বারবার গুনাহ ও তাওবা করলেও আল্লাহ কি ক্ষমা করবেন? অনুতপ্ততা না থাকলে কি তাওবা কবুল হয়?
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমি বার বার তাওবা করি আবার কিছুদিন পর সেই তওবা ভেঙে যায় আমি গুনাহ করে ফেলি। এখন আমার তওবা করার পরেও মনে হয় আল্লাহ আমক ক্ষমা করেন নাই।আমার তওবা করতেও লজ্জা হয়। তাওবা করলে ভিতরে অনুভূতি আসে না কিন্তু কান্না আসে। চোখ দিয়ে পানি পরে। আমি যে ভাবি আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করেন নাই।তাহলে আল্লাহ সত্যিই আমাকে ক্ষমা করবেন না? কারণ বান্দা যেমন ধারণা করবে আল্লাহ তো বান্দার সাথে তেমনই।
আমি আমার এই ধারণা গুলো থেকে কিভাবে বের হব আর আর করণীয় কি?
আমার অনুতপ্ততা আসে না কিন্তু কান্না আসে চোখ দিয়ে পানি পরে। কিন্তু অনুতপ্ততা আসে না দেখে আমার মনে হয় আল্লাহ আমার তওবা কবুল করে নাই এই ধারণাটা কি ঠিক?
Answer
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সু-প্রিয় প্রশ্নকারী বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি যে গভীর অনুভূতি এবং আত্ম-সন্দেহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা আল্লাহর কাছে আপনার অন্তরের নরম হওয়ার প্রমাণ। আপনার কষ্ট ও চোখের পানি একটি বড় নিয়ামত। নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর দেওয়া হলো।
১. আমার তওবা কি আল্লাহ কবুল করবেন না? আমি তওবা করেও আবার গুনাহ করি, তাই কি আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন না?
উত্তর: আপনি যে ধারণা করছেন— "আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন না"—এটি সম্পূর্ণ ভুল এবং শয়তানের প্ররোচনা। আল্লাহর রহমত অপরিসীম। কুরআনে আল্লাহ স্পষ্ট বলেছেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللهِ إِنَّ اللهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
(সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩)
অর্থ: “বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর অত্যাচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।”
হাদিসে কুদসিতে এসেছে:
“إِنَّ عَبْدًا أَذْنَبَ ذَنْبًا، فَقَالَ: رَبِّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي، فَقَالَ: أَذْنَبَ عَبْدِي ذَنْبًا، فَعَلِمَ أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُ بِهِ، ثُمَّ عَادَ فَأَذْنَبَ، فَقَالَ: رَبِّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي، فَقَالَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: أَذْنَبَ عَبْدِي ذَنْبًا فَعَلِمَ أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُ بِهِ، ثُمَّ عَادَ فَأَذْنَبَ، فَقَالَ: رَبِّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي، فَقَالَ: أَذْنَبَ عَبْدِي ذَنْبًا، فَعَلِمَ أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُ بِهِ، فَلْيَفْعَلْ مَا شَاءَ”
(সহীহ বুখারী, হাদীস ৭৫০৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭৫৮)
**অর্থ: “এক ব্যক্তি গুনাহ করল এবং বলল, হে রব! আমার গুনাহ ক্ষমা করে দাও। আল্লাহ বললেন: আমার বান্দা গুনাহ করল এবং জানলো যে তার এমন রব আছে যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং শাস্তিও দেন। তারপর সে আবার গুনাহ করল এবং আবার তাওবা করল। আল্লাহ আবারও ক্ষমা করলেন। তারপর আবার গুনাহ করল এবং তাওবা করল। আল্লাহ বললেন: আমার বান্দা গুনাহ করল এবং জানলো যে তার এমন রব আছে যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং শাস্তিও দেন — সে যা ইচ্ছা করুক (আমি তাকে ক্ষমা করতেই থাকব)।”
(মানে: যতবার তাওবা করবে, আল্লাহ ততবার ক্ষমা করবেন)
হানাফি ফিকহের কিতাব ‘রদ্দুল মুহতার’-এ ইবনে আবেদীন রহ. লেখেন:
“তাওবার শর্ত হলো: গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, অনুতপ্ত হওয়া এবং পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প করা। যদি কেউ বারবার গুনাহ করে এবং বারবার তাওবা করে, তার তাওবা কবুল হবে। শয়তান তার জন্য হতাশা সৃষ্টি করতে চায়; তাই সে নিরাশ হবে না।”
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৪২২, কিতাবুল হুদুদ, বাবুল মুরতাদ)
সুতরাং, বারবার তাওবা ভাঙা বা পুনরায় গুনাহ করা আপনার জন্য হতাশার কারণ হওয়া উচিত নয়। বরং এটি আপনার দুর্বলতা, আর আল্লাহ দুর্বল বান্দার তাওবাও কবুল করেন।
২. “বান্দা যেমন ধারণা করে, আল্লাহ তার সাথে তেমনই ব্যবহার করেন” — এই কথা কি সত্য? আমি যদি মনে করি আল্লাহ ক্ষমা করবেন না, তাহলে কি সত্যিই ক্ষমা পাব না?
উত্তর: হ্যাঁ, হাদিসে এসেছে:
“أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي، فَلْيَظُنَّ بِي مَا شَاءَ”
(সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৭৫)
অর্থ: “আমি আমার বান্দার যেরূপ ধারণা পোষণ করে, সেরূপই হয়ে থাকি। সে আমার সম্পর্কে যা ইচ্ছা ধারণা করুক।”
ইমাম নববী রহ. এর ব্যাখ্যা:
এই হাদিস উৎসাহ দেয় যে, আল্লাহ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতে হবে। অর্থাৎ, বান্দা যদি মনে করে আল্লাহ ক্ষমাশীল, তিনি ক্ষমা করবেন। আর যদি মনে করে তিনি ক্ষমা করবেন না, তবে সে নিজেকেই ক্ষমা থেকে বঞ্চিত করবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, বান্দার খারাপ ধারণার কারণে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না; বরং বান্দা নিজেই হতাশ হয়ে তাওবা ছেড়ে দেয়, ফলে ক্ষমা পায় না।
আপনার কর্তব্য: আপনার ধারণা পরিবর্তন করুন। আল্লাহ সম্পর্কে সর্বোত্তম ধারণা রাখুন। কুরআনে এসেছে:
وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ
(সূরা আল-আ’রাফ, ৭:১৫৬)
“আমার রহমত সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে।”
হানাফি ফকিহগণ বলেন: গুনাহের পর তাওবা করা ফরজ, এবং তাওবা কবুল হবে বলে বিশ্বাস করা ওয়াজিব। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৩)
৩. আমার অন্তরে অনুতপ্ততা আসে না, কিন্তু চোখ দিয়ে পানি পড়ে। এটা কি তাওবা কবুল না হওয়ার লক্ষণ?
উত্তর: না, এটি মোটেও তাওবা কবুল না হওয়ার লক্ষণ নয়। বরং চোখের পানি আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসার নিদর্শন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
“দুই চোখ আছে যা জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না: ঐ চোখ যা আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে, এবং ঐ চোখ যা রাতের বেলায় আল্লাহর পথে পাহারা দিয়েছে।”
(তিরমিযী, হাদীস ১৬৩৩)
আপনার অনুভূতি শূন্য মনে হলেও, কান্না আসা এবং লজ্জা বোধ করাও তাওবার লক্ষণ। তাওবার মূল শর্ত হলো অন্তর থেকে গুনাহকে ঘৃণা করা ও পরিত্যাগ করা। কান্না তার বহিঃপ্রকাশ।
ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেছেন: “আমি তাওবা করেছি এবং অনুতপ্ত হয়েছি, কিন্তু পরে আবার গুনাহ করেছি। তবু আমি তাওবা করতেই থাকি, কারণ আমি জানি আল্লাহর দরজা বন্ধ হয় না।” (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১০/৯৪)
আপনার কর্তব্য: আপনি অনুতপ্ততা অনুভব না করলেও, আপনি গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং আল্লাহর কাছে ফিরছেন — এটাই তাওবার মূল। অনুভূতির অভাব নিয়ে চিন্তা করবেন না। বরং নিয়মিত তাওবা করতে থাকুন।
৪. আমি তাওবা করতেও লজ্জা পাই। আমার করণীয় কী?
উত্তর: লজ্জা ভালো, কিন্তু শয়তান আপনাকে তাওবা থেকে বিরত রাখতে চায়। আল্লাহর কাছে লজ্জা পাওয়ার পরিবর্তে গুনাহ করার সময় লজ্জা পান। আর তাওবা করার সময় লজ্জা পেলে চলবে না। আপনি যখন তাওবা করবেন, তখন মনে করবেন আপনি আল্লাহর কাছে ফিরছেন, যিনি সবচেয়ে দয়ালু।
ইমাম গাজ্জালী রহ. ‘ইহইয়া উলুমিদ্দীন’-এ লিখেছেন:
“তাওবা হলো গুনাহের পর ফিরে আসা। যদি বারবার গুনাহ করো, তবে বারবার ফিরে এসো। তুমি যদি তাওবা করতে লজ্জা পাও, তবে মনে রেখো, লজ্জিত হওয়ার মতো কাজ আগে তুমি করেছ, এখন করছ না।”
করণীয়:
- প্রতিবার গুনাহের পরপরই “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলুন এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করুন (তাওবাতুন নাসুহা)।
- দোয়া করুন: “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে তাওবা করছি। আপনি যদি আমার তাওবা কবুল না করেন, তবে আমি আর কার কাছে যাব? আমি দুর্বল, আপনি দয়ালু।”
৫. আমার ভুল ধারণা (যে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না) থেকে কীভাবে বের হব?
সমাধান:
(ক) কুরআনের আয়াত ও হাদিস অধ্যয়ন করুন: বিশেষ করে সূরা আয-যুমার ৫৩, সূরা আল-ফুরকান ৭০-৭১, এবং উপরোক্ত হাদিসগুলো। এগুলো আপনার হৃদয়ে আশা জাগাবে।
(খ) আল্লাহর নাম ‘আল-গফুর’, ‘আর-রাহীম’, ‘আল-তাওওয়াব’ স্মরণ করুন। অর্থ: ক্ষমাশীল, দয়ালু, তাওবা কবুলকারী।
(গ) শয়তানের কুমন্ত্রণা চিহ্নিত করুন: যখনই মনে হবে “আল্লাহ ক্ষমা করবেন না”, তখন সশব্দে “আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম” বলুন এবং এর বিপরীত বিশ্বাস করুন।
(ঘ) আল্লাহর কাছে দোয়া করুন: “হে আল্লাহ! আমি আপনার সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করছি। আপনি আমার তাওবা কবুল করুন এবং আমাকে ক্ষমা করুন।”
(ঙ) আলেম বা নেককার বন্ধুর সাথে কথা বলুন: আপনার অনুভূতি শেয়ার করুন।
সারসংক্ষেপ:
- আপনার তাওবা কবুল হবে ইনশাআল্লাহ, যদি আপনি গুনাহ ছাড়েন, ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং পুনরায় না করার নিয়ত করেন।
- বারবার গুনাহ করলেও তাওবা বন্ধ করবেন না।
- আল্লাহর রহমত আপনার হতাশার চেয়ে অনেক বড়।
- অনুতপ্ততা অনুভব না করা তাওবা কবুলের শর্ত নয়। শর্ত হলো অন্তর দিয়ে গুনাহ ত্যাগ করা। আপনার কান্না তারই প্রমাণ।
- আল্লাহ সম্পর্কে সর্বদা ভালো ধারণা রাখুন। “আশা করি তিনি ক্ষমা করবেন” — এই বিশ্বাসই তাওবা কবুলের কারণ হবে।
আল্লাহ আপনার তাওবা কবুল করুন এবং আপনাকে সৎপথে অবিচল রাখুন। আমীন।