ইসরায়েল-সম্পৃক্ত অবস্থানের কারণে লিওনেল মেসির সমালোচনা, ট্রল ও উপহাস করা কি শরিয়ত সম্মত?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2574
Questioner: Md. Nuhan Tahery
Question Asked: 12 Jul 2026, 04:35 AM
Reviewed & Published: 12 Jul 2026, 05:03 AM
Views: 95
Tokens: 8,699
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

সম্মানিত আলেম ও মুফতিগণের নিকট একটি শরয়ি মাসআলা জানতে চাই।

যদি কোনো অমুসলিম ব্যক্তি, যেমন লিওনেল মেসি, ইসরায়েলি বা ইসরায়েল-সম্পৃক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক বা প্রচারণামূলকভাবে যুক্ত থাকেন, তাহলে একজন মুসলিম তার এ ধরনের অবস্থানের সমালোচনা করতে পারবেন কি?

পাশাপাশি দেখা যায়, অনেকেই এ কারণে শুধু তার ওই অবস্থানের সমালোচনাই করেন না; বরং তার খেলাধুলার বিষয়গুলো নিয়েও ব্যঙ্গ, ট্রল ও উপহাস করেন। যেমন, পেনাল্টি মিস করা, ম্যাচে খারাপ পারফরম্যান্স, লাল কার্ড পাওয়া বা এ ধরনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সার্কাস্টিক পোস্ট, মিম বা বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেন। যদিও এতে সরাসরি অশ্লীল গালি দেওয়া হয় না, তবুও উদ্দেশ্য থাকে তাকে হেয় বা উপহাস করা।

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এ ধরনের সমালোচনা, ট্রল, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ বা উপহাস একজন মুসলিমের জন্য কতটুকু বৈধ? কোনো ব্যক্তির বিতর্কিত অবস্থানের কারণে তার খেলাধুলার বিষয় নিয়েও এভাবে উপহাস করা কি ইসলামী আখলাকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নাকি সমালোচনারও শরিয়ত নির্ধারিত সীমারেখা রয়েছে?

অনুগ্রহ করে কুরআন, সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহি দলিলের আলোকে দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি একজন মুসলিমের পক্ষ থেকে কোনো অমুসলিম ব্যক্তি (যেমন লিওনেল মেসি) – যে ইসরায়েল বা ইসরায়েল-সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত – তার এ অবস্থানের সমালোচনা এবং তার খেলাধুলার ব্যর্থতা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, ট্রল ও উপহাস করার শরঈ বিধান জানতে চেয়েছেন। কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে নিম্নে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হলো।

১. ইসলামের দৃষ্টিতে সমালোচনার সীমারেখা

ইসলামে মতামত ও কর্মের সমালোচনা করার অনুমতি আছে, তবে তা অবশ্যই ন্যায়পরায়ণতা, শালীনতা ও লক্ষ্যসীমার মধ্যে হতে হবে। অমুসলিম ব্যক্তির কোনো অন্যায় বা ইসলামবিরোধী অবস্থানের সমালোচনা করা বৈধ, যদি তা নিম্নোক্ত শর্তে হয়:

  • উদ্দেশ্য হয় অন্যায় প্রতিরোধ ও সত্য প্রতিষ্ঠা (আমর বিল মা‘রূফ ওয়া নাহি ‘আনিল মুনকার)।
  • সমালোচনা সরাসরি তার সেই নির্দিষ্ট অবস্থান বা কর্মের উপর হয়, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অপমান নয়।
  • তা কুরআন-হাদীসের নির্দেশিত নম্রতা ও হিকমতের সাথে হয় (সূরা নাহল ১৬:১২৫)।

অতএব, মেসি বা অন্য কোনো ব্যক্তি যদি প্রকাশ্যে ইসরায়েলের পক্ষে সমর্থন বা প্রচারণার সাথে যুক্ত থাকেন, তবে মুসলিম হিসেবে তার এ অবস্থানের সমালোচনা করা যেতে পারে – তবে তা সরাসরি তার ব্যক্তিত্ব বা ব্যক্তিগত জীবনের ওপর আক্রমণ না হয়ে বরং তার ভুল অবস্থান ও তার প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য হতে হবে।

২. উপহাস, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও ট্রল করার নিষেধাজ্ঞা

কুরআন ও হাদীসে যেকোনো মানুষের প্রতি উপহাস, ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও ট্রল করা স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষিত হয়েছে, চাই সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম।

কুরআনের আয়াত:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَىٰ أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّن نِّسَاءٍ عَسَىٰ أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ ۖ وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ “হে মুমিনগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; কেননা তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। আর নারীরা যেন অন্য নারীদের উপহাস না করে; কেননা তারা উপহাসকারিণীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। আর তোমরা নিজেদের মধ্যে দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ ডাকনামে ডেকো না।” (সূরা হুজুরাত ৪৯:১১)

এই আয়াত সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য – মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের জন্যই। কাউকে উপহাস করা তার ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নিষিদ্ধ।

وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ “দুর্বিপাক প্রত্যেকের জন্য যে পিছনে ও সামনে মানুষের দোষ বর্ণনা করে (বা কটাক্ষ করে)।” (সূরা হুমাযাহ ১০৪:১)

হাদীস: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ “সেই প্রকৃত মুসলিম যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১০)

যদিও এই হাদীসে ‘মুসলিম’ শব্দ এসেছে, তবে ইসলামী আখলাক ও আদব অমুসলিমদের প্রতিও ভালো ব্যবহার ও সম্মান শিক্ষা দেয়। অমুসলিমদের গালি দেওয়া, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা বা তাদের দুর্বলতা নিয়ে ট্রল করাও ইসলামী শিক্ষা পরিপন্থী।

إِنَّ اللَّهَ يُبْغِضُ الْفَاحِشَ الْبَذِيءَ “নিশ্চয় আল্লাহ অশ্লীল বক্তা ও অভিশাপকারীকে অপছন্দ করেন।” (তিরমিযী, হাদীস: ২০১৯)

لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلَا اللَّعَّانِ وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَذِيءِ “মুমিন তায়না দেয় না, অভিশাপ দেয় না, অশ্লীল ও অমার্জিত কথা বলে না।” (তিরমিযী, হাদীস: ১৯৭৭)

৩. বিশেষ প্রসঙ্গ: ক্রীড়া ব্যর্থতা নিয়ে উপহাস

লিওনেল মেসি বা অন্য কোনো ব্যক্তির খেলাধুলার ব্যর্থতা (যেমন পেনাল্টি মিস, লাল কার্ড, খারাপ পারফরম্যান্স) – যা তার ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা পেশাগত ভুল – তা নিয়ে মিম, সার্কাস্টিক পোস্ট বা উপহাস করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ:

  • এটি সরাসরি ‘সুখরিয়্যাহ’ (ঠাট্টা-বিদ্রূপ) – যা কুরআনে হারাম বলা হয়েছে।
  • এটি ব্যক্তির অপমান ও হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে হয় – যা ইসলামী আখলাকের সম্পূর্ণ বিপরীত।
  • এমনকি অমুসলিম হলেও, তার প্রতি ন্যায়বিচার ও ইনসাফের দাবি হলো তার দুর্বলতাকে অস্ত্র বানিয়ে তাকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত না করা।

হাদীসে এসেছে:

يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يَدْخُلِ الْإِيمَانُ قَلْبَهُ لَا تَغْتَابُوا الْمُسْلِمِينَ وَلَا تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ “হে তারা যারা মুখে ঈমান এনেছ কিন্তু অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি, তোমরা মুসলিমদের গীবত করো না এবং তাদের দোষ-ক্রটি সন্ধান করো না।” (আবু দাউদ, হাদীস: ৪৮৮০)

যদিও এখানে ‘মুসলিম’ বলা হয়েছে, তবে অমুসলিমের দোষ খোঁজা ও তা প্রকাশ্যে উপহাসের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করাও শরীয়তে অপছন্দনীয়, কারণ তা এক ধরনের জুলুম ও অশালীনতা।

৪. হানাফি ফিকহের দলিল

হানাফি মাযহাবে ‘গীবত’ (কারো অনুপস্থিতিতে এমন কথা বলা যা সে শুনলে অপছন্দ করবে) এর বিধান প্রসিদ্ধ। ইবনে আবেদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার-এ বলেন:

الغيبة: ذكر العيب بما يكرهه المذكور ولو كان فيه، وهي حرام بالكتاب والسنة والإجماع “গীবত হলো ঐ দোষ বর্ণনা করা যা ব্যক্তি অপছন্দ করে, যদিও তা তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে। এটি কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা হারাম।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৯)

এখানে উল্লেখ্য যে, কোনো ব্যক্তির অন্যায় অবস্থানের সমালোচনা যদি ‘নাসীহাত’ (উপদেশ) বা অন্যায় প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে হয় এবং তা পরিমিতভাবে করা হয়, তবে তা গীবতের আওতাভুক্ত নয়। কিন্তু তার ব্যক্তিগত পেশাগত ত্রুটি বা দুর্বলতা – যা তার ধর্মীয় বা নৈতিক অবস্থানের সাথে সম্পর্কিত নয় – তা নিয়ে উপহাস করা কোনো অবস্থাতেই জায়েয নয়। কেননা তা গীবত ও সুখরিয়্যাহ উভয়ই।

৫. সারসংক্ষেপ ও দিকনির্দেশনা

| বিষয় | ইসলামী বিধান | কারণ | |------|--------------|------| | মেসির ইসরায়েল-সম্পৃক্ত অবস্থানের সমালোচনা | বৈধ (নাসীহাত ও সত্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে) | অন্যায় অবস্থানের বিরুদ্ধে সচেতনতা জরুরি। কুরআন-সুন্নাহ এ ধরনের সমালোচনার অনুমতি দেয়। | | তার খেলাধুলার ব্যর্থতা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, মিম, ট্রল | হারাম ও নিষিদ্ধ | এটি সুখরিয়্যাহ ও গীবত। কুরআন (হুজুরাত ৪৯:১১, হুমাযাহ ১০৪:১) ও হাদীসে নিষিদ্ধ। ইসলামী আখলাকের পরিপন্থী। | | তার পোশাক-আশাক, চেহারা, পরিবার ইত্যাদি নিয়ে উপহাস | হারাম | একই যুক্তি – ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ ও অপমান। | | প্রচারণা ও ব্যাবসায়িক অংশীদারিত্বের পদ্ধতি নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা | বৈধ, সীমারেখার মধ্যে | অন্যায়ের সাথে সম্পৃক্ততার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ জায়েয, কিন্তু ব্যক্তিক অপমান নয়। |

উপসংহার

প্রিয় প্রশ্নকারী, আপনি যে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে সমালোচনার অধিকার আছে, কিন্তু তারও সীমারেখা আছে:

  1. অবস্থানের সমালোচনা – আপনি মেসির ইসরায়েল-সম্পৃক্ত কোনো পদক্ষেপ বা অবস্থানের সমালোচনা করতে পারেন, যদি তা ন্যায় ও সত্যের পক্ষে হয় এবং অশালীনতা বা অপমানমুক্ত হয়।
  2. ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নিয়ে উপহাস – এটি যে কোনো অবস্থায়ই নিষিদ্ধ। মেসির পেনাল্টি মিস, লাল কার্ড ইত্যাদি নিয়ে ট্রল করা, মিম তৈরি করা বা বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করা মুসলিমের জন্য বৈধ নয়। কারণ এতে উদ্দেশ্য থাকে তাকে হেয় করা, যা স্পষ্টভাবে হারাম।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে উত্তম আখলাকের পথে চালিত করুন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সঠিক পদ্ধতিতে সোচ্চার হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

রেফারেন্স সমূহ:

  1. সূরা হুজুরাত (৪৯:১১) – উপহাস নিষেধ।
  2. সূরা হুমাযাহ (১০৪:১) – পিছনে ও সামনে দোষ বর্ণনার শাস্তি।
  3. সহীহ বুখারী, হাদীস: ১০ – মুসলিমের জিহ্বা ও হাত থেকে নিরাপত্তা।
  4. তিরমিযী, হাদীস: ২০১৯ – অশ্লীল ও অভিশাপকারীকে আল্লাহ অপছন্দ করেন।
  5. তিরমিযী, হাদীস: ১৯৭৭ – মুমিন তায়না দেয় না, অভিশাপ দেয় না।
  6. আবু দাউদ, হাদীস: ৪৮৮০ – গীবত ও দোষ খোঁজা নিষেধ।
  7. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) ৬/৩৬৯ – গীবতের সংজ্ঞা ও হারাম হওয়া।
  8. ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী) – “অমুসলিমের গীবত” সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা (প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অনুমতি, অন্যথায় নিষেধ)।
  9. ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) – “অমুসলিমের প্রতি রসিকতা ও উপহাস” সম্পূর্ণ নাজায়েয।

আল্লাহু আলাম (আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞান রাখেন)।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.