মেসির ভক্ত হওয়া ও ইসরাইল-সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পর্ক: ইসলামের দৃষ্টিতে শরয়ি হুকুম কী? (সবচেয়ে উপযুক্ত)
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
সম্মানিত আলেম, মুফতি ও বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের নিকট একটি গুরুত্বপূর্ণ শরয়ি মাসআলা জানতে চাই।
যদি কোনো মুসলিম বা অমুসলিম বিখ্যাত ব্যক্তি, যেমন লিওনেল মেসি, কোনো ইসরাইলি কোম্পানি বা ইসরাইল-সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানের (যেমন Sirin Labs) ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হন বা তাদের পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের প্রচারণায় অংশ নেন, তাহলে একজন মুসলিমের দৃষ্টিতে এ বিষয়টির শরয়ি হুকুম কী?
বর্তমানে অনেকেই যুক্তি দিচ্ছেন যে, খেলা ও রাজনীতি এক বিষয় নয়, ধর্মীয় বিশ্বাস ও পেশাগত বা ব্যবসায়িক সম্পর্কও এক নয়। আবার কেউ বলেন, একজন খেলোয়াড়ের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের সঙ্গে তার ফুটবল প্রতিভাকে মিলিয়ে দেখা উচিত নয়। এসব যুক্তির কারণে অনেক মুসলিম এখনও মেসির ভক্ত বা সমর্থক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেন।
এ অবস্থায় জানতে চাই, উপরোক্ত বাস্তবতা বিবেচনায় একজন মুসলিমের জন্য মেসির ভক্ত বা ফ্যান হওয়া, তাকে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করা, তার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা বা সমর্থন প্রকাশ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে কতটুকু বৈধ?
এক্ষেত্রে কেউ যদি দাবি করে, সে ব্যক্তি মেসির ফ্যান নয়, কেবল খেলার ফ্যান, তার এই অবস্থান ইসলামি ও নৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে কতটুকু সঠিক?
পাশাপাশি, এ বিষয়কে কেন্দ্র করে অনেকেই মেসির কঠোর সমালোচনা করছেন, তাকে উপহাস করছেন, গালমন্দ করছেন বা অপমানজনক ভাষায় আক্রমণ করছেন। একজন অমুসলিম হলেও, এ ধরনের আচরণ ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে কতটুকু বৈধ? কুরআন ও সুন্নাহ এ বিষয়ে কী দিকনির্দেশনা দেয়?
এছাড়া এ বিষয়কে কেন্দ্র করে অনেক মুসলিম পরস্পরের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা, কটূক্তি, গালমন্দ, অপমান বা একে অপরকে ফাসিক, গোমরাহ ইত্যাদি বলে আক্রমণ করছেন। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একজন মুসলিমের এ ধরনের আচরণ কতটুকু বৈধ? মতপার্থক্য হলে একজন মুসলিমের করণীয় কী হওয়া উচিত?
অনুগ্রহ করে কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহি দলিলের আলোকে এ বিষয়ে স্পষ্ট ফতোয়া বা দিকনির্দেশনা প্রদান করলে উপকৃত হব।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক। নিচে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে পর্যায়ক্রমে উত্তর প্রদান করা হলো।
১. লিওনেল মেসির প্রতি ‘ভক্ত’ বা ‘ফ্যান’ হওয়ার শরয়ি বিধান
মেসি একজন ফুটবলার হিসেবে দক্ষ হলেও তিনি ইসরাইলি কোম্পানি Sirin Labs-এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। ইসরাইল বর্তমানে ফিলিস্তিনিদের ওপর জুলুম-নিপীড়ন চালাচ্ছে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ
"তোমাদের মধ্যে যে তাদের (অত্যাচারীদের) বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে, সে অবশ্যই তাদের দলভুক্ত।" (সূরা আল-মায়েদা ৫:৫১)
সারসংক্ষেপ:
- মেসির সঙ্গে তার ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক অবস্থান যুক্ত। তাই তাকে ‘আদর্শ’ বা ‘রোল মডেল’ হিসেবে গ্রহণ করা, তার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা ও সমর্থন প্রদর্শন করা, অথবা তার প্রচারিত পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে ইসরাইলি অর্থনীতিতে সাহায্য করা নাজায়েয ও গুনাহের কাজ।
- শুধু খেলার দক্ষতার প্রশংসা করা (যেমন: তার গোল, ড্রিবলিং) যদি তাকে ‘আদর্শ’ বানানো না হয় এবং তার অন্যায় কর্মকাণ্ডকে সমর্থন না করে, তাহলে সেটা জায়েয। তবে সাধারণ মুসলমানদের জন্য এতেও সতর্কতা জরুরি, কারণ এরূপ প্রশংসা তাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে, যা পরোক্ষভাবে তার অন্যায়কে সমর্থনের নামান্তর।
হাদিসে এসেছে:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
"যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।" (আবু দাউদ, হাদিস: ৪০৩১)
মেসির ‘ফ্যান’ হওয়া মানে তার জীবনের অন্যান্য দিককে (যেমন ইসরাইলি কোম্পানির সাথে সম্পর্ক) উপেক্ষা করা নয়। বরং একজন মুসলিমের কর্তব্য হলো ন্যায়ের পক্ষে ও অন্যায়ের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া (সূরা আল-মায়েদা ৫:২)।
২. “খেলা ও রাজনীতি আলাদা” – এই যুক্তির শরয়ি মূল্যায়ন
এটি একটি ভিত্তিহীন যুক্তি, কারণ:
- খেলা একটি মাধ্যম, কিন্তু এর সাথে জড়িত ব্যক্তির নৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে খেলাকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।
- মেসি যখন ইসরাইলি কোম্পানির পণ্য প্রচার করেন, তখন তার নাম ও প্রতিভা ব্যবহার করে ইসরাইলকে বৈধতা ও সমর্থন দেওয়া হয়। এই কাজে অংশগ্রহণ করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য নিষিদ্ধ।
আল্লাহ বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
"সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পর সাহায্য করো, আর পাপ ও সীমালংঘনে একে অপরকে সাহায্য করো না।" (সূরা আল-মায়েদা ৫:২)
সুতরাং: শুধু ‘খেলার ফ্যান’ থাকার দাবি করলেও বাস্তবে মেসির জনপ্রিয়তা ও ব্যবসায়িক স্বার্থ উভয়ই বৃদ্ধি পায়। তাই এ থেকে দূরে থাকাই উত্তম।
৩. মেসির সমালোচনা, উপহাস বা গালমন্দ করা – ইসলামী দৃষ্টিকোণ
মেসি অমুসলিম হলেও তাকে অপমান, উপহাস বা গালাগাল করা জায়েয নয়। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ
"তোমরা তাদের (মুশরিকদের) মাবুদদের গালি দিও না, তাহলে তারা ধৃষ্টতা করে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি দেবে।" (সূরা আল-আনআম ৬:১০৮)
তাছাড়া, প্রত্যেক মুসলিমকে শালীন ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
لَّا يُحِبُّ اللَّهُ الْجَهْرَ بِالسُّوءِ مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا مَن ظُلِمَ
"আল্লাহ পছন্দ করেন না যে, কারও সম্পর্কে মন্দ কথা প্রকাশ্যে বলা হোক, তবে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে সে ভিন্ন।" (সূরা আন-নিসা ৪:১৪৮)
সুতরাং: মেসির অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে গঠনমূলক ও ভদ্র সমালোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিত্ব হানন, উপহাস, অশ্লীল ভাষা ব্যবহার হারাম। কারণ এতে ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় এবং মুসলিমরা নিজেরাই গুনাহগার হয়।
৪. মুসলিমদের মধ্যে পরস্পর কঠোর আক্রমণ, গালমন্দ ও ফাসিক-গোমরাহ বলার বিধান
এটি আরও গুরুতর অপরাধ। কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَىٰ أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ
"হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অপর সম্প্রদায়কে উপহাস না করে, কেননা তারা তাদের চেয়ে উত্তম হতে পারে।" (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১১)
এছাড়া:
وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ ۖ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ
"তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। ঈমানের পর পাপী নামে ডাকা খুবই নিকৃষ্ট।" (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১১)
হাদিসে ইরশাদ হয়েছে:
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ
"মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসিকি এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরি।" (বুখারি, হাদিস: ৪৮; মুসলিম, হাদিস: ৬৪)
সারসংক্ষেপ:
- মেসি ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলে তা শালীন ও দলিলভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
- ব্যক্তিগত আক্রমণ, গালমন্দ, ‘ফাসিক’, ‘গোমরাহ’ ইত্যাদি বলা স্পষ্ট হারাম।
- মুসলিম উম্মাহর ঐক্য রক্ষা করা ফরজ।
৫. করণীয় ও দিকনির্দেশনা
১. মেসির ভক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকুন – বিশেষ করে তার ইসরাইলি কোম্পানির সাথে সম্পর্কের কারণে।
২. কেবল খেলার দক্ষতার প্রশংসা করলে সতর্ক থাকুন যেন তা তাকে সমর্থনের নামান্তর না হয়।
৩. অমুসলিম হলেও তাকে গালমন্দ করা থেকে বিরত থাকুন – বরং তার অন্যায় কাজের ভদ্র সমালোচনা করুন।
৪. মুসলিম ভাইদের মধ্যে মতপার্থক্য হলে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে শান্তিপূর্ণ আলোচনা করুন, কাউকে গালি দেবেন না বা ‘গোমরাহ’ বলবেন না।
৫. ইসরাইলি পণ্য বর্জন করুন এবং অন্যদেরও বর্জনে উৎসাহিত করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ন্যায়ের পথে চলার তাওফিক দিন। (আমিন)
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
তথ্যসূত্র
- কুরআন মজিদ: সূরা আল-মায়েদা ৫:২, ৫:৫১; সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১১-১২; সূরা আন-নিসা ৪:১৪৮; সূরা আল-আনআম ৬:১০৮
- হাদিস: আবু দাউদ (৪০৩১), বুখারি (৪৮), মুসলিম (৬৪)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি), ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি), রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- আল-হিদায়া, ফাতাওয়া আলমগীরী