অনলাইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কিত প্রশ্ন
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
কিছু কিছু অনলাইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে যারা বিভিন্ন কোর্স করায়। তারা কোর্সের শুরুতে বলে যে সম্পূর্ণ কোর্স এতদিনের, এতগুলো ক্লাস হবে, তারপর ফাইনাল পরীক্ষা৷ পরীক্ষায় পাশ বা ফেইল এর উপর ভিত্তি করে পরবর্তী স্টেপে উঠানো হবে।
কিন্তু এদের মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যারা নাকি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সবগুলো ক্লাস করায় না। যেমন ধরুন--- মোট ক্লাস করাবে বলে ৪৫টি, কিন্তু করিয়েছে ৩০/৩৫টি। আর বাকি ক্লাসগুলো না করিয়েই ফাইনাল পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করে পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ক্লাসকার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে দিল। আর স্টুডেন্টরা যদি বাকি থাকা ক্লাসগুলোর কথা জিজ্ঞেস করো সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হয় বাকি ক্লাসে যা পড়ানো হতো তা তোমরা নিজেরা পড়ে নিও।
এখানে আমার প্রশ্ন হচ্ছে,
1️⃣এই প্রতিষ্ঠান যে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সবগুলো ক্লাস না করিয়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করল তার জন্য কি তাদের কে প্রতারক বলা যাবে?
2️⃣ সবগুলো অধ্যায়/মডিউলের উপর লাইভ দরস/লেকচার না দিয়েই পরীক্ষা শুরু করে দেওয়ার ফলে স্টুডেন্টদের জ্ঞান/ইলমের যে ঘাটতি রয়ে গেল তার দায় কি প্রতিষ্ঠানের উপর পরবে না?
3️⃣ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সবগুলো লাইভ ক্লাস না করিয়ে সম্পূর্ণ কোর্সের টাকা নেওয়া কি ঐ প্রতিষ্ঠানের জন্য যায়েজ হবে?
4️⃣ পুরো সিলেবাস এর ক্লাস যেহেতু নেয় নি বাকি রয়ে গেছে পড়া, কিন্তু পরীক্ষা নিচ্ছে সম্পূর্ণ সিলেবাসের উপরই তার জন্য অনেকে রেজাল্ট ভালো করবে না। কেউ অকৃতকার্য হবে। ফলে তাকে পরবর্তী ধাপে বা লেভেলে যেতে দেওয়া হবে না।
ফলে অনেক শিক্ষার্থীকেই অপারগতাবসত ঐ সেমিস্টারেই (বুঝানোর জন্য সেমিস্টার শব্দ ব্যবহার করা হলো) আবার পড়তে হবে। এতে করে ঐসব শিক্ষার্থীর সময় ও অর্থ নষ্ট হলো এর দায় কি ঐ প্রতিষ্ঠানের উপর পড়বে না?
উক্ত শিক্ষার্থীদের থেকে যে প্রতিষ্ঠান কোর্সের জন্য টাকা নিয়েছে সেটা ঐ প্রতিষ্ঠানের জন্য জায়েজ হবে? কারণ এই শিক্ষার্থীদের এমন দুরবস্থর কারণ স্বয়ং এই প্রতিষ্ঠান। তাদের গাফিলতি কারণেই তো শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ জ্ঞান অর্জন থেকে মাহরুম হচ্ছে।
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
উত্তর
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান যুগের অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত। ইসলাম পরিষ্কারভাবে ওয়াদা পূরণ, আমানতদারি, এবং প্রতারণা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের জবাব হানাফি ফিকহের আলোকে পেশ করা হলো।
১. প্রতিষ্ঠানটিকে কি প্রতারক বলা যাবে?
উত্তর:
যদি প্রতিষ্ঠানটি কোর্স শুরুর সময় স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে মোট ৪৫টি ক্লাস হবে, কিন্তু পরে ইচ্ছাকৃতভাবে বা অবহেলার কারণে ৩০/৩৫টি ক্লাস করিয়ে বাকিগুলো না করে পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাহলে এটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং প্রতারণা হিসেবে গণ্য হবে।
-
কুরআন ও হাদিসে প্রতারণার নিন্দা:
আল্লাহ তাআলা বলেন:“ইয়া আইয়ুহাল্লাজিনা আমানু আউফু বিল উকুদ” (সূরা মায়িদাহ: ১)
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা চুক্তিগুলো পূরণ করো।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا” (সহীহ মুসলিম: ১০১)
“যে আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” -
ফিকহি বিধান:
ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: “চুক্তি ও ওয়াদা পূরণ করা ওয়াজিব। ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়াদা ভঙ্গ করা কবিরা গুনাহ।” (রাদ্দুল মুহতার, ৪/২৭৯)
সুতরাং, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানকে প্রতারক বলা যাবে, বিশেষ করে যখন তারা সচেতনভাবে ওয়াদা ভঙ্গ করে।
২. স্টুডেন্টদের ইলমের ঘাটতির দায় প্রতিষ্ঠানের উপর বর্তাবে কি?
উত্তর:
হ্যাঁ, দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের উপরই বর্তাবে। কারণ:
- তারা সিলেবাসের সব অধ্যায়/মডিউলের ওপর লাইভ ক্লাস দেওয়ার ওয়াদা করেছিল, কিন্তু তা করেনি।
- শিক্ষার্থীদের অসম্পূর্ণ জ্ঞান অর্জনের কারণ তাদের অবহেলা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ।
- ফিকহে বলা হয়েছে: “পূর্ণ শিক্ষাদান প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো অংশ বাদ দেওয়া হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পূরণ করা প্রতিষ্ঠানের কর্তব্য।” (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৫২)
- ইমাদাদুল ফাতাওয়া: “পাঠ্যসূচি অনুযায়ী শিক্ষাদান করা ওয়াজিব। তা না করলে শিক্ষক/প্রতিষ্ঠান দায়ী হবে।” (ইমাদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩০)
সুতরাং, শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের ঘাটতি ও পরীক্ষায় ফেল করার মূল কারণ যদি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি হয়, তাহলে এর দায় প্রতিষ্ঠানের উপরই পড়বে।
৩. প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সব ক্লাস না করিয়ে পুরো কোর্সের টাকা নেওয়া কি জায়েজ?
উত্তর:
এটি জায়েজ নয়; বরং হারাম। কারণ:
- টাকা নেওয়া হয়েছে পুরো কোর্স শেখানোর বিনিময়ে, কিন্তু তা পূরণ করা হয়নি।
- ফিকহের নীতি: “আল-ইজারাহ আক্দুন ইলা তামামি মুদ্দাতি আলা বদরিল আওয়াজ” — ইজারাহ (خدمتের জন্য চুক্তি) পূর্ণ সময় বা পূর্ণ কাজের জন্য হয়। কাজ অসম্পূর্ণ থাকলে সম্পূর্ণ পারিশ্রমিক গ্রহণ জায়েজ নয়। (শারহু মাআনিল আসার, ৪/২২৯; আল-হিদায়া, ৩/১৮৫)
- ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: “যদি মুজির (কাজের মালিক) পূর্ণ কাজ না দেয়, তাহলে পূর্ণ মজুরি নেওয়া জায়েজ নয়।” (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৪৬)
- ফাতাওয়া আলমগীরী: “কাজ পূর্ণ করার পূর্বে পূর্ণ বেতন নেওয়া মাকরুহ তাহরিমি ও নাজায়েজ।” (২/৪১৫)
অতএব, প্রতিষ্ঠানের জন্য এই টাকা হারাম এবং তা ফেরত দেওয়া বা ক্ষতিপূরণ দেওয়া আবশ্যক।
৪. শিক্ষার্থীদের সময় ও অর্থ নষ্টের দায় এবং টাকা জায়েজ হবে কি?
উত্তর:
- দায় প্রতিষ্ঠানের উপরই বর্তাবে। কারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি ও গাফিলতির কারণে পুনরায় সেমিস্টার/কোর্স করতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের সময় ও অর্থের অপচয়। ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেন: “কোনো ব্যক্তি যদি অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে তাকে ক্ষতি পূরণ করতে হবে।” (আল-আসল, ৩/২৫২)
- টাকা জায়েজ নয়। কারণ প্রতিষ্ঠান প্রতারণা ও ওয়াদা ভঙ্গ করে টাকা আদায় করেছে। এটি যুলুম ও বাতিল উপার্জন।
- ফাতাওয়া উসমানি: “এইভাবে অর্জিত টাকা নাজায়েজ। প্রতিষ্ঠানের উচিত শিক্ষার্থীদের অসম্পূর্ণ ক্লাসের অনুপাতে টাকা ফেরত দেওয়া বা বিনামূল্যে সম্পূর্ণ শিক্ষা প্রদান করা।” (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫২)
শিক্ষার্থীরা যদি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে পরীক্ষায় ফেল করে, তাহলে প্রতিষ্ঠান তাদের পুনরায় বিনা ফিতে পড়ানোর ব্যবস্থা করবে; অন্যথায় এটি জুলুম হবে।
সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ
- প্রতিষ্ঠানটি প্রতারক। তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ কবিরা গুনাহ।
- জ্ঞানের ঘাটতি ও ফেলের দায় প্রতিষ্ঠানের।
- সম্পূর্ণ টাকা নেওয়া জায়েজ নয়; ফেরত দেওয়া বা ক্ষতিপূরণ দেওয়া ওয়াজিব।
- শিক্ষার্থীদের সময় ও অর্থ নষ্টের জন্য প্রতিষ্ঠান দায়ী।
পরামর্শ:
- প্রতিষ্ঠানের উচিত অবিলম্বে অবশিষ্ট ক্লাসের আয়োজন করা বা বাদ পড়া ক্লাসের জন্য বিনা মূল্যে রেকর্ডেড লেকচার সরবরাহ করা।
- শিক্ষার্থীরা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য নম্রভাবে প্রতিষ্ঠানকে জানাতে পারে; প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
- আল্লাহ তাআলা বলেন: “ওয়াফু ইন্নাল্লাহা ইউহিব্বুল মুহসিনিন” (ক্ষমা করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন) — তবে জুলুমের বস্তু ফেরত না নেওয়া উচিত।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।