জমির বদলে অর্থ গ্রহণ করতে বাধ্য করা যাবে না।
- যদি কেউ অপ্রাপ্তবয়স্ক (নাবালেগ) হয়, তবে তার পক্ষে অভিভাবক সম্মতি দিলেই চলবে, তবে অভিভাবককে সতর্ক থাকতে হবে যাতে তার স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়।
৩. কেউ যদি মারা যাওয়ার পূর্বে দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী জমি বণ্টন করে না দিয়ে যায় ওয়ারিসদের মধ্যে, তখন ইসলামিক নিয়ম অনুযায়ী ওয়ারিসরা কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিরাসের নিয়মানুযায়ী যার যার মালিকানা পেয়ে যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই। মৃত্যুর পরপরই মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওয়ারিসদের মধ্যে বণ্টিত হয়ে যায়। কেউ যদি মৃত্যুর আগে কোনো বণ্টন করে না যান, তবে তার দেশীয় প্রচলিত আইন বা রীতি নির্বিশেষে শরীয়তের মিরাস আইন কার্যকর হবে।
বিস্তারিত:
ইসলামী ফিকহ অনুসারে, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি তার মৃত্যুর মুহূর্তেই তার ওয়ারিসদের কাছে স্থানান্তরিত হয়। কোনো ওয়ারিসকে আলাদাভাবে কিছু লিখে দেওয়ার বা সরকারিভাবে বণ্টনের প্রয়োজন নেই। শরীয়তের বিধানই চূড়ান্ত।
তবে ব্যবহারিক জীবনে জমি-জমার নামজারি, দলিল ইত্যাদির জন্য সরকারি নিয়ম অনুসরণ করতে হতে পারে। কিন্তু মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওয়ারিসদের প্রতি বণ্টিত হয়ে যায়।
কুরআন ও হাদীস:
-
কুরআনে বলা হয়েছে: ﴿لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ ۚ نَصِيبًا مَفْرُوضًا﴾
[সূরা নিসা ৪:৭]
অর্থ: "পুরুষদের অংশ আছে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে, আর নারীদেরও অংশ আছে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে—তা অল্প হোক বা বেশি হোক; এটি নির্ধারিত অংশ।" -
হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
"إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ، فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ"
অর্থ: "নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক অধিকারীর অধিকার দান করেছেন। সুতরাং ওয়ারিসের জন্য ওসিয়াত (উইল) নেই।" (তিরমিজি, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)
হানাফী কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ৬/৭৫৪ তে উল্লেখ আছে, "মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই মিরাসের মালিকানা ওয়ারিসদের মধ্যে বণ্টিত হয়ে যায়, এমনকি তারা যদি না জানে বা বিভাজন না করে তবুও শরীয়তের দৃষ্টিতে তারা মালিক।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানবী): ৪/২৪৩-২৪৪ তে বলা হয়েছে, "মৃতের সম্পত্তি শরয়ী অংশ অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওয়ারিসদের হয়। কারো সম্মতি বা অংশ নেওয়ার প্রয়োজন নেই।"
ব্যবহারিক নির্দেশনা:
যদি দেশের প্রচলিত আইনে (যেমন বাংলাদেশের পারিবারিক আইন) ভিন্ন কিছু বলা থাকে, তবে ইসলামী আইন অনুযায়ী ওয়ারিসদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে। সরকারি দলিল-নামজারি শরীয়তের বণ্টন অনুযায়ী করাতে হবে। তবে মালিকানা শরয়ী নিয়মেই প্রতিষ্ঠিত।
চূড়ান্ত উপদেশ:
- মিরাস একটি ফরজ ইবাদত। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।
- জটিল ক্ষেত্রে (যেমন ভিন্ন ভিন্ন স্তরের ওয়ারিস, ঋণ থাকা ইত্যাদি) একজন আলেম বা মুফতি এর সাহায্য নিন।
- সবকিছুতে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আবশ্যক।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন।
উত্তর প্রদানে সহায়ক কিতাবসমূহ:
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানবী)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফাতাওয়া আলমগীরী
- আল-হিদায়া
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী)
- বেহেশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানবী)