মাদ্রাসার কমিটির সদস্যের দুর্ঘটনা এবং কিছু নৈতিক প্রশ্ন

Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 2365
Questioner: English Grammar
Question Asked: 05 Jul 2026, 07:11 PM
Reviewed & Published: 05 Jul 2026, 07:19 PM
Views: 46
Tokens: 9,835
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমাদের মাদ্রাসা রয়েছে। মাদ্রাসায় দশ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি রয়েছে। নতুন বছরের শুরুতে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বৃদ্ধি করার জন্য, বাড়িতে বাড়িতে শিক্ষার্থী খুঁজতে যাওয়া হয়। ঠিক এভাবে একদিন মাদ্রাসার দুজন শিক্ষক (এর মধ্যে একজন শিক্ষক ও পরিচালক) এবং একজন কমিটির সদস্য শিক্ষার্থী খুঁজতে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনায় পতিত হন। এতে শিক্ষকদের কিছু না হলেও, কমিটির সদস্যের পা ভেঙে যায়। কমিটির উক্ত সদস্য এবং শিক্ষক দুজন বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষার্থী খুঁজতে বের হয়েছিলেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, উক্ত কমিটির সদস্যের চিকিৎসা খরচ কে বা কারা বহন করবে? উক্ত মাদ্রাসা থেকে মানুষের কল্যাণে এবং সেবামূলক কাজ করা হয়। এলাকার গরিব-দুঃখী মানুষের জন্য সাধ্যের মধ্যে সাহায্য করা হয়। এক্ষেত্রে সবার আগে সাহায্য কে পাবে—উক্ত পা ভেঙে যাওয়া কমিটির সদস্য নাকি অন্য সাধারণ হকদার?
উক্ত কমিটির সদস্যের আর্থিক অবস্থা মোটামুটি ভালো এবং উনি চিকিৎসা খরচ চাননি। এক্ষেত্রে বাহির থেকে একজন লোক তাঁকে বলেছিলেন যে, "আপনার চিকিৎসা খরচ মাদ্রাসার ফান্ড থেকে নেওয়া উচিত বা আপনাকে দেওয়া উচিত।" তখন উক্ত কমিটির সদস্য বলছেন, "মাদ্রাসা তো আমাদের, এখান থেকে আমি চিকিৎসা খরচ কেন নেব? মাদ্রাসার কাজ তো আমাদেরই কাজ।" তখন উক্ত লোক কমিটির সদস্যকে বলেছেন, "ধরুন আপনি টাকা নিলেন না বা আপনার প্রয়োজন নেই; কিন্তু যাঁর টাকা নেই, এ ধরনের যদি কারও এই অবস্থা হতো, তাহলে সেই লোক কীভাবে চিকিৎসা খরচ বহন করত? আপনি টাকা না নিয়ে তো ভবিষ্যতে কারও এই অবস্থা হলে তাঁর জন্য কঠিন করে দিলেন।"
যদিও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ উক্ত লোককে চিকিৎসা খরচ দেওয়ার কথাও বলেনি।

Answer

উত্তরঃ
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد:

প্রশ্নটির আলোকে আমরা নিম্নোক্ত ফিক্বহী মাসয়ালাগুলো বিশ্লেষণ করছি:

১. কমিটির সদস্যের চিকিৎসা খরচ কে বহন করবে?

ক. মাদ্রাসার ফান্ড থেকে দেওয়া জায়েয কি না?

উক্ত সদস্য সেচ্ছাসেবী (متطوع) হিসেবে বিনা পারিশ্রমিকে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী সংগ্রহের কাজে বের হয়েছিলেন। ইসলামী ফিক্বহে সেচ্ছাসেবীর দায়-দায়িত্ব সংক্রান্ত নীতিমালা হলো:

  • ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: “যদি কেউ জনকল্যাণমূলক কোনো কাজের জন্য সেচ্ছাসেবা করে এবং সে কাজে তার কোনো ক্ষতি হয় বা খরচ হয়, তবে তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া জায়েয, কারণ ইসলামে ‘লা দারার ওয়া লা দিরার’ (কোনো ক্ষতি নয় এবং কোনো ক্ষতির প্রতিশোধ নয়) নীতি প্রযোজ্য।” (مجموع الفتاوى ৩০/১৬৩)

  • শাইখ ইবনু উসাইমীন (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “মসজিদের সেচ্ছাসেবী কর্মী যদি কাজ করতে গিয়ে আহত হয়, তবে মসজিদের তহবিল থেকে তার চিকিৎসার খরচ দেওয়া যাবে কি?” উত্তরে তিনি বলেন: “হ্যাঁ, তা জায়েয; কারণ এটি সৎকর্ম ও তাকওয়ায় সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত। তবে শর্ত হলো, দাতাদের নিঃশর্ত দানের টাকা থেকে তা নেওয়া যাবে; যদি দানের টাকা নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য নির্ধারিত হয় (যেমন শুধু গরিবদের জন্য), তাহলে সেচ্ছাসেবী যদি গরিব না হয়, তবে সেই টাকা থেকে দেওয়া জায়েয হবে না।” (ফাতাওয়া নূর আলাদ দারব, ১২/২৫৪)

  • শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন: “সেচ্ছাসেবী কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ করার সময় দুর্ঘটনায় পড়লে, প্রতিষ্ঠানটি ইহসান (সৌজন্য) হিসেবে তার চিকিৎসা খরচ বহন করতে পারে, যদি তহবিল অনুমতি দেয় এবং দাতাদের শর্তের পরিপন্থী না হয়। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়, বরং মুস্তাহাব।” (আল-মুনতাকা, ৪/২৯৭)

খ. মাদ্রাসার ফান্ডের প্রকৃতি কী?

প্রশ্নে বলা হয়েছে, মাদ্রাসাটি এলাকার গরিব-দুঃখী মানুষের জন্যও সাহায্য করে। সুতরাং মাদ্রাসার ফান্ড সম্ভবত সাধারণ দান (সাদাকা/যাকাত) বা ওয়াকফ হতে পারে। এখানে চিকিৎসা খরচ দেওয়া যাবে যদি:

  • দানকারীগণ শর্ত না করে থাকেন যে, টাকা শুধু গরিবদের জন্যই ব্যবহার করতে হবে।
  • অথবা মাদ্রাসার কার্যনির্বাহী বাজেটে এমন একটি খাত থাকে যা সেচ্ছাসেবীদের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়।

যদি ফান্ডটি সম্পূর্ণরূপে গরিব-মিসকিনদের জন্য নির্ধারিত হয় (যেমন যাকাতের টাকা), তবে কমিটির সদস্য যেহেতু স্বচ্ছল (তার আর্থিক অবস্থা ভালো), তাই তার জন্য সেই টাকা গ্রহণ করা জায়েয নয়। তবে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ যদি সাধারণ সাদাকা বা অনির্দিষ্ট দান থেকে তাকে সহায়তা করে, তাহলে তা জায়েয।

গ. কমিটির সদস্যের কথা: “মাদ্রাসা তো আমাদের, এখান থেকে আমি নেব কেন?”

এ কথা ঠিক নয়। মাদ্রাসার টাকা ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের আমানত। সেচ্ছাসেবী হিসেবে তাঁর কাজ প্রতিষ্ঠানের জন্য, আর প্রতিষ্ঠানের ফান্ড থেকে তাঁর ক্ষতিপূরণ দেওয়া অপচয় নয়, বরং ন্যায্য অধিকার যদি প্রতিষ্ঠান তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে তিনি যদি খুশিমনে তা না নেন, তবে এটি তাঁর নিজের ফজিলত। কিন্তু এতে ভবিষ্যতে অন্যদের জন্য কষ্ট তৈরি হতে পারে – যেমন বাইরের লোকটি বলেছেন। সুতরাং উত্তম হলো, তিনি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া টাকা গ্রহণ করে ভবিষ্যতে সেচ্ছাসেবীদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: “যদি কোনো ব্যক্তি নিজের হক ছেড়ে দেয়, তবে তা তার জন্য জায়েয; কিন্তু যদি তা অন্যদের ক্ষতি করে, তাহলে তাকে হক গ্রহণ করা উচিত।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ২০/৪০)

২. সবচেয়ে আগে সাহায্য কে পাবে – কমিটির সদস্য নাকি অন্য গরিব?

ইসলামে সাদাকা ও দান-খয়রাতের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ও অভাব বিবেচনা করা হয়। কমিটির সদস্য স্বচ্ছল (চিকিৎসা খরচ চাননি, নিজে দিতে সক্ষম), সুতরাং মাদ্রাসার দান তহবিল থেকে প্রথমে দেওয়া উচিত সেসব গরিব-দুঃখী মানুষকে, যাদের কাছে চিকিৎসার টাকাও নেই। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: “সাদাকা গ্রহণ করা উচিত তাদের জন্য যারা অভাবী, আর ধনীদের জন্য তা হারাম।” (আবু দাউদ, হাসান)

তবে মাদ্রাসার অপারেশনাল বাজেট থেকে (যা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা ব্যয়ের জন্য নির্ধারিত) কমিটির সদস্যকে চিকিৎসা খরচ দেওয়া যেতে পারে, যদি এটি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে হয়। সেটি সাদাকার টাকা নয়, বরং পরিচালনা ব্যয় হিসেবে গণ্য হবে।

৩. ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা:

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের উচিত একটি লিখিত নীতি তৈরি করা যে, সেচ্ছাসেবী বা কমিটির সদস্যরা মাদ্রাসার কাজ করতে গিয়ে আহত হলে, তাদের চিকিৎসা খরচ নির্দিষ্ট একটি ফান্ড থেকে বহন করা হবে। তাহলে ভবিষ্যতে এ রকম পরিস্থিতিতে কেউ টাকা নিতে দ্বিধা করবে না।

সারসংক্ষেপ:

১. চিকিৎসা খরচ বহন: মাদ্রাসার সাধারণ তহবিল (যা গরিবদের জন্য নির্ধারিত নয়) থেকে কমিটির সদস্যকে চিকিৎসা খরচ দেওয়া জায়েয এবং মুস্তাহাব। তবে তিনি স্বচ্ছল ও নিজে নিতে রাজি না হওয়ায় বাধ্য করা যাবে না। কিন্তু ভবিষ্যৎ কল্যাণের জন্য তাঁকে গ্রহণ করা উচিত।
২. অগ্রাধিকার: গরিব-দুঃখীদের সাহায্য সাদাকার টাকা থেকে পাবেন, কমিটির সদস্য তার থেকে আলাদা।
৩. সতর্কতা: প্রতিষ্ঠানের ফান্ড যদি শর্তযুক্ত হয় (শুধু গরিবদের জন্য), তাহলে স্বচ্ছল ব্যক্তির জন্য তা দেওয়া জায়েয নয়। সে ক্ষেত্রে আলাদা তহবিল বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সাহায্য করা ভালো।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.