কুরবানীর গোশতে হালাল-হারাম মিশ্রিত থাকলে তা খাওয়ার হুকুম কী?
Qurbani-Slaughtering · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: কুরবানীর গোশতে হালাল-হারাম মিশ্রিত থাকলে তা খাওয়ার হুকুম ও ত্বলিবার ইলমের উপর প্রভাব
প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত বিবরণ:
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন, কুরবানীর সময় সমাজের বিভিন্ন লোকের থেকে প্রাপ্ত গোশতে যদি কারো উপার্জন হালাল না হয়, তাহলে সেই মিশ্রিত গোশত খাওয়া জায়েজ কি না? এবং এই গোশত খেলে কি ত্বলিবাদের (ইলম অর্জনকারী) ইলম থেকে মাহরূম হওয়ার আশঙ্কা আছে?
হানাফী ফিকহের আলোকে উত্তর:
১. কুরবানীর গোশতের মূল হুকুম:
কুরবানীর পশু যদি শরীয়তসম্মতভাবে জবাই করা হয় এবং যাবতীয় শর্ত পূর্ণ হয়, তাহলে সেই গোশত হালাল। কুরবানীদাতার উপার্জন হারাম হলেও কুরবানীর গোশত নিজে হারাম হয় না। কারণ, কুরবানীর পশু কেনার জন্য হারাম টাকা ব্যবহার করলে কুরবানী আদায় হবে, তবে তা গুনাহের কাজ হবে। কিন্তু গোশত খাওয়া জায়েজ থাকবে।
- ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন: “যদি কেউ হারাম টাকা দিয়ে পশু ক্রয় করে কুরবানী করে, তবে কুরবানী সহীহ হবে এবং গোশত খাওয়া জায়েজ। তবে সে গুনাহগার হবে কারণ হারাম মাল ব্যবহার করেছে।” (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৬)
- ফাতাওয়া আলমগীরী তেও বলা হয়েছে: “হারাম উপার্জনকারী ব্যক্তির কুরবানীর গোশত খাওয়া জায়েজ, তবে তার জন্য কুরবানী করা মাকরূহ।” (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/২৯৯)
২. সমাজ থেকে প্রাপ্ত মিশ্রিত গোশতের হুকুম:
সমাজে যেসব গোস্ত দেওয়া হয় এগুলো গরিবের হক হিসেবে দেওয়া হয় সুতরাং আপনি যদি গরিব মিসকিন না হন, সেক্ষেত্রে উক্ত গোস্ত না খাওয়ার পরামর্শ থাকবে।
পাশাপাশি উক্ত গোশতে মান্নতের গোশত থাকারও সম্ভাবনা রয়েছে, তাই ধনীদের সে গোশত পরিহার করাই উত্তম।
এরপরও যদি কোন ধনী সে গোস্তু খেয়ে ফেলে সেক্ষেত্রে যদি হালাল গোস্ত এর আধিক্যতা থাকে তাহলে তা খাওয়া না জায়েজ হবে না। তবে সর্বাবস্থায় সতর্কতা হল সে গোস্ত খাওয়া পরিহার করা।
-
হানাফী ফিকহে বলা হয়েছে: “যদি হারাম ও হালাল মিশ্রিত হয় এবং পৃথক করা সম্ভব না হয়, তবে সাধারণ মুসলমানদের জন্য তা খাওয়া জায়েজ, যদি না হারাম অংশের পরিমাণ বা উৎস নিশ্চিতভাবে জানা যায়।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫৮)
-
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন: “সমাজে যদি বেশিরভাগ মানুষের উপার্জন হালাল হয়, তাহলে মিশ্রিত গোশত খাওয়া জায়েজ। আর যদি বেশিরভাগই হারাম উপার্জনকারী হয়, তাহলে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।” (মা’আরিফুল কুরআন, ২/৪৫০)
৩. এই গোশত খাওয়া কি সরাসরি হারাম খাওয়ার অনুরূপ?
সমাজে যেসব গোস্ত দেওয়া হয় এগুলো গরিবের হক হিসেবে দেওয়া হয় সুতরাং আপনি যদি গরিব মিসকিন না হন, সেক্ষেত্রে উক্ত গোস্ত না খাওয়ার পরামর্শ থাকবে।
পাশাপাশি উক্ত গোশতে মান্নতের গোশত থাকারও সম্ভাবনা রয়েছে, তাই ধনীদের সে গোশত পরিহার করাই উত্তম।
এরপরও যদি কোন ধনী সে গোস্তু খেয়ে ফেলে সেক্ষেত্রে যদি হালাল গোস্ত এর আধিক্যতা থাকে তাহলে তা খাওয়া না জায়েজ হবে না। তবে সর্বাবস্থায় সতর্কতা হল সে গোস্ত খাওয়া পরিহার করা।
৪. ত্বলিবার ইলমের উপর প্রভাব:
যে সকল ত্বলিবা (ইলম অর্জনকারী) হারাম থেকে বাঁচার চেষ্টা করেন, তাদের জন্য উত্তম হলো:
- সম্ভব হলে নির্ভরযোগ্য হালাল উৎস থেকে গোশত সংগ্রহ করা।
- যদি সমাজের গোশতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়, তাহলে নিয়ত শুদ্ধ করে খাওয়া উচিত। কারণ বিচার হবে নিয়তের উপর। (বুখারি, ১/১)
- হাদীসে এসেছে: “যে ব্যক্তি হারাম খাদ্য গ্রহণ করে, তার ৪০ দিনের ইবাদত কবুল হয় না।” (মুসনাদে আহমাদ, ২/২৩৪) কিন্তু এখানে গোশত নিজে হারাম নয়, তাই এ হাদীস সরাসরি প্রযোজ্য নয়। তবে সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম।
ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেন: “হারাম খাদ্য ইলমের নূরকে নষ্ট করে দেয়। তাই ত্বলিবাদের উচিত সর্বদা হালাল খাদ্য গ্রহণ করা।” (ইহইয়া উলুমিদ্দীন, ২/১২৩)
তবে বাস্তব সমাজে যদি কোনো উপায় না থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা দয়া করবেন। কারণ আল্লাহ কারো সামর্থ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না। (সূরা বাকারা: ২৮৬)
সারসংক্ষেপ:
সমাজে যেসব গোস্ত দেওয়া হয় এগুলো গরিবের হক হিসেবে দেওয়া হয় সুতরাং আপনি যদি গরিব মিসকিন না হন, সেক্ষেত্রে উক্ত গোস্ত না খাওয়ার পরামর্শ থাকবে।
পাশাপাশি উক্ত গোশতে মান্নতের গোশত থাকারও সম্ভাবনা রয়েছে, তাই ধনীদের সে গোশত পরিহার করাই উত্তম।
এরপরও যদি কোন ধনী সে গোস্তু খেয়ে ফেলে সেক্ষেত্রে যদি হালাল গোস্ত এর আধিক্যতা থাকে তাহলে তা খাওয়া না জায়েজ হবে না। তবে সর্বাবস্থায় সতর্কতা হল সে গোস্ত খাওয়া পরিহার করা।
উল্লেখযোগ্য কিতাব:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) – ৬/৩২৬
- ফাতাওয়া আলমগীরী – ৫/২৯৯
- ফাতাওয়া উসমানী – ২/৪৫৮
- মা’আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী) – ২/৪৫০
- শরহে মা’আনিল আসার (তাহাভী) – ৪/৩২১
- ইহইয়া উলুমিদ্দীন (গাজ্জালী) – ২/১২৩