হানাফি মাযহাবের অনুসারীর জন্য সালাতে রাফউল ইয়াদাইন করা কি অনুমোদিত?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুহতারাম, আল্লাহ তাআলা দ্বীনের খাতিরে আপনাদের সুস্থ রাখুন এবং ইলমে বরকত দান করুন।
আমি একজন সাধারণ মুসলিম এবং ফিকহি মাসআলা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে হানাফি মাজহাব অনুসরণ করার চেষ্টা করি। ইদানীং সুন্নাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে একটি বিষয়ে শরয়ী সমাধান জানার খুব আগ্রহ জেগেছে। আমি যদি হানাফি মাজহাব মেনে সালাত আদায়ের পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসের অনুসরণে সালাতে ‘রাফউল ইয়াদাইন’ (রুকুতে যাওয়া ও ওঠার সময় হাত তোলা) করি, তবে কি আমার সালাত নিয়মসম্মত হবে? আর হানাফি ফিকহের আলোকে যদি এটি করার অবকাশ না থাকে, তবে একজন সাধারণ তালিবুল ইলম হিসেবে সেটার পেছনে মূল উসূল বা দলিলগুলো জানতে পারলে অত্যন্ত উপকৃত হতাম।
এবং অন্যান্য প্রধান মাজহাবসমূহে (যেমন: শাফেয়ী, হাম্বলী বা মালেকী) রাফউল ইয়াদাইন করার ব্যাপারে কী বিধান রয়েছে এবং তাদের পক্ষে প্রধান দলিলগুলো কী?
অনুগ্রহ করে বিষয়টি দলিলসহ অত্যন্ত সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিলে আমার মতো একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর জন্য আমল করা ও বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ উপকার হতো।
আপনার মূল্যবান সময় ও দিকনির্দেশনার জন্য অগ্রিম জাজাকাল্লাহু খাইরান।"
Answer
উত্তর: সালাতে রাফউল ইয়াদাইন (রুকুতে যাওয়া ও ওঠার সময় হাত তোলা) সংক্রান্ত মাসআলা
বিষয়: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী রাফউল ইয়াদাইন ও অন্যান্য মাজহাবের দলিল
উত্তর প্রদান: হানাফি ফিকহের কিতাব ও দলিলের আলোকে
প্রথম অংশ: হানাফি মাজহাবের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফি মাজহাবে রাফউল ইয়াদাইন (রুকুতে যাওয়ার সময় ও রুকু থেকে ওঠার সময় হাত তোলা) সুন্নত নয়, বরং শুধু প্রথম তাকবির (তাকবিরে তাহরিমা) -এ হাত তোলা সুন্নত। এটি হানাফি মাজহাবের প্রধান উসূল।
দলিলসমূহ:
(ক) সহিহ হাদিস:
-
হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত:
"আমি কি তোমাদের রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মতো সালাত পড়াব?" বর্ণনাকারী বলেন, তিনি কেবল প্রথম তাকবিরেই হাত তুললেন, আর (রুকুতে যাওয়ার ও ওঠার সময়) আর হাত তোলেননি।"
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫৬; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৭৪৮; ইমাম তিরমিজি বলেছেন, এটি সহিহ হাসান) -
হাদিসে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত:
"রাসুলুল্লাহ (সা.) রুকুতে যাওয়ার সময় ও রুকু থেকে মাথা তোলার সময় হাত তোলেননি, শুধু প্রথম তাকবিরে (সালাত শুরুতে) হাত তুলতেন।"
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৭৪৯; ইমাম দারা কুতনি বলেছেন, এটি সহিহ)
(খ) ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর দলিল:
-
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: "রাফউল ইয়াদাইন শরিয়তের প্রথম যুগে ছিল, পরে তা রহিত (মনসুখ) হয়ে যায়।" (শরহু মা'আনি আল-আসার, ইমাম তাহাবি, ১/২২৫)
-
ইমাম তাহাবি (রহ.) তার প্রসিদ্ধ কিতাব "শরহু মা'আনি আল-আসার" -এ প্রমাণ করেছেন যে, সাহাবায়ে কেরামের একাধিক জন (যেমন: ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর রা.) রাফউল ইয়াদাইন করেননি এবং তারা এটিকে রহিত (মনসুখ) মনে করতেন।
(গ) ইমাম মুহাম্মাদ ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মত:
- ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে, রাফউল ইয়াদাইন করা মাকরুহে তানজিহি (অপছন্দনীয়)। তবে তারা বলেছেন, যদি কেউ করে, তাহলে তার সালাত শুদ্ধ হবে, কিন্তু সুন্নতের পরিপন্থী হবে।
(ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/১০৮; রদ্দুল মুহতার, ১/৪৯৫)
(ঘ) হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
হানাফি মাজহাবের মূলনীতি হলো:
- রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরবর্তী যুগে সাহাবায়ে কেরামের সম্মিলিত আমল (ইজমা) বেশি প্রাধান্য পায়।
- রাফউল ইয়াদাইন সংক্রান্ত হাদিসগুলো মুতাশাবিহাত (জটিল) এবং একাধিক হাদিসের মধ্যে সামঞ্জস্যের জন্য তারজিহ (অগ্রাধিকার) দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় অংশ: অন্যান্য মাজহাবের দৃষ্টিভঙ্গি
(১) শাফেয়ী মাজহাব:
- বিধান: রাফউল ইয়াদাইন সুন্নতে মুয়াক্কাদা (অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত) এবং না করলে সালাত মাকরুহ হয়।
- দলিল:
- হাদিসে ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত:
"রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন সালাত শুরু করতেন, তখন হাত তুলতেন। আর রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে মাথা তোলার সময়ও হাত তুলতেন।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৩৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৯০) - হাদিসে আবু হুরায়রা (রা.) থেকেও অনুরূপ বর্ণনা আছে।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৯২)
- হাদিসে ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত:
(২) হাম্বলী মাজহাব:
- বিধান: রাফউল ইয়াদাইন সুন্নত এবং শাফেয়ী মাজহাবের অনুরূপ। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেছেন: "রুকুতে যাওয়া ও ওঠার সময় হাত তোলা নবী (সা.)-এর মুবারক আমল এবং সাহাবায়ে কেরামও তা করতেন।"
- দলিল: উপরোক্ত হাদিসগুলোর পাশাপাশি ইমাম বুখারি ও মুসলিমের হাদিসই প্রধান দলিল।
(৩) মালেকী মাজহাব:
- বিধান: রাফউল ইয়াদাইন কেবল প্রথম তাকবিরেই (শুরুতে) সুন্নত; রুকুতে যাওয়া ও ওঠার সময় নয়। এটি হানাফি মাজহাবের কাছাকাছি। তবে মালেকী মাজহাবে অধিকাংশের মতে, রুকুর সময় হাত তোলা মুস্তাহাব নয়।
- দলিল: ইমাম মালিক (রহ.) মদীনাবাসীদের আমলকে প্রাধান্য দিয়েছেন, যেখানে রাফউল ইয়াদাইন শুধু প্রথম তাকবিরে প্রচলিত ছিল।
তৃতীয় অংশ: আপনার সালাতের শুদ্ধতা ও পরামর্শ
প্রশ্ন: আপনি যদি হানাফি মাজহাব মেনে সালাত আদায়ের পাশাপাশি রাফউল ইয়াদাইন করেন, তবে কি সালাত শুদ্ধ হবে?
উত্তর:
- হানাফি মাজহাব অনুযায়ী: রাফউল ইয়াদাইন করা মাকরুহে তানজিহি (গুনাহ নয়, তবে অপছন্দনীয়)। তাই আপনার সালাত শুদ্ধ হবে, কিন্তু উত্তম পদ্ধতি থেকে কিছুটা বিচ্যুতি হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়মিত করলে মাকরুহ হবে।
- শাফেয়ী ও হাম্বলী মাজহাব অনুযায়ী: এটি সুন্নত এবং সওয়াবের কাজ।
পরামর্শ:
- আপনি যদি হানাফি মাজহাবের অনুসারী হন, তাহলে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর দলিলসমূহ বিবেচনা করে সুন্নতের সম্পূর্ণ অনুসরণের জন্য হানাফি মাজহাবের পদ্ধতি (শুধু প্রথম তাকবিরে হাত তোলা) অবলম্বন করুন। এটি আপনার ইখতিয়ার (পছন্দ) হওয়া উচিত।
- যদি সুন্নাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে অন্য মাজহাবের আমল করতে চান, তাহলে শাফেয়ী বা হাম্বলী মাজহাব অনুসারে সম্পূর্ণ সালাত আদায় করতে পারেন। কারণ এক মাজহাবের ভিতরে এসব কাজ করলে তালফিক (মাজহাব মিশ্রণ) সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই সম্পূর্ণ একটি মাজহাবের অনুসরণই উত্তম।
- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: সালাতের মূল রুকন, শর্ত ও ওয়াজিব পালনে যত্নবান হন। রাফউল ইয়াদাইন সুন্নতের অংশ, কিন্তু ফরজ-ওয়াজিবের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থ অংশ: হানাফি মাজহাবের মূল উসূল (দলিল বোঝার জন্য)
হানাফি মাজহাব কেন রাফউল ইয়াদাইনকে সুন্নত মনে করে না, তার মূল উসূল নিচে দেওয়া হলো:
- সাহাবায়ে কেরামের ইজমা: শেষ যুগের অধিকাংশ সাহাবা (ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস ইত্যাদি) রাফউল ইয়াদাইন করতেন না। তাদের আমলকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
- হাদিসে মনসুখ (রহিত): ইমাম তাহাবি প্রমাণ করেছেন যে, রাফউল ইয়াদাইন প্রথম যুগে ছিল, পরে রাসুলুল্লাহ (সা.) তা বর্জন করেন এবং সাহাবাগণ তা রহিত বলে সিদ্ধান্ত নেন।
- তারজিহ (অগ্রাধিকার): একাধিক সহিহ হাদিসের মধ্যে দ্বন্দ্ব হলে, সংখ্যাগরিষ্ঠ সাহাবার আমল ও মাজহাবের মূলনীতি (যেমন: ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মাদের বক্তব্য) বিবেচনায় রাফউল ইয়াদাইন করা সুন্নত নয় বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সারসংক্ষেপ:
| মাজহাব | রাফউল ইয়াদাইন (রুকুর সময়) | দলিলের ভিত্তি |
|------------|-----------------------------|-------------------|
| হানাফি | সুন্নত নয়, মাকরুহে তানজিহি | ইবনে মাসউদ (রা.)-এর হাদিস, মনসুখ হওয়ার প্রমাণ |
| শাফেয়ী | সুন্নতে মুয়াক্কাদা | ইবনে উমর (রা.), আবু হুরায়রা (রা.)-এর হাদিস |
| হাম্বলী | সুন্নত | একই হাদিস |
| মালেকী | শুধু প্রথম তাকবিরে | মদীনাবাসীর আমল |
আপনার জন্য দোয়া:
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং সুন্নাহর উপর আমল করার তাওফিক দিন। আমিন।
জাজাকাল্লাহু খাইরান।
(হানাফি ফিকহের কিতাব: ফাতাওয়া উসমানি, ইমদাদুল ফাতাওয়া, রদ্দুল মুহতার, বেহেশতি জেওর, মাআরিফুল কোরআন, ফাতাওয়া আলমগিরি, আল-হিদায়া, শরহু মাআনি আল-আসার, উসুলুশ শাশি)