কোম্পানি কর্তৃক টাকা আত্মসাৎ প্রসঙ্গে
Halal and Haram · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেবগণ,
আমি এক কাছের আত্মীয় দম্পতির মাধ্যমে ২০১৫ সালে একটি চাকরির সুযোগের কথা জানতে পারি। তখন তিনাদের সাথে ঢাকা যাই এবং সেই কোম্পানির একটা প্রোগ্রামে জয়েন করি। সেখানে অনেক সুন্দর সুন্দর বক্তব্য তারা দেয় এবং একজন হাজী সাহেবকেও দেখি যিনি কোম্পানির উর্ধতন কেউ ছিলেন। তিনাদের মতো মানুষ দেখে আমরা অনেক বিশ্বাস পাই কোম্পানির প্রতি।
প্রোগ্রাম শেষে তারা আমাদের ৩ জন কে নিয়োগ দেয় এবং নিয়োগের লেটারও দেয়। সাথে তারা এটাও বলে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে বেশ কিছু মানুষকে আমাদের মাধ্যেমে নিয়োগ করাতে হবে।
তো ঢাকা থেকে এসে আমি বেশ কিছু বন্ধু বান্ধব কে সেখানে জয়েন করাই। প্রাই সবার প্রয়োজনীয় কাগজ এবং সাথে ১০০০ টাকা কোম্পানির আবেদন ফর্ম বাবদ নিয়ে সেই ডকুমেন্টস গুলো এবং সর্বমোট প্রায় ১৫ হাজার টাকার মতো কোম্পানিকে পাঠিয়ে দেই। এবং তাদের তরফ থেকে ফাইনাল জয়েন করানোর এবং চাকরি শুরু হবে এই অপেক্ষা করতে থাকি।
কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পরে দেখলাম তারা আমাদের টাকা আত্মসাৎ করে ফেলেছে। ফোন দিলে ঠিকভাবে কথা বলে না এবং একে অন্যকে দেখিয়ে দেয় এবং তাদেরকে কল করতে বলে আমি ধারাবাহিকভাবে তাদেরকে কল দেই কিন্তু টাকাও ফেরত দেয় না এবং কোন চাকরিও না।
এমতাবস্থায় আমি বন্ধু-বান্ধবদের সামনে লজ্জিত হই একে এই টাকা আত্মসাৎ করার বিষয়টা আমি অবহিত করি। তারা বলে যে আমাদের টাকা ফেরত দাও তখন আমি বলি যে ভাই আমারও তো টাকা এখানে তারা আত্মসাৎ করেছে আমরা বুঝতে পারিনি যে তারা আমাদের টাকা এভাবে মেরে দিবে। আর চাকরি হলে তো আমরা সবাই মিলেই চাকরি করতাম আর আমি তো তোমাদের ভালোর জন্যই তোমাদেরকে এখানে জয়েন করতে উৎসাহ প্রদান করি যেহেতু থেকে তাদের হালত ভালো দেখেই এসেছিলাম ঢাকা থেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো তারা প্রতারণার আশ্রয় নিলো।
আমার সেই আত্মীয় দম্পতিও জানতেন না যে সেই কোস্পানি এভাবে টাকা আত্মসাৎ করে ফেলবে।
এখন আমার প্রশ্ন হল যে এখানে শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে আমার দায় আসলে কতটুকু? আমি তাদের হক নষ্ট করার কারণে সরাসরি আমি কি গুনাগার হবো? বা আমাকে কি তাদের সেই টাকা নিজের পকেট থেকে ফেরৎ দেয়া আবশ্যক? নাকি সেই কোস্পানির লোকেরা গুনাগার হবে?
এখানে আমার আরো যদি কোন কিছু করণীয় থাকে সেটা দয়া করে জানাবেন প্লিজ।
উল্লেখ্য থাকে যে বন্ধুবান্ধবদের বুঝিয়ে বললে তারা পরবর্তী সময়ে আমার এই কথাটাকে মেনে নেন এবং পরবর্তীতে আমার সাথে আর কোন খারাপ আচরণ বা আমার উপরে কোন চাপ প্রয়োগ করেন নি।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটি মনোযোগ সহকারে পড়েছি। আপনার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের কোম্পানির মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনা সত্যিই দুঃখজনক। আপনি নিজেও এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন এবং আপনার মাধ্যমে অন্যরাও শিকার হয়েছে। এখন শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার দায়িত্ব ও করণীয় কী, তা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
১. আপনার দায়িত্ব ও গুনাহের পরিমাণ:
আপনি নিজেও সেই কোম্পানির প্রতারণার শিকার। আপনি সত্যিই বিশ্বাস করেছিলেন যে কোম্পানি সৎ এবং তাদের মাধ্যমে চাকরি পাওয়া যাবে। তাই আপনি যখন বন্ধু-বান্ধবদের উৎসাহ দিয়েছিলেন, তখন আপনার নিয়ত ছিল তাদের কল্যাণ করা, প্রতারণা নয়। তাই আপনি সরাসরি গুনাহগার হবেন না যতক্ষণ না আপনি জানতেন যে কোম্পানি প্রতারক। কেননা কুরআনে আল্লাহ বলেন:
"وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ أُخْرٰى" (سورة الأنعام: 164) অর্থ: "কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না।"
সুতরাং, যারা টাকা আত্মসাৎ করেছে, তারাই মূলত গুনাহগার। তবে আপনি পরোক্ষভাবে দায়ী হতে পারেন, কারণ আপনি তাদের উৎসাহ দিয়েছিলেন এবং তাদের বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন। হাদীসে এসেছে:
"مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ" (صحيح مسلم) অর্থ: "যে ব্যক্তি ভালো কাজের দিকে পথ দেখায়, সে সে কাজ সম্পাদনকারীর সমান সওয়াব পায়।"
কিন্তু এখানে ভালো কাজের পরিবর্তে ক্ষতি হয়েছে। তাই আপনি যদি প্রতারণার ব্যাপারে সচেতন না হয়ে থাকেন, তবে আপনার ওপর গুনাহ নেই। তবে নৈতিক দায়িত্ব আপনার ওপর বর্তায়।
২. টাকা ফেরত দেওয়ার বিধান:
শরীয়তের দৃষ্টিতে, আপনি যদি কারো টাকা আত্মসাৎ করে থাকেন বা ক্ষতি করে থাকেন, তবে তা ফেরত দেওয়া আবশ্যক (ওয়াজিব)। কিন্তু এখানে আপনি নিজে টাকা আত্মসাৎ করেননি, বরং কোম্পানি আত্মসাৎ করেছে। তাই আপনার নিজের পকেট থেকে টাকা ফেরত দেওয়া আবশ্যক নয়, যতক্ষণ না আপনি কোম্পানির প্রতিনিধি বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দায়ী হন। বরং কোম্পানির লোকেরাই এই টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য দায়ী।
তবে আপনার জন্য উত্তম হবে যদি আপনি তাদেরকে বুঝিয়ে বলেন যে, আপনিও প্রতারিত হয়েছেন এবং আপনার ওপর চাপ না দিতে অনুরোধ করেন। যদি তারা আপনার কথা না মানে এবং আপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তবে আপনি তাদের টাকা নিজের পকেট থেকে ফেরত দিতে পারেন, কিন্তু এটি ওয়াজিব নয়, বরং এটি একটি সওয়াবের কাজ হবে।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর মতে, যে ব্যক্তি অপরকে কোনো লাভজনক কাজে উৎসাহিত করে এবং পরে দেখা যায় সে কাজটি ক্ষতিকর, তবে উৎসাহদাতার ওপর ক্ষতিপূরণ দেওয়া আবশ্যক নয় যদি না সে প্রতারণার সাথে জড়িত থাকে। (ফাতাওয়া আলমগিরী, ৪/৪১০)
৩. করণীয়:
প্রথমত, আপনি যাদের মাধ্যমে টাকা দিয়েছেন, তাদেরকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন যে আপনি নিজেও প্রতারিত হয়েছেন। আপনি তাদের টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন। তবে নিজে থেকে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু যদি তাদের চাপ সহ্য করতে না পারেন, তবে নিঃস্বার্থভাবে তা করে দিতে পারেন, এটি সওয়াবের কাজ হবে।
দ্বিতীয়ত, আপনার কর্তব্য হলো এই প্রতারণা থেকে অন্যদের সতর্ক করা। আপনি যদি জানতে পারেন যে কোম্পানি প্রতারক, তবে অন্যদের সতর্ক করা আপনার দায়িত্ব।
তৃতীয়ত, আপনার আত্মীয় দম্পতিও যদি জানতেন না যে কোম্পানি প্রতারক, তবে তাদের ওপরও দোষ নেই।
উপসংহার:
- আপনি সরাসরি গুনাহগার নন, কারণ আপনি প্রতারণার সাথে জড়িত ছিলেন না।
- আপনার নিজের পকেট থেকে টাকা ফেরত দেওয়া আবশ্যক নয়, তবে আপনি যদি সওয়াবের উদ্দেশ্যে তা করেন, তাহলে তা উত্তম।
- প্রতারক কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা এবং তাদের সতর্ক করা আপনার কর্তব্য।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ও আপনার বন্ধু-বান্ধবদের ধৈর্য দান করুন। আমীন।
(إمداد الفتاوى، ٤/٤٥٤، فتاوی عثمانی، ٢/٥٦٧، رد المحتار، ٦/٤٠٠)