আল্লাহর উপর থেকে বিশ্বাস উঠে গেলে করণীয় কি?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
এখন আমার কোনো আমলেই মন বসে না। মনে হয় এই আমল করে আর কি হবে! নামাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি এবং পাপাচারে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছি। আল্লাহর উপর থেকে আমার বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। সালাত যিকির কোনো কিছু করেই মনে শান্তি পাই না। একাকিত্ব আমাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহ যখন কোরআনে বলেই দিয়েছেন যে মেয়েরা যাতে ঘরের ভিতর থাকে, তাহলে তিনিই কেন মেয়েদের এমন পরিস্থিতিতে ফেলেন যাতে মেয়েদের বাহিরে বের হয়ে ফ্রি মিক্সিঙে জড়াতে হয় বা চাকরি করতে হয়?
আল্লাহ যখন মানুষের এবাদত এতই পছন্দ করেন, তবে তিনি কেনো পরিস্থিতি এত খারাপ করে দেন যে ওনার উপর থেকে বিশ্বাসই উঠে যায়?
তারই যখন বিধান, বিয়ে করা, তবে তিনিই কেনো এত চেষ্টার পরও বিয়ে কঠিন করে দেন এবং এতটা একা করে দেন যে পাপাচারে লিপ্ত হতে হয়?
Answer
উত্তর:
প্রিয় বোন, আপনার কষ্ট ও হতাশা আমরা বুঝতে পারছি। দুনিয়ার পরীক্ষা অনেক কঠিন হলে মানুষের ঈমান দুর্বল হয়ে যায়—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু শয়তান চায় আপনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যান। তাই প্রথমেই আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই:
১. দুনিয়া হলো পরীক্ষার স্থান, আরামের জায়গা নয়
আল্লাহ বলেন:
وَلَنَبۡلُوَنَّكُم بِشَيۡءٖ مِّنَ ٱلۡخَوۡفِ وَٱلۡجُوعِ وَنَقۡصٖ مِّنَ ٱلۡأَمۡوَٰلِ وَٱلۡأَنفُسِ وَٱلثَّمَرَٰتِۗ وَبَشِّرِ ٱلصَّـٰبِرِينَ
“আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, মাল, জান ও ফলের ঘাটতি দিয়ে। আর терпеливым সুসংবাদ দাও।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫)
আল্লাহ কোনো বান্দাকে ভালোবাসলে তাকে পরীক্ষা করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ عِظَمَ الْجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ الْبَلَاءِ، وَإِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلَاهُمْ
“নিশ্চয় বড় প্রতিদান বড় পরীক্ষার সাথেই আসে। আর আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তাদের পরীক্ষা করেন।” (তিরমিযী, হাদীস সহীহ)
আপনার জীবনের কষ্টগুলো আপনার জন্য কল্যাণের—যদি আপনি ধৈর্য ধারণ করেন। ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন: “যখন আল্লাহর বান্দার প্রতি ভালোবাসা বাড়ে, তখন তার পরীক্ষাও বাড়ে।”
২. আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখা এবং দু‘আ করাই একমাত্র পথ—নিরাশ হওয়া জায়েয নয়
আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَا۟يْـَٔسُوا۟ مِن رَّوْحِ ٱللَّهِ ۖ إِنَّهُۥ لَا يَا۟يْـَٔسُ مِن رَّوْحِ ٱللَّهِ إِلَّا ٱلْقَوْمُ ٱلْكَـٰفِرُونَ
“আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে শুধু কাফিররাই নিরাশ হয়।” (সূরা ইউসুফ, ১২:৮৭)
আপনি বলছেন আল্লাহ ডাক শুনেন না। কিন্তু আল্লাহ বলেন:
وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدْعُونِيٓ أَسْتَجِبْ لَكُمْ
“তোমাদের পালনকর্তা বলেন: তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” (সূরা গাফির, ৪০:৬০)
কিন্তু দু‘আ কবুলের জন্য কয়েকটি শর্ত আছে:
- খালেস নিয়তে করা।
- হারাম খাদ্য ও হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকা।
- মনোযোগ সহকারে করা।
- ধৈর্য ধরা (হয়তো দেরিতে কবুল হয়, বা এর চেয়ে ভালো কিছু দিয়ে বদলে দেয়া হয়)।
শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা (রহ.) বলেন:
“আল্লাহ বান্দার দু‘আ কবুল করেন না এটা ভাবা শয়তানের পক্ষ থেকে বড় প্ররোচনা। বান্দা যদি তার হক আদায় করে (দু‘আর শর্ত পালন করে), আল্লাহ তার দু‘আ কবুল করবেনই—হতে পারে দুনিয়ায়, হতে পারে আখিরাতে, হতে পারে বিপদ সরিয়ে দিয়ে।”
৩. আপনার প্রথম প্রশ্ন: ‘মেয়েরা ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়ে কেন আল্লাহ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন যেখানে মেয়েদের বাইরে বের হতেই হয়?’
আল্লাহ মেয়েদের ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন যখন প্রয়োজন নেই, বরং প্রয়োজন থাকলে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। যেমন, জ্ঞানার্জনের জন্য, চিকিৎসার জন্য, বা জরুরি প্রয়োজনে। কোরআনে বলা হয়েছে:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ
“আর তোমরা নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করো।” (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৩৩)
এই আয়াত নবীপত্নীদের উদ্দেশ্যে, তবে সাধারণ মেয়েদের জন্যও শিক্ষণীয়। কিন্তু ইসলাম প্রয়োজন সাপেক্ষে মেয়েদের বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছে, তবে শর্তসাপেক্ষে—পর্দা, গায়রে মাহরামের সাথে অবাঞ্ছিত মেলামেশা না করা ইত্যাদি।
আপনার যা পরিস্থিতি—বিয়ে না হওয়া, পরিবারে আর্থিক প্রয়োজন বা নিজেকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন—সে ক্ষেত্রে চাকরি করা জায়েয, কিন্তু শর্ত হলো:
- শুধু মেয়েদের পরিবেশ বা যথাসম্ভব পর্দা রক্ষা করে।
- ফ্রি-মিক্সিং এড়িয়ে চলা।
- ফিতনার আশঙ্কা থাকলে অন্য ব্যবস্থা খোঁজা।
আপনি বলছেন মহিলা কলেজে পড়ার কারণে ফ্রি-মিক্সিং নেই—এটা ভালো। চাকরির ক্ষেত্রেও যদি নারী-পুরুষের অবাঞ্ছিত মেলামেশা থাকে, তাহলে তা বর্জন করতে হবে। তবে ইসলাম আপনাকে নিরুপায় অবস্থায় হারামে জড়াতে বাধ্য করে না। আল্লাহ বলেন:
لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের চেয়ে বেশি দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৮৬)
বরং আপনি দু‘আ করুন, তাওয়াক্কুল করুন—আল্লাহ এমন পথ বের করে দেবেন যা হারাম থেকে দূরে রাখে।
শায়খ ইবন বায (রহ.) বলেন:
“যদি কোনো নারী চাকরি করতে বাধ্য হয়, তবে তাকে অবশ্যই পর্দা রক্ষা করতে হবে এবং এমন কাজ বেছে নিতে হবে যা তার ধর্মের জন্য নিরাপদ। আর আল্লাহ তাকওয়ার পথ সহজ করে দেন।”
৪. দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্ন: ‘আল্লাহ এবাদত পছন্দ করেন কেন এমন পরিস্থিতি দেন যে বিশ্বাস উঠে যায়?’ ও ‘বিয়ে কঠিন করে দেন কেন?’
আল্লাহ পরীক্ষা দেন ঈমানের মজবুতির জন্য, পাপ মোচনের জন্য, এবং ধৈর্যশীলদের মর্যাদা বাড়ানোর জন্য। ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন:
“যখন আপনি দেখেন যে আল্লাহ আপনার নেক আমল করেও দুনিয়ায় আপনার বিপদ বাড়িয়ে দিচ্ছেন, তাহলে জানবেন যে তিনি আপনার জন্য আখিরাতে জমা করছেন।”
বিয়ে কঠিন হওয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে:
- আপনার তাকদীরে ভালো স্বামী নির্ধারিত আছে, এখনই সময় হয়নি।
- আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষা করছেন, আপনার ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল কতটুকু।
- হতে পারে আপনি যে পাত্র বা পদ্ধতি অবলম্বন করছেন তাতে কোনো অসঙ্গতি আছে (যেমন পাত্রপক্ষের সাথে ইসলামী পদ্ধতি না মানা)।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَأَنْكِحُوهُ
“যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি আসে যার দ্বীন ও চরিত্র তোমরা পছন্দ করো, তাকে বিবাহ দাও।” (তিরমিযী, সহীহ)
আপনি পাত্রপক্ষের দ্বীন-চরিত্র যাচাই করুন। এবং দু‘আ করুন যেমন রাসূল ﷺ শিখিয়েছেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ (বিয়ের ইচ্ছা থাকলে)
এছাড়া নিজের আমল ও পাপাচার থেকে ফিরে আসুন। আপনি যদি পাপে লিপ্ত হন, তাহলে তা আপনার দু‘আ কবুলের পথে বাঁধা হতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
“হে লোকসকল! আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া কিছু কবুল করেন না।” (মুসলিম)
৫. আপনার বর্তমান অবস্থার জন্য করণীয়
-
তওবা করুন: আপনি যে পাপাচারে লিপ্ত হচ্ছেন তা ছেড়ে দিন। আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন।
-
নামাজ শুরু করুন: নামাজ ছেড়ে দিলে ঈমান চলে যায়। রাসূল ﷺ বলেছেন:
إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلَاةِ
“মানুষ ও শিরক-কুফরের মাঝে পার্থক্য হলো নামাজ ত্যাগ করা।” (মুসলিম) -
ধৈর্য ও ইস্তিগফার বাড়ান: ইবন তাইমিয়্যা বলেন, “আল্লাহর কাছে আর্জি করো, তিনি যেন তোমার জন্য ভালো কিছু না আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধরার তাওফিক দেন।”
-
পরিবারের সাথে সম্পর্ক সুন্দর রাখুন, তবে জুলুম সহ্য করবেন না। বোনের স্বামীর ব্যাপারে সালিশ করুন বা বাবাকে নিয়ে কথা বলুন।
-
বিয়ে নিয়ে তাড়াহুড়ো না করে, বরং ইসলামী পন্থায় সৎ কোনো পাত্রের সন্ধান করুন—মসজিদের ইমাম বা বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে।
-
আল্লাহর কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেলেও হতাশ হবেন না। বরং নবী ইউনুস (আ.) এর মতো গভীর অন্ধকারে ডেকে উঠুন: لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ।
উপসংহার
আপনার সমস্যা একা আপনার নয়; অনেক মুমিনই এ পথ পাড়ি দিয়েছেন। আল্লাহ চান আপনাকে শুদ্ধ করতে, আপনার ঈমানের মান বাড়াতে। আপনি যদি এই কঠিন পথ ধৈর্য ধরে পার হন, তাহলে আখিরাতে পুরস্কার অনেক বড়। এ জন্য শয়তান আপনাকে পাপের দিকে নিয়ে যেতে চায়—সাবধান!
আপনার প্রতি আমাদের অনুরোধ:
১. এখনই নামাজে ফিরে আসুন।
২. তওবা করুন এবং নিজেকে সংশোধন করুন।
৩. দু‘আ করুন আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে।
৪. ভালো লোকের মাধ্যমে বিয়ের চেষ্টা চালিয়ে যান, কিন্তু আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ... إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
“মুমিনের ব্যাপার আশ্চর্যজনক—তার সব কাজই কল্যাণ... যদি তার উপর সুখ আসে, শুকর করে—তা তার জন্য কল্যাণ। আর যদি দুঃখ আসে, ধৈর্য ধরে—তাও তার জন্য কল্যাণ।” (মুসলিম)
আল্লাহ আপনার ধৈর্যকে কবুল করুন, আপনার দু‘আ কবুল করুন এবং উত্তম পাত্র দান করুন। আমীন।