আল্লাহ স্বপ্নে বললেন,"দ্বীনকে আঁকড়ে ধরো তাহলে নাজাত পাবে" এর ব্যাখ্যা কি?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
এরপর আমি নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করতাম, করলে অন্তরে প্রশান্তি পেতাম, কিন্তু আস্তে আস্তে কোরআনের সাথে সময় কাটানো কমে গেলো, আমলি সূরা গুলোই শুধু পড়া হয় এখন। এই যে কোরআন আমার অন্তরের প্রশান্তি ছিল, এরপর যে আমি দূরে সরে গেলাম, এটা কেন হলো? আমি ভেবেছিলাম এই নিয়ামত হয়তো সারাজীবন থাকবে।
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার স্বপ্ন ও পরবর্তী অনুভূতি সম্পর্কে আমরা নিম্নোক্তভাবে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে এবং সালাফি/আহলে হাদীস ফিকহ অনুযায়ী উত্তর দিচ্ছি।
১. স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
স্বপ্ন তিন প্রকার: (ক) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (খ) শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি প্রদর্শন, (গ) মনের কল্পনা। (বুখারী, মুসলিম) আপনি যে স্বপ্নে অনুভব করলেন যে আল্লাহ আপনাকে সরাসরি বলছেন, এটি একটি সুসংবাদ হতে পারে যদি এটি শরীয়তের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। আপনার স্বপ্নের বাণী: "দ্বীনকে আঁকড়ে ধরো, তাহলে নাজাত পাবে" – এটি কুরআন ও সুন্নাহর সম্পূর্ণ অনুকূলে। আল্লাহ বলেন: ﴿وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا﴾ (আলে ইমরান: ১০৩) "তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু (কুরআন ও সুন্নাহ) দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।"
তবে স্বপ্নকে কখনোই দ্বীনের বিধান নির্ধারণের উৎস বানানো যাবে না। শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
"স্বপ্নের মাধ্যমে কোনো হালাল-হারাম প্রমাণিত হয় না; বরং স্বপ্ন যদি ভালো হয়, তবে তা মুমিনের জন্য সুসংবাদ।" (মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৩/৩৪৮)
আপনার স্বপ্নটি ছিল একটি সতর্কতা ও উৎসাহ। কিন্তু এর ভিত্তিতে কোনো ফরজ বা ওয়াজিব নির্ধারিত হবে না।
২. "দ্বীনকে আঁকড়ে ধরা" অর্থ কী?
আপনার স্বামী সঠিকই বলেছেন যে, দ্বীনকে আঁকড়ে ধরার অর্থ কুরআনকে আঁকড়ে ধরা – কিন্তু এটি আরও ব্যাপক। দ্বীনকে আঁকড়ে ধরার অর্থ:
- কুরআন ও সহীহ সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করা।
- সালাফে সালেহীনের পথ (বুঝ ও আমল) ধরে চলা।
- বিদ‘আত ও অপসংস্কৃতি বর্জন করা।
- ইসলামী জ্ঞানের সাথে লেগে থাকা এবং নেক আমলে অটল থাকা।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন:
"দ্বীনকে আঁকড়ে ধরা মানে এমন জিনিসকে সর্বদা সঙ্গী বানানো যা মানুষকে আল্লাহ, রাসূল ও আখিরাতের দিকে ডাকে।" (মাদারিজুস সালিকীন, ২/৪৫৭)
সুতরাং কুরআন তিলাওয়াত একটি বড় অংশ, কিন্তু এর পাশাপাশি নামাজ, জিকির, সত্যের সাক্ষ্য দেওয়া ইত্যাদিও দ্বীনকে আঁকড়ে ধরার অন্তর্ভুক্ত।
৩. কেন কুরআনের সাথে আপনার সম্পর্ক কমে গেল এবং প্রশান্তি চলে গেল?
এমনটি হওয়ার কয়েকটি কারণ হতে পারে:
ক. ইবাদতে ধারাবাহিকতা না থাকা: আল্লাহর পক্ষ থেকে যেকোনো নেয়ামতই রয়ে যায় না যদি আমরা তার শুকরিয়া না আদায় করি। কুরআন তিলাওয়াতের প্রশান্তি একটি নেয়ামত, যা ধারাবাহিক আমল ও খুশু-খুশুর উপর নির্ভর করে।
খ. গুনাহের প্রভাব: গুনাহ মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং ইবাদতের মিষ্টতা কমিয়ে দেয়। রাসূল (ﷺ) বলেছেন:
"যখন বান্দা গুনাহ করে, তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে।" (তিরমিযী, সহীহ)
গ. জ্ঞান ও চিন্তার অভাব: যদি কুরআন শুধু মুখস্থ বা তিলাওয়াতই করা হয়, কিন্তু অর্থ ও মর্ম বুঝে চিন্তা না করা, তাহলে ধীরে ধীরে আগ্রহ কমে যায়।
ঘ. শয়তানের ওয়াসওয়াসা: শয়তান সবসময় চেষ্টা করে মুমিনকে ইবাদত থেকে ফিরিয়ে রাখতে। যখন আপনি নিয়মিত তিলাওয়াত শুরু করেছিলেন, শয়তান হয়ত অলসতা ও ব্যস্ততার ছুতা দেখিয়ে ধীরে ধীরে দূর করে দিয়েছে।
এক্ষেত্রে কুরআনের বাণী মনে রাখা জরুরি: ﴿وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا﴾ (ত্বা হা: ১২৪) "যে আমার স্মরণ (কুরআন) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জীবিকা হবে সংকীর্ণ (অর্থাৎ শান্তি ও প্রশান্তি হারিয়ে ফেলে)।"
৪. সমাধান ও পরামর্শ
আপনি যেমন স্বপ্নে আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কতা পেয়েছেন, তেমনি এখন আপনার দায়িত্ব হলো সেটিকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।
ক. তাওবা ও ইস্তেগফার: পূর্বের অবহেলার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। আল্লাহ বলেছেন: ﴿إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ﴾ (বাকারাহ: ২২২) – "নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের পছন্দ করেন।"
খ. ধীরে ধীরে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন: অল্প অল্প করে হলেও প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াতের সময় নির্ধারণ করুন। শুরুতে ১০-১৫ মিনিট, ধীরে ধীরে বাড়ান। অর্থের প্রতি মনোযোগ দিন।
গ. দু‘আ করুন: নবী (ﷺ) দু‘আ শিখিয়েছেন:
"يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ" – "হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর অটল রাখুন।" (তিরমিযী, সহীহ)
ঘ. দ্বীনী পরিবেশ বজায় রাখা: স্বামীর সাথে দ্বীনী আলোচনা করুন, ইসলামী বইপত্র পড়ুন, সালেহীনের জীবনী পড়ুন।
ঙ. নিরুৎসাহ হবেন না: প্রশান্তি হারিয়ে ফেলার অর্থ এই নয় যে আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসেন না। বরং এটি একটি পরীক্ষা। শায়খ ইবনে বায (রহ.) বলেন:
"কোনো মুমিন যদি ইবাদতে শীতলতা অনুভব করে, তবে তার কর্তব্য হলো সেটাকে গুনাহ মনে করে তাওবা করা এবং আবার শুরু করা। কখনো হতাশ হওয়া জায়েজ নয়।"
সারসংক্ষেপ
- আপনার স্বপ্নটি একটি সুসংবাদ ও সতর্কতা, কিন্তু শরীয়তের বিধান স্বপ্নের ওপর নির্ভর করে না।
- "দ্বীনকে আঁকড়ে ধরা" মানে কুরআন-সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা ও সে অনুযায়ী আমল করা।
- প্রশান্তি চলে যাওয়া আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা ও শৈথিল্যের কারণে হয়েছে। এখন তাওবা করে পুনরায় কুরআনের সাথে সম্পর্ক জোরদার করুন।
- ধৈর্য ধরুন, নিয়মিত দু‘আ করুন, এবং মনে রাখবেন – আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবা কবুল করেন এবং তাকে পুনরায় তাঁর কাছে ফিরিয়ে নেন।
আল্লাহ আপনাকে দ্বীনের ওপর দৃঢ়তা দান করুন এবং কুরআনকে আপনার অন্তরের প্রশান্তি বানান। আমীন।