ইদ্দত চলাকালীন জরুরী মাসআলা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
ইদ্দতের ৩ মাস পর্যন্ত বা এর পরেও?
Answer
উত্তর: এক তালাকের পর স্বামীর খোঁজ-খবর নেওয়ার বিধান
প্রশ্নে উল্লেখিত ‘এক তালাক’ দ্বারা উদ্দেশ্য যদি প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক (যা রাজ‘ঈ তথা প্রত্যাহারযোগ্য) হয়, তাহলে ইদ্দতকাল (তিন মাস বা তিন হায়েজ) পর্যন্ত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয় না। এই সময়ে স্ত্রী তার স্বামীর সাথে কথা বলতে পারে, তার খোঁজ-খবর নিতে পারে এবং প্রয়োজনে সরাসরি যোগাযোগও করতে পারে। তবে শরী‘আতের পর্দা ও শিষ্টাচার বজায় রেখে এবং নির্জনতা (খালওয়াত) পরিহার করে কথা বলতে হবে। ইদ্দতের মধ্যে স্বামী চাইলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে (رجوع) বলেই এই সময়ে যোগাযোগ বৈধ ও উৎসাহিত।
ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তালাক বায়েন (অপূর্ণ) হয়ে যায়। তখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহবন্ধন সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয় এবং তারা পরস্পর অমাহরাম (গায়রে মাহরাম) হয়ে যায়। এই অবস্থায় সরাসরি কথা বলা বা দেখা করা জায়েয নয়, তবে প্রয়োজনবশত (যেমন: সন্তানের বিষয়, আর্থিক অধিকার বা পরিবারের অন্য কোনো জরুরি তথ্য) তাদের মধ্যে কথা বলতে পারবে, তবে পূর্ণ পর্দা (হিজাব) ও শালীনতা বজায় রেখে এবং নিরর্থক আলাপ-আলোচনা না করে।
‘কথা না বলে খোঁজ-খবর নেওয়া’ অর্থাৎ তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে তার অবস্থা জানার অনুমতি নিয়ে প্রশ্নটি করা হয়েছে। এর উত্তর হলো:
- ইদ্দতকালে – সরাসরি কথা বলা জায়েয থাকায় তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে খোঁজ নেওয়াও জায়েয। তবে সরাসরি যোগাযোগ এড়িয়ে চলা উত্তম যদি না প্রয়োজন থাকে।
- ইদ্দতের পর – স্বামী অমাহরাম হওয়ায় তার সাথে সরাসরি কথা বলা নিষেধ নয়, তবে বিনা প্রয়োজনে তা মাকরূহ (অপছন্দনীয়)। কিন্তু তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে তার খোঁজ-খবর নেওয়া জায়েয আছে, যদি কোনো বৈধ প্রয়োজন হয় (যেমন: সন্তানের কল্যাণ, পারিবারিক সম্পদের সংশ্লিষ্টতা ইত্যাদি)। তবে শুধুমাত্র আগ্রহবশত বা অহেতুক জিজ্ঞাসা করা থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ এতে ফিতনার আশঙ্কা থাকে।
হানাফী ফিকহের কিতাব থেকে দলিল
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) – ইদ্দতকালে রাজ‘ঈ তালাকের স্ত্রীকে স্বামীর সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা বলার অনুমতি দেয়া হয়েছে, তবে নির্জনতা নিষিদ্ধ। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৩৫৩, কিতাবুত তালাক)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী) – রাজ‘ঈ তালাকের ইদ্দতে স্ত্রী স্বামীর থেকে পুরোপুরি পৃথক হয় না; বরং তারা একে অপরের সাথে দেখা করতে ও কথা বলতে পারে। ইদ্দত শেষে বায়েন তালাকের পর উভয়ে অমাহরাম হয়, তাই পর্দা ও সীমারেখা মেনে চলতে হবে। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৫১৬)
- বাদায়েউস সানায়ে (কাসানী) – রাজ‘ঈ তালাকের স্ত্রী ইদ্দতে স্বামীর জন্য হালাল থাকে এবং স্বামী তার সাথে মেলামেশা করতে পারে, ফলে কথা বলা ও খোঁজ নেওয়া স্বাভাবিক। (বাদায়েউস সানায়ে, ৩/২৭৪)
- ফাতাওয়া আলমগীরী (হিন্দিয়া) – ইদ্দত শেষে বায়েন স্ত্রী স্বামীর জন্য অমাহরাম। তার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা বলার ক্ষেত্রে পর্দা আবশ্যক। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৪৫৫)
সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা
| সময়কাল | স্বামীর সাথে সরাসরি কথা বলা | তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া | |--------|------------------------------|-----------------------------------| | ইদ্দতের ৩ মাস | বৈধ, তবে পর্দা ও শিষ্টাচার বজায় রেখে। | | ইদ্দতের পর যোগাযোগ বৈধ নয়,গায়রে মাহরাম হয়ে যাবে। বিশেষ প্রয়োজনে কথা বলতে হলে মাহরামের মাধ্যমে কথা বলবে। কথা বলার মতো কেউ না থাকলে সেক্ষেত্রে পূর্ণ পর্দা বজায় রেখে শরয়ী গন্ডির মধ্যে থেকে জরুরী কথা বলতে পারবে।
উত্তম পন্থা: স্বামীর খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য কোনো প্রয়োজন থাকলে (যেমন: সন্তানের বিষয় বা আর্থিক হিসাব) পরিবারের কোনো মাহরাম পুরুষ বা বিশ্বস্ত স্ত্রীলোকের মাধ্যমে তা করা উচিত। সরাসরি যোগাযোগ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উত্তম, বিশেষ করে ইদ্দতের পর।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও তাওফীক দাতা।
উত্তর প্রদানে:
(হানাফী ফিকহের আলোকে)