কুরআন তেলাওয়াত ও যিকিরের সময় নিঃশ্বাস না নিয়ে তিলাওয়াত বা যিকির করা কি যাবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২. যদি কুরআন তেলাওয়াতের সময় এক আয়াত থেকে অন্য আয়াতে যাওয়ার সময় কি নিঃশ্বাস ছাড়তে হবে নাকি নিঃশ্বাস রেখে বিরতি নিয়ে পড়া যাবে?
৩. যদি কুরআন পড়ার সময় বা কোনো দোয়া-যিকির পড়ার সময় আয়াতে ওয়াক্বফ আসলে বা দোয়ার মধ্যে ওয়াক্বফ আসলে কি শ্বাস ছাড়তে হবে নাকি নিঃশ্বাস রেখে বিরতি নিয়ে পড়া যাবে?
Answer
উত্তর :
প্রশ্নকারী প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—
প্রথম প্রশ্ন: “কেউ যদি এক নিঃশ্বাসে যিকির করে তা কি জায়েয?”
উত্তর: হ্যাঁ, এক নিঃশ্বাসে যিকির করা জায়েয। এতে কোনো নিষেধ নেই। তবে ভালো হলো স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস নিয়ে যিকির করা, কারণ এক নিঃশ্বাসে দীর্ঘক্ষণ যিকির করলে কষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সাহাবায়ে কিরাম ও সালফে সালেহীনগণ সাধারণত স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিয়ে যিকির করতেন। তবে কোনো ব্যক্তি যদি সামর্থ্য অনুযায়ী এক নিঃশ্বাসে যিকির করে, তাহলে তা বৈধ। (ফাতাওয়া উসমানী, ১/২৫৬; রদ্দুল মুহতার, ১/২৮৫)
দ্বিতীয় প্রশ্ন: “কুরআন তেলাওয়াতের সময় এক আয়াত থেকে অন্য আয়াতে যাওয়ার সময় কি নিঃশ্বাস ছাড়তে হবে নাকি নিঃশ্বাস রেখে বিরতি নিয়ে পড়া যাবে?”
উত্তর: কুরআন তেলাওয়াতের সুন্নত পদ্ধতি হলো—প্রতিটি আয়াতের শেষে থামা এবং সেখানে শ্বাস নেওয়া। তবে কোনো ব্যক্তি যদি শ্বাস না নিয়েই (অর্থাৎ শ্বাস আটকে রেখে) এক আয়াত শেষ করে অন্য আয়াতে চলে যায়, তাহলে তা জায়েয আছে, তবে তা সুন্নতের খিলাফ। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর তেলাওয়াত ছিল থেমে থেমে এবং স্পষ্টভাবে, যেমন হাদীসে এসেছে—
«كَانَ يُقَطِّعُ قِرَاءَتَهُ آيَةً آيَةً»
“তিনি তাঁর কিরাত আয়াত আয়াত করে বিভক্ত করে পড়তেন।” (সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪০০১; সুনান তিরমিযী, হাদীস: ২৯২৭)
তাই উত্তম হলো প্রতিটি আয়াতের শেষে শ্বাস নেওয়া। তবে শ্বাস না নিয়ে পড়া নাজায়েয নয়; বরং মাকরূহে তানযীহি হবে যদি তাতে তাড়াহুড়ো বা অক্ষরের উচ্চারণে সমস্যা হয়। (আল-হিদায়া, ১/৭৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/৪০২)
তৃতীয় প্রশ্ন: “কুরআন পড়ার সময় বা কোনো দোয়া-যিকির পড়ার সময় আয়াতে ওয়াক্বফ আসলে বা দোয়ার মধ্যে ওয়াক্বফ আসলে কি শ্বাস ছাড়তে হবে নাকি নিঃশ্বাস রেখে বিরতি নিয়ে পড়া যাবে?”
উত্তর: ওয়াক্বফের অর্থ হলো—সেখানে থামা। থামার পর পুনরায় তেলাওয়াত শুরু করতে শ্বাস নেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি শ্বাস না ছেড়ে (অর্থাৎ শ্বাস আটকে রেখে) সামান্য বিরতি দিয়ে আবার পড়তে শুরু করে, তাহলে তাও বৈধ। তবে ওয়াক্বফের উদ্দেশ্য হলো শ্বাস নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং তেলাওয়াতকে আরও পরিষ্কার ও সুন্দর করা। তাই শ্বাস না নেওয়া উদ্দেশ্যের বিপরীত। হানাফী ফিকাহবিদগণ বলেন—
“وَالتَّنَفُّسُ عِنْدَ الْوَقْفِ لَيْسَ بِوَاجِبٍ لَكِنَّهُ أَحْسَنُ لِلتَّرْتِيلِ”
“ওয়াক্বফের সময় নিঃশ্বাস নেওয়া ওয়াজিব নয়, তবে তরতীলের জন্য তা উত্তম।” (শরহু মা‘আনিল আছার, ২/১০৫; বাদায়েউস সানায়ে’, ১/৪৫১)
দোয়া ও যিকিরের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম—স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়া উত্তম, কিন্তু শ্বাস আটকে রাখা নিষেধ নয়।
সারসংক্ষেপ:
- এক নিঃশ্বাসে যিকির জায়েয, তবে স্বাভাবিক শ্বাস নেওয়াই উত্তম।
- কুরআন তেলাওয়াতে প্রতিটি আয়াতের শেষে শ্বাস নেওয়া সুন্নত; শ্বাস না নিয়ে পড়া জায়েয হলেও উত্তম নয়।
- ওয়াক্বফের সময় শ্বাস ছাড়া জরুরি নয়; বরং শ্বাস রেখে বিরতি নিয়ে পড়লে তাও বৈধ, তবে শ্বাস নেওয়াই উত্তম।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানী (১/২৫৬)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/৪০২)
- রদ্দুল মুহতার (১/২৮৫)
- আল-হিদায়া (১/৭৪)
- শরহু মা‘আনিল আছার (২/১০৫)