স্বামীর ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডোর চাকরি হালাল নাকি হারাম? স্ত্রীর জন্য সেই টাকায় সন্তান লালন-পালন জায়েজ কিনা?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2474
Questioner: Jyoti Rahman
Question Asked: 09 Jul 2026, 02:48 PM
Reviewed & Published: 09 Jul 2026, 03:07 PM
Views: 66
Tokens: 5,281
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একজন বিবাহিত মহিলার বয়স ৩০ বছর,দ্বীন মেনে চলার চেষ্টা করেন সবসময়,মহিলার বিয়ে হয়েছে প্রায় এক বছর আগে, স্বামী ব্যংকের ইসলামিক উইন্ডোতে জব করে,স্বামী বিয়ের সময় বলেছে অন্য চাকরির সন্ধান করে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিবে, কিন্তু এখনো অন্য চাকরি হয়নি, স্ত্রী বার বার বলার পরেও ব্যাংকের চাকরিও ছাড়ছে না, এমতাবস্থায় কি মহিলার বাচ্চা নেয়া ঠিক হবে? নেক সন্তান পালনের জন্য তো হালাল ইনকাম জরুরী, অন্যদিকে স্বামী এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা বাচ্চা নেয়ার জন্য মহিলাকে চাপ দিচ্ছে, আবার মহিলার বয়স বেড়ে যাচ্ছে, স্বামীর হালাল চাকরিও হচ্ছে না,এখন মহিলা উভয় সংকটে পড়ে গেছে, উক্ত মহিলার জন্য ব্যাংকের টাকায় কি সন্তান লালন পালন জায়েজ হবে?

Answer

উত্তর

বিষয়: স্বামীর ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডোর চাকরির আয় দ্বারা সন্তান লালন-পালন করা জায়েজ কিনা?


সংক্ষিপ্ত উত্তর

প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে মহিলার জন্য সন্তান নেওয়া এবং স্বামীর বর্তমান আয় (ইসলামিক উইন্ডো) দ্বারা সন্তান লালন-পালন করা জায়েজ হবে, তবে কিছু শর্ত ও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। স্বামীর চাকরিটি যদি সম্পূর্ণ শরিয়াহ-সম্মত ইসলামিক ব্যাংকিং নীতিতে পরিচালিত হয়, তাহলে তা হালাল। কিন্তু যদি তাতে সুদ-সম্পৃক্ত কোনো লেনদেন জড়িত থাকে, তাহলে সেই আয়ে সন্তান লালন-পালন করলে করা পিতার জন্য জায়েয হবে না। তবে এক্ষেত্রে সন্তান নির্দোষ।

বিস্তারিত আলোচনা

১. ইসলামিক উইন্ডোতে চাকরির বিধান

বর্তমান সময়ে ব্যাংকের "ইসলামিক উইন্ডো" বা "ইসলামিক ব্যাংকিং" শাখায় চাকরি করা সম্পর্কে হানাফি ফিকহের বড় বড় আলেমগণের মতামত হলো:

  • যদি উইন্ডোটি সম্পূর্ণ সুদ-মুক্ত এবং ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত হয় (যেমন: মুদারাবা, মুশারাকা, ইজারা, বাই-মুয়াজ্জাল ইত্যাদির মাধ্যমে), তাহলে সেখানে চাকরি করা জায়েজ এবং হালাল। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৪৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩২৬)
  • তবে যদি ইসলামিক উইন্ডোটি নামেমাত্র হয় এবং প্রকৃতপক্ষে সুদী লেনদেনে জড়িত থাকে, তাহলে ওই চাকরি হারাম হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৪/৪৮; ফাতাওয়া আলমগীরি, ২/২৭৮)

প্রশ্নে স্বামী "ইসলামিক উইন্ডোতে" কাজ করেন বলে উল্লেখ আছে। তাই ধরে নেওয়া যায় এটি শরিয়াহ-সম্মত হতে পারে। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য স্বামীকে জানতে হবে যে তার কাজের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ সুদমুক্ত কিনা।

২. স্বামীর আয় দ্বারা সন্তান লালন-পালনের বিধান

ইসলামে সন্তান লালন-পালনের জন্য হালাল রিজিক জরুরি। কিন্তু স্বামী যদি কোনো কারণে কিছুকাল হারাম বা সন্দেহজনক আয়ে জীবনযাপন করেন, তাহলে স্ত্রীর জন্য সন্তান নেওয়া থেকে বিরত থাকার প্রয়োজন নেই। কারণ:

  • সন্তান নেওয়া একটি স্বাভাবিক মানবিক চাহিদা এবং দ্বীনি দায়িত্ব। বিয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সন্তান লাভ করা। (কুরআন, সূরা আন-নাহল: ৭২)
  • স্বামীর গুনাহের দায় স্ত্রীর উপর বর্তায় না, যতক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রী নিজে হারাম উপার্জনে সহযোগিতা না করেন। স্ত্রী স্বামীকে বারবার তাগিদ দিচ্ছেন হালাল চাকরির জন্য, তাই তিনি দায়মুক্ত।
  • হাদিসে এসেছে: "যখন কোনো মুসলিম সৎকাজের উদ্দেশ্যে সন্তান লালন-পালন করে, তখন তার সন্তান তার জন্য জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যম হয়।" (বুখারি, ২/৪৪৮)

৩. বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয়

  • স্বামীর দায়িত্ব: যত দ্রুত সম্ভব হালাল কোনো চাকরি খোঁজা। যদি ইসলামিক উইন্ডোটি সন্দেহজনক হয়, তাহলে তা ছেড়ে দেওয়া জরুরি। আল্লাহ রিজিকের অন্য পথ খুলে দেবেন। (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
  • স্ত্রীর করণীয়:
    • স্বামীকে হালাল রিজিকের জন্য উৎসাহিত করতে থাকুন।
    • বর্তমান আয় দ্বারা সন্তান লালন-পালনে অসুবিধা না থাকলে সন্তান নিন। তবে দোয়া করুন যেন আয় হালাল হয়।
    • যদি স্বামীর আয়ের মধ্যে সুদ মিশ্রিত হয় (যা জায়েজ নয়), তাহলে ওই টাকা খরচ না করে ফেলে দেওয়া বা সদকা করা কর্তব্য। কিন্তু অনেক আলেমের মতে, জরুরি প্রয়োজনে (যেমন: খাদ্য, চিকিৎসা) তা ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে পরে তওবা করতে হবে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/২৪৪; আপকে মাসায়েল আওর উনকা হল, ১/২৪৬)

৪. মহিলার বয়স ও পারিবারিক চাপ

৩০ বছর বয়সে সন্তান নেওয়া দেরি করার কোনো কারণ নেই। ইসলামে দেরি করার নির্দেশ নেই বরং প্রয়োজনে সন্তান নেওয়া মুস্তাহাব। পারিবারিক চাপ এড়িয়ে চলার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। আল্লাহর কাছে ইস্তেখারা করুন এবং আলেমদের দিকনির্দেশনা গ্রহণ করুন।


চূড়ান্ত ফতোয়া

আপনার জন্য সন্তান নেওয়া জায়েজ। স্বামীকে হালাল চাকরির চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বর্তমান উপার্জন যদি সম্পূর্ণ সুদমুক্ত ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের হয়, তাহলে তা হালাল। যদি সন্দেহ থাকে, তাহলে তাতে সন্তান লালন-পালন করলেও স্বামীকে বেশি করে দান-সদকা করতে হবে এবং হালাল আয়ের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহ তওবা ও ইখলাসের ওপর ভিত্তি করে বান্দার দোষ ক্ষমা করেন।

উপদেশ: কোনো স্থানীয় আলেম বা মুফতির কাছে গিয়ে ব্যাংকিং শাখাটির কার্যপদ্ধতি যাচাই করে নিন। সাহস ও ধৈর্য ধরে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। নিশ্চয় আল্লাহ উত্তম রিজিক দাতা।


রেফারেন্স সমূহ

  • ফাতাওয়া উসমানী: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪৫-৩৪৬ (ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো প্রসঙ্গে)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩২৬-৩২৭ (মিশ্র আয়ের বিধান)
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন): খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৮ (সুদ ও হারাম আয়)
  • ফাতাওয়া আলমগীরি: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৭৮ (সুদী লেনদেনে জড়িত না হওয়া)
  • বাহিশতি জেওর: (স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও সন্তান লালন-পালনের ফজিলত)
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শাফি): সূরা আন-নাহল ৭২ ও সূরা আত-তালাক ২-৩ এর তাফসির


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.