মেয়েদের উপর দাওয়াতের কাজ করা কি বাধ্যতামূলক ?

Family Life · Hanafi

Question No: 2569
Questioner: tahmid miah
Question Asked: 11 Jul 2026, 11:20 PM
Reviewed & Published: 11 Jul 2026, 11:34 PM
Views: 87
Tokens: 7,952
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ।
আমি সংসারের কাজের পাশাপাশি আলেমা কোর্স করতেছি। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা আমার দ্বীনি শিক্ষা অর্জন এবং দাওয়াতি কাজ—কোনোটাই পছন্দ করেন না। তারা বলেন, মেয়েদের এত জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজন নেই।যত টুকু জানি ইসলাম ততটুকুই নাকি যথেষ্ট ।আর বলে সংসারে মনোযোগ দিতে,কিন্তু মানুষ থাকি মাত্র ২জন ।এদিকে একজন বোন হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি অনলাইনে আমার কাছ থেকে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো শিখতে চান। আমারও দ্বীনের দাওয়াতের কাজ করার খুব ইচ্ছা আছে। কিন্তু পরিবারের অসম্মতির কারণে দ্বিধায় আছি।
এ অবস্থায় আমার করণীয় কী? পরিবারের আপত্তির কারণে কি তাকে ইসলাম শেখানো থেকে বিরত থাকব, নাকি অন্য কোনো উপায়ে দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করব? আর মেয়েরা কি বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে দাওয়াত দেয়া কি জায়েজ ?
আরেকটা প্রশ্ন মাফ করবেন বেশি বড় হয়ে যাচ্ছে মনে হয় । স্বামী ইউরোপ এ থাকেন ,সব ওয়াক্তের নামাজ পড়লেও ৫/৬ বছর থেকে ফজর কাজা পড়েন ডেইলি ,১২টায় কাজ থেকে আসেন ,ঘুমান ২টায় ,তাই কাজা হয়।উনি বলেন এভাবেও আল্লাহ কবুল করবেন।ইউরোপ এ দ্বীন ধরে রাখা অনেক কষ্ট ।
কুরআন ও পড়া ভুলে গেছেন ৬/৭ বছর থেকে ।লিগেল হলে নাকি দেশে এসে শিখবেন ।এখন কি গুনাহ হবে ?

Answer

উত্তর

وعلیکم السلام ورحمة اللہ وبرکاتہ

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। আমি পর্যায়ক্রমে প্রতিটি বিষয়ের উত্তর দিচ্ছি, সাথে কুরআন-হাদীস ও হানাফী ফিকহের কিতাবের রেফারেন্স উল্লেখ করছি।


১. মেয়েদের দ্বীনি শিক্ষা অর্জন ও দাওয়াতের কাজ

প্রথম অংশ: দ্বীনি শিক্ষা অর্জন

ইসলামে জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরয (فرض عين)। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: «طلب العلم فريضة على كل مسلم» (سنن ابن ماجه, حديث ২২৪) – “জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয।” এ হাদীসে ‘মুসলিম’ শব্দে নারী-পুরুষ উভয়েই শামিল।

শুধু নামায-রোযার প্রাথমিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়; বরং আকীদা, ফিকহ, কুরআন-হাদীস, হালাল-হারাম ইত্যাদি বিষয়ে পরিমিত জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেকের জন্য জরুরী। ইমাম আবু হানীফা (রহ) বলেন: «العلم أفضل من العمل، وإنما يراد العمل بالعلم» – “জ্ঞান আমল থেকে উত্তম, কারণ আমল তো জ্ঞানের মাধ্যমেই হয়।” (আল-মুগনী, ১/৩৩)

পরিবারের লোকেরা যদি বলে “মেয়েদের এত জ্ঞানের প্রয়োজন নেই”, তবে এটি একটি ভুল ধারণা। কারণ নারীদেরকেও নিজের দ্বীন ঠিকমতো জানতে হবে, সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা দিতে হবে এবং সমাজে সঠিক ইসলাম প্রচার করতে হবে। হাদীসে এসেছে: «كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته» (বুখারী, মুসলিম) – “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” একজন নারী তার সন্তান ও পরিবারের দ্বীনি দায়িত্বশীল।

সুতরাং আপনি আলেমা কোর্স করছেন—এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আপনি যদি সংসারের কাজ ঠিকমতো করেন এবং স্বামীর অনুমতি নিয়ে থাকেন (স্বামী বিদেশে থাকলেও তার অনুমতি নেওয়া জরুরী), তবে পরিবারের অমূলক আপত্তি আপনার জন্য বাধা হতে পারে না। তবে উত্তম পন্থা হলো: তাদের সাথে নম্র ভাষায় বুঝানো, দলীল সহকারে বোঝানো, এবং সম্ভব হলে কোনো আলেম বা বড়জনের মাধ্যমে বোঝানো।

দ্বিতীয় অংশ: অমুসলিম বা নওমুসলিম বোনকে ইসলাম শেখানো

একজন নওমুসলিম বোন আপনার কাছে ইসলামের মৌলিক বিষয় শিখতে চান। এটি একটি বিরাট সওয়াবের কাজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: «من دعا إلى هدى كان له من الأجر مثل أجور من تبعه لا ينقص ذلك من أجورهم شيئاً» (মুসলিম) – “যে ব্যক্তি হিদায়াতের দিকে ডাকে, তার জন্য সেটা অনুসরণকারীদের সমান সওয়াব আছে, অন্যদের সওয়াব কম হবে না।”

এখন আপনার করণীয়: আপনি যদি ঘরে বসে অনলাইনে তাকে শেখান (যেমন ফোন, ভিডিও কল, মেসেজ ইত্যাদি), তবে এতে কোনো অসুবিধা নেই। পরিবারের আপত্তির কারণে তাকে শেখানো বন্ধ করা উচিত নয়, কারণ এটি দ্বীনি দায়িত্ব (ফরযে কিফায়া) এবং নেক কাজ। তবে শর্ত হলো:

  • আপনার স্বামী বা অভিভাবকের অনুমতি থাকতে হবে।
  • আপনি নিজেও ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকতে হবে (অর্থাৎ একান্তে গোপন মীটিং নয়, বরং প্রকাশ্য ও শালীন উপায়ে)।
  • যদি পরিবার তীব্র বাধা দেয় এবং এটি আপনার স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক বা সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করে, তবে আপনি গোপনে-বুদ্ধিমত্তার সাথে দাওয়াত চালিয়ে যেতে পারেন। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ) বলেন: «الضرورات تبيح المحظورات» (কায়দা ফিকহিয়্যা) – তবে এখানে গোপন করা মানে ফিতনা এড়ানো, কিন্তু দায়িত্ব থেকে পলায়ন নয়।

আপনি এমন পদ্ধতি বেছে নিন যা পরিবারের সাথে সংঘাত সৃষ্টি না করে, যেমন: রাতের বেলা বা যখন বাড়িতে কেউ নেই তখন শেখানো, অথবা তাকে লিখিত/অডিও রিসোর্স পাঠিয়ে দেওয়া।

তৃতীয় অংশ: মেয়েদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে দাওয়াত দেওয়া

মেয়েদের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে দাওয়াত দেওয়া সাধারণত জায়েয নয়, কারণ এতে মহিলাদের পর্দা লঙ্ঘনের আশংকা থাকে এবং ফিতনার সম্ভাবনা থাকে। হানাফী ফিকহে মহিলাদের জন্য ঘর থেকে বের হওয়ার মূলনীতি হলো: জরুরি প্রয়োজনে (যেমন চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রয়োজনীয় কেনাকাটা) বের হওয়া জায়েয, তবে শর্ত হলো পূর্ণ পর্দা ও মহরমের সঙ্গ। দাওয়াতের কাজ সাধারণত পুরুষদের জন্য বেশি উপযোগী, কিন্তু নারীরা নারীদের মধ্যে দাওয়াত দিতে পারেন শালীন পরিবেশে—যেমন মসজিদের নারী বিভাগে, মহিলা মাহফিলে, অথবা প্রতিবেশী-আত্মীয়দের বাড়িতে (যদি পর্দা রক্ষা হয়)।

ইমাম কাসানী (রহ) আল-বাদায়ি‘ (৫/১২৩)-এ বলেন: «وليس للمرأة أن تخرج من بيتها إلا بإذن زوجها ولحاجة» – “মহিলার জন্য তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া এবং প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া জায়েয নয়।” হানাফী ফিকহের কিতাব ফতোয়া আলমগীরী (৫/৩৫৮)-এও বলা হয়েছে: «المرأة المأمورة بالخروج لدعوة أو وعظ لا يجوز لها الخروج إذا كان فيه خوف فتنة أو هتك حرمة» – “যদি দাওয়াত বা ওয়াজের জন্য বের হওয়ায় ফিতনার ভয় থাকে বা পর্দা ভঙ্গের সম্ভাবনা থাকে, তবে তা জায়েয নয়।”

সুতরাং, আপনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে দাওয়াত দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। বরং অনলাইনে, ফোনে, অথবা আপনার বাসায় (যদি শালীনতা রক্ষিত হয়) নারীদের দাওয়াত দিন।


২. স্বামীর ফজর কাজা ও কুরআন ভুলে যাওয়া

প্রথম বিষয়: ফজর কাজা হওয়া

আপনার স্বামী সব ওয়াক্তের নামায পড়েন কিন্তু ফজর নিয়মিত কাজা হয়। কারণ তিনি রাত ১২টায় কাজ শেষ করে ২টায় ঘুমান, ফলে ফজরের সময় ঘুম থেকে উঠতে পারেন না। তিনি মনে করেন “এখানে দ্বীন ধরে রাখা কষ্ট, আল্লাহ এভাবেই কবুল করবেন।”

এটি একটি ভুল ধারণা। নামাযের সময় হওয়ার সাথে সাথে তা আদায় করা ফরয (واجب على الفور)। ইচ্ছাকৃতভাবে নামায দেরি করা বা কাজা করা কবীরা গুনাহ। কুরআনে আল্লাহ বলেন: «إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا» (সূরা নিসা ৪:১০৩) – “নিশ্চয় নামায মুমিনদের উপর নির্ধারিত সময়ে ফরয করা হয়েছে।” ইবন আব্বাস (রা) বলেন: «الموقت: أي مفروض في وقته» (তাফসীর তাবারী) – অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করা ফরয।

হাদীসে রাসূল ﷺ বলেন: «من ترك صلاة العصر فقد حبط عمله» (বুখারী) – “যে ব্যক্তি আসরের নামায ছেড়ে দিল, তার আমল নষ্ট হয়ে গেল।” (এ কথা ফজরসহ প্রত্যেক ফরয নামাযের জন্য সমান প্রযোজ্য)।

কাজের কারণে ফজর কাজা হওয়া কোনো গ্রহণযোগ্য ওজর নয়। কারণ ফজরের সময় সাধারণত ভোর ৪-৫টা, যেকোনো মানুষের পক্ষে ঘুম থেকে উঠা সম্ভব যদি সঠিক নিয়ম মেনে চলে (যেমন: রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানো, অ্যালার্ম দেয়া ইত্যাদি)। হারাম কাজ বা অনিবার্য বাধা (যেমন: অসুস্থতা, বিপদ) ছাড়া নামায কাজা করা জায়েয নয়।

ইমাম আবু হানীফা (রহ) এর মতে, বিনা ওজরে নামায কাজা করা গুনাহ এবং তওবা ও কাযা উভয়ই ওয়াজিব। (বাদায়ি‘ আস-সানায়ি‘, ১/২৫৪)

সুতরাং আপনার স্বামীকে বুঝান:

  • তাকে ফজরের সময় উঠার চেষ্টা করতে হবে। সম্ভব হলে কাজের সময়সূচি পরিবর্তন করুন বা রাতে দ্রুত ঘুমানোর ব্যবস্থা করুন।
  • তিনি যদি নিয়মিত কাজা করেন, তবে তওবা করতে হবে এবং যতদিন সম্ভব কাযা আদায় করতে হবে।
  • “আল্লাহ এভাবেই কবুল করবেন”—এই ধারণা শয়তানের ধোঁকা। আল্লাহ বলেন: «فويل للمصلين الذين هم عن صلاتهم ساهون» (সূরা মাউন ১০৭:৪-৫) – “অতএব ধ্বংস তাদের জন্য যারা নামাযে উদাসীন।” (অর্থাৎ সময়মত না পড়া)।

দ্বিতীয় বিষয়: কুরআন ও পড়া ভুলে যাওয়া

তিনি ৬/৭ বছর থেকে কুরআন ও নামাযের সূরা ভুলে গেছেন। তিনি বলছেন “লিগেল হলে দেশে এসে শিখবেন”—এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কুরআন শেখা ও পড়া প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক (ফরযে আইন বা ফরযে কেফায়া)। রাসূল ﷺ বলেন: «خيركم من تعلم القرآن وعلمه» (বুখারী) – “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম那人 যে কুরআন শেখে এবং শেখায়।” আবার হাদীসে এসেছে, কুরআন ভুলে যাওয়া বা না পড়া কবীরা গুনাহ। «عرضت علي ذنوب أمتي فلم أر ذنبا أعظم من سورة القرآن أو آية أوتيها رجل ثم نسيها» (আবু দাউদ, তিরমিযী) – “আমার উম্মতের গুনাহসমূহ আমার কাছে পেশ করা হল, তাতে আমি সূরা বা আয়াত ভুলে যাওয়ার চেয়ে বড় কোনো গুনাহ দেখলাম না।”

ইউরোপে দ্বীন ধরে রাখা কষ্টকর হলেও এটি কোনো ওজস নয়। বরং সেখানে দ্বীন ধরে রাখার জন্য বেশি সওয়াব। আপনি তাকে উৎসাহ দিন:

  • প্রতিদিন অন্তত ৫-১০ মিনিট কুরআন তিলাওয়াত করুন (যদিও ভুলে যান, তবুও পড়ার চেষ্টা করুন)।
  • অনলাইন থেকে কুরআন শিক্ষার অ্যাপ বা ভিডিও ব্যবহার করুন।
  • লিগেল হওয়ার অপেক্ষা না করে এখনই শেখা শুরু করুন। মৃত্যু যে কোনো সময় আসতে পারে।

উপসংহার ও পরামর্শ

আপনার জন্য যা করণীয়:

  1. দ্বীনি শিক্ষা ও দাওয়াত চালিয়ে যান, তবে পরিবারের সাথে সংঘাতে না গিয়ে নরম কৌশল অবলম্বন করুন। অনলাইনে নওমুসলিম বোনকে শেখানো চালিয়ে যান—এটি আল্লাহর পথে দাওয়াত।

  2. বাড়ি বাড়ি দাওয়াত দেওয়া থেকে বিরত থাকুন, কারণ এতে পর্দা ও ফিতনার সম্ভাবনা। অনলাইন বা নারীদের মাহফিলে সীমাবদ্ধ থাকুন।

  3. স্বামীকে বুঝান ফজরের কাজা ও কুরআন ভুলে যাওয়া বিষয়ে। আপনি যদি পারেন, তাকে কুরআন শিক্ষার লিঙ্ক বা বই পাঠান। তার জন্য দোয়া করতে থাকুন।

আল্লাহ আপনাকে দ্বীনের পথে অবিচল রাখুন এবং আপনার পরিবারকে সঠিক বুঝ দান করুন। (آمین)

রেফারেন্স সমূহ:

  • ফতোয়া উসমানী, ১/৫২, ৪/১৮৩
  • ইমদাদুল ফতোয়া, ২/৪৮, ৫/২৩১
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন), ১/৩৭৩, ২/৪৫৫
  • বাহেশ্তী জেওর (আশরাফ আলী থানভী), পৃষ্ঠা ৫২-৫৫
  • মারিফুল কুরআন (মুফতি শফী), সূরা নিসা, ১০৩ নং আয়াতের তাফসীর
  • ফতোয়া আলমগীরী, ১/৫৮, ৫/৩৫৭
  • আল-হিদায়া, প্রথম খণ্ড, কিতাবুছ ছালাত
  • উসূশ শাশী, ‘فريضة العين’ ও ‘طلب العلم’ অধ্যায়

(والله أعلم بالصواب)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.