গুনাহ করলে কি ঈমান চলে যায়?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: ইসলামিক নাম বা ইসলামিক কোনো জিনিস (যেমন পবিত্র কুরআন, তাসবিহ, জায়নামাজ ইত্যাদি) সাথে থাকা অবস্থায় গুনাহ করলে কি ঈমান চলে যায়?
উত্তর
না, গুনাহ করার কারণে সাধারণত ঈমান চলে যায় না। তবে গুনাহের ধরন ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এর ব্যতিক্রম হতে পারে। নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
১. ঈমান ও গুনাহের সম্পর্ক
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের বিশ্বাস অনুযায়ী, ঈমান হলো অন্তরের বিশ্বাস, মুখের স্বীকৃতি ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলের সমষ্টি। ছোট-বড় কোনো গুনাহ করলেই ঈমান নষ্ট হয় না, যতক্ষণ না那个人 সেই গুনাহকে হালাল মনে করে বা ইসলামের কোনো মৌলিক বিশ্বাস অস্বীকার করে।
ইমাম তাহাবী (রহ.) তার ‘আল-আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ’-তে বলেন:
"আমরা বলি না যে, কোনো মুসলিম তার গুনাহের কারণে ঈমান থেকে বের হয়ে যাবে, যদিও সে কবিরা গুনাহ করে থাকে।"
(শরহু আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ, বাবু হুকমি আহলিল কাবাইর)
২. হানাফি ফিকহের মূলনীতি
হানাফি মাযহাবে গুনাহ ও ঈমানের বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি রয়েছে:
- গুনাহ করলে ঈমান যায় না, বরং ঈমানের পূর্ণতা হ্রাস পায়।
- কেউ যদি কোনো হারাম কাজকে হালাল মনে করে বা জেনে-শুনে ইসলামের কোনো বিধানকে অস্বীকার করে, তবে তা কুফরি।
- শুধু নাম বা বাহ্যিক কোনো জিনিস থাকার কারণে গুনাহ করলে ঈমান চলে যাবে—এমন কোনো কথা নেই।
ইবনু আবেদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ উল্লেখ করেন:
“লা ইয়াখরুজুল আব্দু মিনাল ইমানি ইল্লা বিল জুহুদি আও ইসতিহলালি হারামিন”
অর্থ: “বান্দা কেবল অস্বীকার (জুহুদ) বা হারামকে হালাল মনে করা (ইসতিহলাল) ছাড়া ঈমান থেকে বের হয় না।”
(রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুস সিয়াম, বাবু মুফতিরাতিস সাওম)
৩. ইসলামিক নাম বা সাথের জিনিসের কোনো প্রভাব নেই
আপনার প্রশ্নে "ইসলামিক নাম বা ইসলামিক অন্য কিছু সাথে বা আশে পাশে থাকা" বলতে বোঝানো হয়েছে—যেমন কারো নাম ‘আব্দুল্লাহ’ বা ‘মুহাম্মদ’, অথবা তার কাছে কুরআন শরীফ বা তাসবিহ আছে— এমন অবস্থায় যদি সে গুনাহ করে, তবে কি ঈমান চলে যাবে?
উত্তর: ইসলামিক নাম বা কোনো পবিত্র জিনিস নিজের কাছে থাকা গুনাহের মাত্রা বা ঈমান যাওয়ার কারণ নয়। গুনাহ করলে সে মুসলিম হিসেবেই গুনাহগার হবে, তবে ঈমান বাকি থাকবে।
কিন্তু যদি কেউ কুরআন শরীফকে অসম্মান করে বা পবিত্র নাম নিয়ে ঠাট্টা করে, তাহলে সেটি কুফরি হতে পারে। (বিস্তারিত দেখুন: ফতোয়ায়ে উসমানি, জিলদ ১, বাবুল কুফর)
৪. হাদিসের আলোকে
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে সাহাবিগণ বিভিন্ন গুনাহ করতেন, কিন্তু তাদের কাউকেই কাফির বলা হতো না। বরং তাদের তওবা করার নির্দেশ দেওয়া হতো।
"মুমিন ব্যক্তি যিনা করলেও মুমিন থাকে, চুরি করলেও মুমিন থাকে, মদ পান করলেও মুমিন থাকে…"
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৭৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৭)
উপরোক্ত হাদিস স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, গুনাহ করলে ঈমান যায় না; বরং ঈমান থাকা অবস্থায় গুনাহ হয় এবং তার জন্য শাস্তি বা তওবার প্রয়োজন হয়।
৫. ব্যতিক্রম: যখন গুনাহ ঈমান নষ্ট করে
কিছু নির্দিষ্ট কাজ ঈমান নষ্ট করে দেয়। যেমন:
- কুফরি কালাম বলা (যেমন: আল্লাহ বা রাসুলকে গালি দেওয়া)
- ইসলামের কোনো ফরজ বা হারামকে অস্বীকার করা
- ইসলামের কোনো বিষয়কে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা (সূরা তাওবা: ৬৫-৬৬)
- শিরক করা বা অন্য কোনো মাজহাবকে সত্য বলে মেনে নেওয়া যেটি ইসলামবিরোধী
সাধারণ গুনাহ (যেমন: মিথ্যা বলা, গিবত করা, সুদ খাওয়া ইত্যাদি) ঈমান নষ্ট করে না, তবে ঈমানের পূর্ণতা নষ্ট করে এবং কবিরা গুনাহের শাস্তি ভোগ করতে হবে।
৬. উপসংহার
- ইসলামিক নাম বা ইসলামিক জিনিস সাথে থাকা অবস্থায় সাধারণ গুনাহ করলে আপনার ঈমান চলে যাবে না।
- তবে গুনাহকে ছোট মনে করা উচিত নয়। প্রতিটি গুনাহ থেকে তওবা করা ফরজ।
- ঈমান রক্ষার জন্য সর্বদা সতর্ক থাকা এবং ইলমে দ্বীন অর্জন করা জরুরি।
“মুমিন তো তারাই, যারা যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়, তখন তাদের অন্তর কম্পিত হয় এবং যখন তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারা তাদের রবের ওপর ভরসা করে।”
(সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ২)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার এবং ঈমানের ওপর অটল থাকার তওফিক দান করুন। (আমিন)
সংক্ষিপ্ত জবাব
না, গুনাহ করলে সাধারণত ঈমান চলে যায় না। শুধু ইসলামিক নাম বা কোনো জিনিস থাকা অবস্থায় গুনাহ করলেও ঈমান যায় না। তবে যদি কেউ গুনাহকে হালাল মনে করে বা ইসলামের কোনো মৌলিক বিষয় অস্বীকার করে, তাহলে সে ঈমান থেকে বের হয়ে যাবে।