বাবা মার অবাধ্য হয়ে সহশিক্ষা ত্যাগ করা কি ঠিক?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: মা-বাবার অবাধ্য হয়ে সহশিক্ষা ত্যাগ করা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্ম। সংক্ষেপে উত্তর হলো: যদি কোনো মেয়ে মা-বাবার অবাধ্য হয়ে সহশিক্ষা ত্যাগ করে, তবে তা সাধারণত বৈধ নয়, বরং গুনাহের কাজ হবে। তবে যদি সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম বা ফিতনার কারণ হয় এবং মা-বাবা তা বুঝতে না চান, তাহলে মেয়ে তাদের বাধ্য না হয়েও সহশিক্ষা ত্যাগ করতে পারবে; বরং তা তার জন্য ওয়াজিবও হতে পারে। নিচে বিস্তারিত দলিল-প্রমাণসহ আলোচনা করা হলো।
১. মা-বাবার আনুগত্যের গুরুত্ব ও সীমা
ইসলামে মা-বাবার আনুগত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا..."
(সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)
অর্থ: "তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করো এবং পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো..."
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"رِضَى اللَّهِ فِي رِضَى الْوَالِدَيْنِ، وَسَخَطُ اللَّهِ فِي سَخَطِ الْوَالِدَيْنِ"
(তিরমিযী: ১৮৯৯; ইবনে হিব্বান: ৪২৯)
অর্থ: "আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতামাতার সন্তুষ্টির মধ্যে, আর আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতামাতার অসন্তুষ্টির মধ্যে।"
তবে মা-বাবার আনুগত্য সীমাবদ্ধ—শুধুমাত্র বৈধ বিষয়ে। যদি তারা কোনো হারাম কাজের আদেশ দেন, তাহলে তাদের কথা মানা যাবে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ"
(মুসনাদে আহমাদ: ১০৯৮; সহীহ মুসলিম: ১৮৪০)
অর্থ: "সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতায় কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই।"
সুতরাং, প্রথম শর্ত হলো: মা-বাবার আদেশ যদি শরীয়তসম্মত হয়, তবে তা মানা ওয়াজিব। আর যদি তা শরীয়তবিরোধী হয়, তবে মানা যাবে না।
২. সহশিক্ষা (Co-education) এর শরয়ী বিধান
হানাফি ফিকহের আলোকে, পুরুষ ও মহিলার একত্রে শিক্ষাগ্রহণ সাধারণত নাজায়েয (অনুমোদিত নয়) যদি তা পর্দা লঙ্ঘন করে এবং ফিতনার কারণ হয়। শরীয়তে নারী-পুরুষের মধ্যে অবাধ মেলামেশা, একাকিত্ব এবং পর্দার সীমা লঙ্ঘন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন:
"وَلَا يَجُوزُ لِلرَّجُلِ النَّظَرُ إِلَى الْأَجْنَبِيَّةِ وَلَا لَهَا النَّظَرُ إِلَيْهِ..."
(রদ্দুল মুহতার: ৬/৩৭০)
অর্থ: "পুরুষের জন্য বেগানা নারীর দিকে তাকানো জায়েয নেই, আর নারীর জন্যও বেগানা পুরুষের দিকে তাকানো জায়েয নেই।"
বর্তমান সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাধারণত পর্দা রক্ষিত হয় না, যা হারামের কারণ। তবে যদি প্রতিষ্ঠানটি ইসলামী পর্দার নিয়ম মেনে চলে (যেমন পৃথক ক্লাস, পর্দার ব্যবস্থা, ফিতনামুক্ত পরিবেশ), তাহলে তা জায়েয হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফিতনার কারণ হওয়ায় তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব।
৩. মা-বাবা যদি সহশিক্ষায় জোর দেন
এখন প্রশ্ন: যদি মা-বাবা তাদের মেয়েকে সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে বলেন এবং মেয়ে মনে করে এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয বা ফিতনার কারণ, তাহলে কী করবে?
নিয়ম: যদি সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃতপক্ষে হারাম বা ফিতনার হয় (পর্দালঙ্ঘন, গুনাহের পরিবেশ), তাহলে মেয়ের জন্য মা-বাবার কথা না মানা জায়েয; বরং ওয়াজিব। কারণ রাসূল ﷺ বলেছেন, আল্লাহর অবাধ্যতায় কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই। তবে মা-বাবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করে নম্রভাবে বোঝানো এবং বিকল্প ব্যবস্থা (যেমন পৃথক মাদ্রাসা, পর্দার স্কুল) খোঁজা আবশ্যক। যদি তারা বোঝে না, তাহলে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সহশিক্ষা ত্যাগ করতে হবে এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার অব্যাহত রাখতে হবে।
মুফতি মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:
"مات والدین کی نافرمانی اس وقت گناہ ہے جب کہ وہ کسی شرعی کام کا حکم دیں۔ اگر وہ خلاف شرع حکم دیں تو ان کی اطاعت جائز نہیں۔"
(ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/২৩২)
অর্থ: "মা-বাবার অবাধ্যতা তখনই গুনাহ যখন তারা কোনো শরয়ি কাজের আদেশ দেন। যদি তারা শরীয়তবিরোধী আদেশ দেন, তাহলে তাদের আনুগত্য জায়েয নেই।"
৪. সরাসরি ‘অবাধ্য হয়ে’ সহশিক্ষা ত্যাগের বিধান
প্রশ্নকারী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে মা-বাবার অবাধ্যতা করে (তাদের কথা না শুনে) সহশিক্ষা ত্যাগ করে, অথচ সে প্রতিষ্ঠানটি শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয বা অনিবার্য, তাহলে তা গুনাহ হবে। তবে যদি প্রতিষ্ঠানটি নাজায়েয হয় এবং মা-বাবা জোর দিচ্ছেন, তাহলে তাদের অবাধ্য করে ত্যাগ করা জায়েয; বরং সেটাই দ্বীনের দাবি। কারণ এ অবাধ্যতা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আনুগত্যের জন্যই হচ্ছে।
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন:
"والدین کی نافرمانی اس وقت ناجائز ہے جب وہ کسی مباح یا مستحب کام کا حکم دیں۔ اگر وہ حرام کام کا حکم دیں تو ان کی نافرمانی کرنا فرض ہے۔"
(মা‘আরিফুল কুরআন: ৫/৪৩০)
অর্থ: "মা-বাবার অবাধ্যতা তখনই নাজায়েয যখন তারা কোনো মুবাহ বা মুস্তাহাব কাজের আদেশ দেন। যদি তারা হারাম কাজের আদেশ দেন, তাহলে তাদের অবাধ্য করা ফরজ।"
৫. ব্যবহারিক সমাধান ও বিকল্প পথ
- প্রথমে বোঝানোর চেষ্টা: মেয়ে মা-বাবাকে নম্রতার সাথে সহশিক্ষার শরয়ি সমস্যা বুঝিয়ে বলবে। কুরআন-হাদিসের দলিল দেবে।
- বিকল্প ব্যবস্থা: যদি সম্ভব হয়, পর্দার ব্যবস্থাসম্পন্ন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করবে। অনলাইন বা পৃথক মেয়েদের স্কুল-কলেজ খুঁজে দেখবে।
- সর্বোচ্চ চেষ্টার পর: যদি মা-বাবা কিছুতেই না বোঝে এবং প্রতিষ্ঠানটি হারাম হয়, তাহলে মেয়ে তাদের অবাধ্য না হয়েও নিজের দ্বীনের হেফাজতের জন্য সহশিক্ষা ত্যাগ করতে পারবে। তবে যতটুকু সম্ভব সম্পর্ক ভালো রাখবে এবং ভদ্রতা বজায় রাখবে।
৬. হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থের উদ্ধৃতি
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): নারী-পুরুষের পর্দা ও মেলামেশার বিধান বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি): বলা হয়েছে, মা-বাবার অবাধ্যতা শুধু হারাম কাজে জায়েয নয়। (খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৯৭)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ শাফী): সহশিক্ষার হারাম দিক এবং পিতামাতার অবাধ্যতার সীমা বর্ণিত। (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪২)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): মা-বাবার অবাধ্যতার শর্তাবলি উল্লেখ আছে। (খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৩১)
- বেহেশতী জেওর: সহশিক্ষা ও পর্দার বিস্তারিত আলোচনা আছে।
- তাফসীরে মা‘আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী): মা-বাবার আনুগত্যের সীমা ও অবাধ্যতার বিধান।
৭. উপসংহার
সবশেষে, স্পষ্ট উত্তর:
- যদি সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ ও ফিতনামুক্ত হয়, তাহলে মা-বাবার অবাধ্য হয়ে তা ত্যাগ করা জায়েয নয়; বরং গুনাহ হবে।
- যদি সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি নাজায়েয, হারাম ও ফিতনার কারণ হয়, তাহলে মা-বাবার বিরোধিতা করেও তা ত্যাগ করা জায়েয; বরং ওয়াজিব। তবে মা-বাবার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে নরম পন্থায় বোঝানোর চেষ্টা করা জরুরি।
মূলনীতি: “لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق” – সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতায় সৃষ্টির আনুগত্য নেই।
আল্লাহ তাআলা সবাইকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার বজায় রেখে নিজের দ্বীন হেফাজত করার তাওফিক দিন। (আমিন)