ক্রিপ্টোকারেন্সি কি ইজমা বা ইখতিলাফী ইস্যু? পূর্বে অন্য মতামত অনুযায়ী লেনদেন করলে এখন কী করণীয়?
Halal and Haram · Hanafi
Question
"কেউ যদি একসময় এক ঘরানার আলেমদের (Western কিংবা সালাফি) ফলো করতো, এবং পরবর্তীতে বুঝতে পারে যে আমাদের উপমহাদেশের দারুল উলুম দেওবন্দ, দারুল উলুম করাচি এরকম প্রসিদ্ধ ইলম চর্চার কেন্দ্রগুলোই বেশি হকের উপর আছে, এবং স্থানীয় হক্কানি আলেমদেরকেই ফলো করা শুরু করে, তাহলে তার পূর্ববর্তী কাজকর্ম, যা স্থানীয় আলেমদের মতে নাজায়েজ, সেগুলোর কাফফারা করতে হবে কি? যেমন এমন কোনো সম্পদ অর্জন করেছিলো যা অর্জনের পদ্ধতি হালাল না, যদিও তা অন্য scholars দের মতে হালাল। এক্ষেত্রে সেই সম্পদ বিনা সওয়াবের নিয়তে দান করা ওয়াজিব হবে নাকি সেটা তাকওয়ার বিষয় হবে?"
এর উত্তরে বলা হয়েছিলো "unanimously prohibited (ḥarām bi al-ijmā‘)" হলে সম্পদ থেকে মুক্ত হতে হবে। এখন, cryptocurrency এর বিষয়টা কি unanimously prohibited (ḥarām bi al-ijmā‘) এর মধ্যে পড়বে? নাকি ইখতিলাফের মধ্যে পড়বে? যেহেতু বেশ কিছু আলেমও একে শর্তসাপেক্ষে বৈধ বলেছে।
জাযাকাল্লাহু খায়রান।
Answer
উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
আপনার প্রশ্নের উত্তর নিম্নরূপ:
১. ইজমা (Consensus) ও ইখতিলাফ (Difference of Opinion) সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা
ইজমা হলো উম্মতের মুজতাহিদ আলেমদের ঐকমত্য। কোনো বিষয় যদি সুষ্পষ্ট ও সর্বসম্মতভাবে হারাম (ḥarām bi al-ijmā‘) হয়, তাহলে তা মানতে বাধ্য। কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সি (Cryptocurrency) বর্তমানে এমন একটি বিষয় যেখানে ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং একাধিক মতপার্থক্য (ইখতিলাফ) বিদ্যমান।
২. হানাফী ফিকহে ক্রিপ্টোকারেন্সির অবস্থান
হানাফী বিদ্বানদের মধ্যে অধিকাংশই ক্রিপ্টোকারেন্সিকে হারাম বলেছেন। এর কারণসমূহ:
- গারার (অনিশ্চয়তা/জুয়া) : মূল্যহ্রাস-বৃদ্ধি অত্যন্ত অনিয়ন্ত্রিত ও স্পেকুলেটিভ।
- মাইসির (জুয়া) : এক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতি অনেকটাই ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল।
- সুদ ও প্রতারণার সম্ভাবনা : অনির্দিষ্ট লেনদেন ও কাগজি মুদ্রার ন্যায় বাস্তব সম্পদের অভাব।
- অবৈধ কাজে ব্যবহার : মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাস ইত্যাদি।
হানাফী রেফারেন্স:
- মুফতি তকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) ক্রিপ্টোকারেন্সিকে স্পষ্টতই হারাম বলেছেন। (দেখুন: “The Islamic Ruling on Bitcoin”, ১৪৩৯ হি.)
- দারুল উলূম দেওবন্দ, ভারত ও দারুল ইফতা জামিয়াহ বিনোরি টাউন, করাচি-এর ফতোয়াতেও একে নাজায়েজ বলা হয়েছে।
- রদ্দুল মুহতার ও ফতোয়া আলমগীরী-তে অনুরূপ অনিশ্চিত ও অস্পষ্ট লেনদেনকে হারাম গণ্য করা হয়েছে।
তবে কিছু আলেম (যেমন ড. মো. ইরশাদ আহমদ, ড. আব্দুল কাদির বারকাতী) শর্তসাপেক্ষে বৈধ বলেছেন—যেমন সেটির বাস্তব সম্পদ বা নিরাপত্তা থাকলে। কিন্তু এটি ইজমার বিপরীত নয়, বরং ইখতিলাফী ইস্যু।
৩. আপনার পূর্বের প্রশ্ন ও বর্তমান অবস্থা
আপনার আগের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছিল যে যদি কোনো বস্তু সর্বসম্মতভাবে হারাম হয়, তাহলে আগের অর্জিত সম্পদ থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া ওয়াজিব। কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সি যেহেতু ইখতিলাফী ইস্যু, তাই:
- পূর্বে আপনি যদি সালাফি/পশ্চিমা আলেমদের মত অনুযায়ী এটি হালাল মনে করে লেনদেন করে থাকেন, এবং পরে হানাফী ও দেওবন্দি আলেমদের মত গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে আগের অর্জিত সম্পদ জবরদস্তি ছেড়ে দেওয়া ওয়াজিব নয়। কারণ তখন আপনি একটি বৈধ ইজতিহাদ ফলো করছিলেন (যদিও সাধারণ হানাফী মতে তা ভুল)।
- ইখতিলাফী বিষয়ে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মূলনীতি হলো: যে ব্যক্তি কোনো মুজতাহিদের ইজতিহাদ অনুযায়ী আমল করে, তার জন্য তা শুদ্ধ বলে গণ্য হবে। (ফতোয়া হিন্দিয়া, ১/৫৪; রদ্দুল মুহতার, ১/৫৪)
৪. এখন কী করবেন?
- ভবিষ্যতে ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন থেকে বিরত থাকা আপনার জন্য ওয়াজিব। কারণ এখন আপনি স্থানীয় হক্কানি আলেমদের (যারা এটি হারাম বলেন) মত গ্রহণ করেছেন।
- পূর্বের সম্পদের ব্যাপারে:
- তাওবা করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
- ওয়াজিব নয়, তবে তাকওয়ার খাতিরে আপনি যদি চান, তাহলে সেটি সওয়াবের নিয়ত ব্যতীত দান করে দিন (তাসাদ্দুক) – এতে আপনার সম্পদ পবিত্র হবে এবং আখিরাতে নিরাপদ থাকবেন। এটি অনেক বড়ো আলেমের পরামর্শ।
৫. সারকথা
ক্রিপ্টোকারেন্সি ইজমার স্তরে নেই, বরং ইখতিলাফী ইস্যু। তাই আপনার পূর্বের লেনদেনের জন্য কাফফারা দেয়া বা সম্পদ ত্যাগ করা ওয়াজিব নয়। তবে এখন হানাফী ও দেওবন্দি মতে এটি হারাম জেনে থাকলে তা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আর পূর্বের সম্পদ যদি কোনো সন্দেহ দূর করতে চান, তাহলে নফল দান করে দিতে পারেন—তবে তা ওয়াজিব নয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন।