স্বামী যদি সন্দেহজনক বা হারাম টাকা বাবার কাছ থেকে নেয়, তবে স্ত্রীর কী করণীয়?
Family Life · Hanafi
Question
এর আগে প্রশ্ন করেছিলাম। আমার স্বামী আমার বাবার কাছে থেকে টাকা নিবেন কিন্তু আমার বাবার সেই টাকার বেশিরভাগ গুলোই স্পষ্ট হারাম না জানা গুলো তো হালাল নাকি হারাম জানি না। এখন স্বামীকে অনেক বুঝিয়েছি কিন্তু তারপরও টাকা (হারাম) নিয়েছে। কিছু টাকা আমাকে জানিয়ে নিয়েছে কিছু না জানিয়ে। আমি যখন ভালো করে বুজিয়ে বুঝেনি তখন আমাকে এভাবে মিথ্যে বলে বুঝায় যে ধার হিসেবে নিচ্ছে। হালাল হারাম এর কোনো তফাৎ করে না জীবনে। এরকম আমার মা বাবাও। এখন আমার স্বামীকে যে ভাবেই বুঝায় না কেনো কোনো কাজ হচ্ছে না সামনে কি হবে জানি না। উনি আমার সামনে ফেরেশতার মতো চলতে কিন্তু অন্তর টা নোংরামিতে ভরা। আমার ব্রেইন, আই ওয়াশ করে রাখতে চায়। আমার মা বাবা তো জোর করে বিয়ে দিয়েছে এখন জোর করতেছে সব মেনে নিতে। কিছু দিন আগে আমার মা তাদের বন্ধকি জমির কিছু চাল দিয়েছি। যা আমি ইচ্ছে করে নেয়নি। জোর করে দিয়েছে। এখন এই চাল গুলো কি করবো? এগুলা আমার খাওয়া কি জায়েজ হবে? আর আমার স্বামী যে হারাম টাকা গুলো নিয়েছে আমার বাবার থেকে তা দিয়ে তার নিজস্ব বন্ধকি জম খুলেছে। এখন সেই জমির ফসল কি হালাল হবে আমার বা আমার স্বামীর জন্য? এরকম স্বামীর হক কিভাবে আদায় করা যায়? হক আদায় না করলে কি গুনাহ হবে? আমার সংসার জীবন বিরক্ত লাগছে স্বামীর জন্য এমন মানুষ কীভাবে হয় তাই ভেবে। পাইনা
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার সমস্যা ও মনের কষ্ট আমি বুঝতে পেরেছি। আল্লাহর কাছে দোয়া করি তিনি আপনার জন্য উত্তম পথ প্রদর্শন করুন এবং সবর দান করুন।
আপনার প্রশ্নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। সেগুলো ক্রমান্বয়ে ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করছি।
১. আপনার স্বামী আপনার বাবার কাছ থেকে সন্দেহজনক/হারাম টাকা নিচ্ছেন
মূলনীতি: যদি কারো সম্পদের অধিকাংশই হারাম বা সন্দেহজনক হয়, তাহলে তাকে থেকে টাকা নেওয়া জায়েয নয়, যতক্ষণ না সুনির্দিষ্ট হালাল টাকা বা জিনিস চেনা যায়। (রদ্দুল মুহতার, ৪/২৭৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৩২)
আপনার স্বামী যদি জেনেশুনে এমন টাকা নেন, তবে তিনি গুনাহগার হবেন। আপনি তাকে নিষেধ করছেন, এটি আপনার কর্তব্য। কিন্তু তিনি নিচ্ছেন, আপনি তার জন্য দায়ী হবেন না। তবে আপনার ওপর যদি সেই টাকা থেকে কোনো কিছু দেয়, তাহলে তা গ্রহণ করা আপনার জন্য জায়েয নয়। বরং আপনি তা গ্রহণ করতে পারেন না। যদি কখনো আপনাকে সেই টাকা দেয়, তবে আপনি তা ফিরিয়ে দিন অথবা আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে দিন – তবে নিজে ব্যবহার করবেন না। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪০৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৫০)
তবে যদি টাকা সম্পূর্ণ হারাম বলে নিশ্চিত না হন, বরং শুধু সন্দেহ থাকে, তাহলে (বিশেষ করে বাবার সম্পদ হলে) একেবারে হারাম বলার আগে ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। বেশিরভাগ আলেমের মতে, যতক্ষণ সুস্পষ্ট হারাম প্রমাণিত না হয়, ততক্ষণ আসল সম্পদ হালাল ধরা হবে। কিন্তু যেহেতু আপনার বাবার বেশিরভাগ টাকাই স্পষ্ট হারাম না জানা এবং কিছু হারাম জানা, তাহলে এই মিশ্র সম্পদ থেকে টাকা নেওয়া মাকরূহ তাহরীমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) – এক্ষেত্রে স্বামীর পক্ষে এড়িয়ে চলা উচিত। (আল-হিদায়া, ৩/১৩৫)
২. আপনার মা বন্ধকি জমির যে চাল জোর করে দিয়েছেন, তা কী করবেন?
মূলনীতি: যদি কোনো জিনিস আপনার ইচ্ছা ছাড়া জোর করে দেওয়া হয়, তাহলে তা আপনার মালিকানায় আসে না। আপনি তা ফেরত দিতে বাধ্য নন, কিন্তু তা নিজের জন্য ব্যবহার করা জায়েয হবে না। বরং ওই চালগুলো আপনি ফকির-মিসকিনকে সদকা করে দিন – এতে আপনি পুণ্য পাবেন, আর আপনার মায়ের জন্যও নেকি হবে (যদি তিনি নেক নিয়তে দেন)। নিজে খাবেন না। (রদ্দুল মুহতার, ৪/১৮২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ২/৫০)
আর যদি আপনি চান, মাকে ফিরিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু সেটি না করে সদকা করাই উত্তম, বিশেষ করে যদি মা নিতে অস্বীকার করেন।
৩. আপনার স্বামী আপনার বাবার হারাম টাকা ব্যবহার করে নিজের বন্ধকি জমি খুলেছেন – এখন সেই জমির ফসল কি হালাল?
এখানে কয়েকটি দিক আছে:
- জমির মালিকানা: জমিটি আপনার স্বামীর নিজস্ব। তিনি শুধু বন্ধক মুক্ত করেছেন। বন্ধক মুক্ত করার জন্য তিনি যে টাকা দিয়েছেন তা যদি হারাম হয়, তাহলে তিনি গুনাহগার হলেন। কিন্তু জমির মালিকানা তার কাছেই ছিল, তাই জমি নিজে হালালই আছে।
- ফসলের হুকুম: ফসল উৎপন্ন হয়েছে তাঁর নিজ জমিতে, তাই ফসল হালাল। তবে যেহেতু তা বের করার পদ্ধতি হারাম টাকা দিয়ে করা, ফসল খাওয়া জায়েয – কিন্তু স্বামীকে তওবা করতে হবে এবং ঐ পরিমাণ টাকা (যা তিনি বাবার থেকে হারাম নেন) সদকা করে দিতে হবে (যদি বাবাকে ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয় বা তিনি তা নিতে রাজি না হন)। (দারুল উলুম দিওবন্দের ফাতাওয়া, কিতাবুল বুয়ু)
আপনার জন্য: সেই জমির ফসল খাওয়া আপনার জন্য হালাল। তবে আপনি স্বামীকে বোঝাবেন যে অন্তত হারাম টাকার পরিমাণ সদকা করে দিন।
৪. এরূপ স্বামীর হক কীভাবে আদায় করবেন? হক আদায় না করলে গুনাহ হবে?
স্বামীর ওপর স্ত্রীর কিছু অধিকার (হক) আছে ইসলামে:
- স্বামী ও স্ত্রীর পারস্পরিক সহবাসের অধিকার।
- সংসারের কাজ ও সেবা-শুশ্রূষা (উরফ ও শারিয়াহ অনুযায়ী)।
- স্বামীর বাড়িতে বসবাস ও নিরাপত্তা।
- স্বামীর আনুগত্য করা– তবে হারাম কাজে নয়।
আপনার স্বামী হারাম কাজ করছেন এবং আপনি তা সহ্য করছেন না। কিন্তু তবুও আপনি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে স্বামীর বৈধ অধিকার (যেমন: খাবার তৈরি, ঘর গুছানো, শারীরিক সম্পর্ক) আদায় না করেন, তাহলে আপনি গুনাহগার হবেন। তবে আপনি যদি কষ্ট পান, তার মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পারেন, তাহলে আপনি ফিকহি পদ্ধতিতে খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক নেওয়া) করতে পারেন। কিন্তু খুলার আগে দারুল উলুম বা স্থানীয় আলেমের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে কেউ যেন তার স্ত্রীর প্রতি এমন আচরণ না করে, যেমন পশুর সাথে করা হয়। বরং স্ত্রীর সাথে নম্রতা ও স্নেহের সাথে চলবে।" (তিরমিজি)
উপদেশ: আপনি এখন মা-বাবার বশবর্তী হয়ে আছেন, কিন্তু আপনার সংসার আপনার নিজের। আপনি স্বামীকে শান্তভাবে দ্বীনের দাওয়াত দিতে থাকুন। দোয়া করুন। যদি তিনি দিন দিন খারাপ হতে থাকেন এবং আপনার দ্বীনি ও মানসিক ক্ষতি হয়, তাহলে আপনি আলেমের পরামর্শে খুলার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন।
৫. আপনার নিজের অবস্থান ও করণীয়
-
আপনার মা-বাবার সাথে: আপনি তাদের সন্তান, তারা আপনাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছে, এখনও জোর করে চালিয়ে যাচ্ছে। আপনি তাদের সম্মান করবেন, কিন্তু দ্বীনের ব্যাপারে তাদের কথা অন্ধভাবে মেনে নেবেন না। আপনি প্রাপ্তবয়স্ক, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনার আছে। তবে সাহস ও ধৈর্যের সাথে আলোচনা করুন।
-
স্বামীর সাথে: তিনি বাহ্যিক ফেরেশতার মতো, অন্তর নোংরা – এটি একটি ভয়াবহ মানসিক নির্যাতন। আপনি যদি সঙ্গত কারণ ছাড়া তার অধিকার আদায় বন্ধ করেন, তাহলে আপনার ওপর গুনাহ হবে। তাই আপনি যথাসাধ্য স্বাভাবিক জীবনযাপন করুন, কিন্তু তার হারাম কাজের সাথে সম্পৃক্ত হবেন না। তাকে বোঝান যে হারাম রিজিক দোয়া কবুলের পথ বন্ধ করে দেয়।
-
সবশেষে, দোয়া: প্রভুর কাছে সাহায্য চান। হারাম থেকে বাঁচার তাওফিক দিন।
প্রাসঙ্গিক আয়াত:
﴿وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ﴾ (সূরা তালাক: ২-৩)
"যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (উত্তরণের) পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা তার ধারণায়ও আসে না।"
ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৩০):
"স্ত্রী যদি দেখে যে তার স্বামী হারাম উপার্জন করে, তাহলে সে তাকে নিষেধ করবে এবং সে টাকা থেকে নিজে ব্যবহার করবে না। তবে স্বামী যদি জোরাজুরি করে তাহলে সে কিছু করতে পারবে না, কিন্তু তার গুনাহ স্বামীর ওপরই হবে।
সংক্ষিপ্ত রায়:
- আপনার বাবার থেকে নেওয়া হারাম টাকা নিজে ব্যবহার করবেন না; সদকা করে দিন।
- জোর করে দেওয়া চাল নিজে না খেয়ে সদকা করুন।
- স্বামীর জমির ফসল হালাল, তবে স্বামীকে হারাম টাকার পরিমাণ সদকা করতে বলুন।
- স্বামীর বৈধ অধিকার আদায় করুন, কিন্তু হারাম কাজে সহযোগিতা করবেন না।
- বিয়েকে অক্ষুণ্ন রাখতে চাইলে তাকে দ্বীনের পথে আনার চেষ্টা চালিয়ে যান; না পারলে খুলা বা বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আলেমের পরামর্শ নিন।
আল্লাহ আপনাকে সবর, হেকমত ও দ্বীনের সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। আমিন।