কারো জীবন নষ্ট করা বা শারীরিক সম্পর্কের উদ্দেশ্যে বিয়ে করা কি জায়েয?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে যেই উদ্দেশ্যে 'বিয়ে' সম্পন্ন হয়েছে, তা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। কারণ বিয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো স্থায়ী সম্পর্ক, পারস্পরিক দায়িত্ব ও অধিকার আদায়, এবং আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন। কিন্তু এখানে পুরুষের নিয়ত ছিল শুধুমাত্র শারীরিক সম্পর্ক ও প্রতারণা, এবং সে বিয়েকে খেলা হিসাবে গ্রহণ করেছে। তাই এই প্রতারণার গোনাহ তার হবে।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে:
-
নিয়তের গুরুত্ব:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:"إنما الأعمال بالنيات، وإنما لكل امرئ ما نوى"
"নিয়তের ওপরই আমলের ফল নির্ভর করে, এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে।" (সহীহ বুখারী: ১)
এখানে পুরুষের নিয়ত ছিল প্রতারণা ও বিয়ে ভঙ্গ করা, যা ইসলামী বিয়ের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। -
প্রতারণা নিষিদ্ধ:
আল্লাহ বলেন:"وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ"
"তোমরা মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিও না এবং পৃথিবীতে ফাসাদ (দুর্নীতি) করো না।" (সূরা হুদ: ৮৫)
এখানে পুরুষটি ইচ্ছাকৃতভাবে নারীর জীবন নষ্ট করার ষড়যন্ত্র করেছে, যা সুস্পষ্ট ফাসাদ। -
বিয়ের স্থায়িত্ব:
বিয়ে একটি মজবুত অঙ্গীকার (ميثاق غليظ) – (সূরা নিসা: ২১)। যেখানে স্থায়িত্ব ও দায়িত্বশীলতা আবশ্যক।
হানাফি ফিকহের রেফারেন্স:
-
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন):
"إذا تزوج بنية الطلاق أو بنية أنها لا يحل له وطؤها، فالنكاح صحيح لكنه مكروه"
অর্থাৎ, কেউ যদি তালাকের নিয়তে বিয়ে করে, তাহলে বিয়ে সহীহ হলেও তা মাকরুহ (অপছন্দনীয়)। কিন্তু আপনার বর্ণনায় প্রতারনার উদ্দেশ্য থাকায় এটি আরও গুরুতর অপরাধ।
তবে হানাফি ফকিহগণ স্পষ্ট বলেন: যদি বিয়ের মাধ্যমে কাউকে ধোঁকা দেওয়া ও তার জীবন নষ্ট করার উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে তা নাজায়েয (ফাতাওয়ায়ে শামী: ৩/১১)। -
ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি:
"التزويج بقصد الإضرار بالمرأة أو إيذائها لا يجوز"
"নারীর ক্ষতি বা কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিয়ে করা জায়েয নয়।" -
ইমাম আবু হানিফা (রহ):
তাঁর মতে, বিয়ের বৈধতার জন্য স্থায়ীত্বের নিয়ত জরুরি না হলেও প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি বিয়েকে বাতিল করে দেয়।
আপনার করণীয়:
যেহেতু পুরুষটি বিয়েকে বৈধ মনে করে না এবং তালাক দিতে রাজি নয়, তাই আপনি নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নিতে পারেন:
-
ফাসখ (বিচ্ছেদ) এর আবেদন:
ইসলামি আদালত বা স্থানীয় ইমাম/মুফতির কাছে গিয়ে ফাসখ (বিয়ে ভঙ্গ) এর আবেদন করুন। ফাসখ হলো, যখন স্বামী অন্যায়ভাবে স্ত্রীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তখন কাযী (বিচারক) স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিয়ে ভঙ্গ করে দিতে পারেন। হানাফি ফিকহে ফাসখের অনুমতি আছে যদি:- স্বামী নারীর অধিকার লঙ্ঘন করে।
- স্বামী প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি করে (ফাতাওয়ায়ে শামী: ৪/২২৫)।
-
খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিচ্ছেদ):
আপনি যদি মোহর বা কিছু অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার শর্তে খুলা চান, তাহলে তালাক ছাড়াই বিবাহ বিচ্ছেদ সম্ভব। তবে যেহেতু স্বামী সহযোগিতা করছে না, তাই আদালতের মাধ্যমে এটি করানো জরুরি। -
আইনি সহায়তা:
স্থানীয় ইসলামি ফোরাম বা মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী মামলা করুন। বাংলাদেশের পারিবারিক আদালতেও ইসলামি আইন অনুযায়ী ফাসখের বিধান আছে। -
সতর্কতা:
- এটি একটি ফাসাদ (দুর্নীতি) এর ঘটনা। আপনি যদি নীরব থাকেন, তবে এটি অন্যায়ভাবে চলতে থাকবে। তাই দ্রুত ব্যবস্থা নিন।
- আপনার জীবন ও ইজ্জত রক্ষা করা ফরজ। আল্লাহ বলেন:
"وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ"
"তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ফেলো না।" (সূরা বাকারা: ১৯৫)
সারসংক্ষেপ:
- এই বিয়ে বৈধ নয় এবং এটি প্রতারণার কারণে মাকরুহ ও নাজায়েয।
- স্বামী তালাক না দিলেও আপনি ফাসখ বা খুলা এর মাধ্যমে বিচ্ছেদ পেতে পারেন।
- দ্রুত ইসলামি আদালত বা মুফতির শরণাপন্ন হোন।
- আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন এবং ধৈর্যের সাথে ন্যায় চাইতে থাকুন।
সূত্র:
- ফাতাওয়ায়ে শামী: ৩/১১, ৪/২২৫
- ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি: ১/৩০৭
- রদ্দুল মুহতার: ২/৩৪১
- সহীহ বুখারী: ১
- সূরা হুদ: ৮৫, সূরা নিসা: ২১, সূরা বাকারা: ১৯৫