পুরুষ উস্তাদের কাছে পড়া শুনানো বা সবক দেওয়া কি যাবে?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2279
Questioner: Saba Islam
Question Asked: 03 Jul 2026, 06:02 PM
Reviewed & Published: 03 Jul 2026, 06:06 PM
Views: 62
Tokens: 5,231
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

অনেক প্রতিষ্ঠানেই পুরুষ উস্তাদের কাছে মেয়েরা পড়া দেয়।আবার কিছু কোর্সে মহিলারা ক্লাস করায়। পরে পড়া পুরুষ উস্তাদের কাছে দিতে হয়।
এতে কন্ঠের পর্দা নষ্ট হয় না?এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চাই? আর ইয়াযা কি শুধু পুরুষ উস্তাদই দিতে পারে। মহিলা উস্তাযা পারে না?

Answer

উত্তর: পুরুষ উস্তাদের কাছে মেয়েদের পড়া দেওয়া ও ইজাযা প্রদান

আপনার প্রশ্ন দুটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে:
১. পুরুষ উস্তাদের কাছে মেয়েদের কণ্ঠে কুরআন ও পাঠ দেওয়ার বিধান।
২. ইজাযা (কুরআন পাঠের অনুমোদন) কি শুধু পুরুষ উস্তাদই দিতে পারেন, নাকি মহিলা উস্তাযাও দিতে পারেন?

নিম্নে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।


১. পুরুষ উস্তাদের কাছে মেয়েদের পড়া দেওয়া: কণ্ঠের পর্দা ও বিধান

হানাফি মতে নারীর কণ্ঠ কি পর্দা?
হানাফি ফিকহে নারীর কণ্ঠকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘আওরাত’ (গোপনীয় অঙ্গ) গণ্য করা হয় না। তবে তা যদি ফিতনার কারণ হয় বা উত্তেজনা সৃষ্টি করে, তাহলে তা হারাম। কুরআন ও হাদিসে নারীদের কণ্ঠের ব্যাপারে সতর্কতা এসেছে:

  • সূরা আহযাব (৩৩:৩২): “হে নবী-পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মতো নও; যদি তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হও, তবে কোমল স্বরে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে রোগ আছে সে প্রলুব্ধ হয়।”
    এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, নারীর কণ্ঠ সাধারণভাবে নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু যদি তা ফিতনার কারণ হয় তবে তা নিষিদ্ধ।

  • ইমাম ইবনু আবেদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ বলেন:
    “মহিলার কণ্ঠ ‘আওরাত’ নয়, তবে তা শ্রবণ করা ফিতনার আশঙ্কায় হারাম।” (রাদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)

  • মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ‘মা’আরিফুল কুরআন’-এ বলেন:
    “নারীর কণ্ঠ বাহ্যিক পর্দার অন্তর্ভুক্ত নয়, কিন্তু ফিতনার ভয় থাকলে পুরুষের জন্য তা শোনা জায়েজ নেই।”

পুরুষ উস্তাদের কাছে মেয়েদের পড়া দেওয়ার হুকুম:
যদি কোনো মহিলা অমাহরম পুরুষ উস্তাদের কাছে কুরআন পড়ে (শুনায়), তাহলে নিম্নলিখিত শর্তগুলো অপরিহার্য:

  1. পর্দার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা: উস্তাদ-শিক্ষার্থীর মধ্যে পর্দা থাকতে হবে (যেমন পর্দার আড়ালে বা শুধু অডিও কলের মাধ্যমে)।
  2. কণ্ঠে কোনো কোমলতা বা আকর্ষণীয়তা না থাকা: পড়া হতে হবে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, স্বাভাবিকের চেয়ে নিচু স্বরে।
  3. প্রয়োজনীয়তা ও সীমাবদ্ধতা: যদি কোনো প্রয়োজন ছাড়া এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তবে তা মাকরূহ বা নিষিদ্ধ। বিশেষ করে ক্লাসরুমে সরাসরি দৃষ্টির সম্মুখে পড়া নিষিদ্ধ, কারণ এতে ফিতনার আশঙ্কা প্রবল।

বিস্তারিত আলোচনা:

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তার অনুসারীদের মতে, নারীকে কুরআন তিলাওয়াতের সময় পুরুষের সামনে আওয়াজ উঁচু করা নিষেধ (বিস্তারিত: ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৮)।
  • মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) – “নারীদের জন্য অমাহরম পুরুষের সামনে কুরআন তিলাওয়াত করা নাজায়েজ, যদি না কোনো জরুরি অবস্থা হয় এবং পর্দার আড়ালে অথবা অডিওর মাধ্যমে শোনানো হয়।” (ফাতাওয়া উসমানি, ২/২৫১)

সুতরাং: প্রতিষ্ঠানে পুরুষ উস্তাদের কাছে মেয়েরা সরাসরি (দেখা-দেখি করে) পড়া দিলে কণ্ঠের পর্দা নষ্ট হওয়া ছাড়াও গুনাহ হতে পারে। কণ্ঠের পর্দা বলতে আমরা বুঝি – অমাহরম পুরুষের সামনে কণ্ঠকে ফিতনার বস্তুতে পরিণত করা। তাই এ ধরনের ব্যবস্থা পরিহার করা উচিত। মহিলাদের জন্য মহিলা শিক্ষক নিয়োগ করাই উত্তম ও নিরাপদ।


২. ইজাযা প্রদান: পুরুষ উস্তাদই কি শুধু দিতে পারে, নাকি মহিলা উস্তাযাও পারে?

ইজাযা হলো কুরআন বা হাদিস ইত্যাদি শিক্ষার অনুমতি বা সনদ। এটি একজন শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয়, যাতে সে নিজে বর্ণনা ও শিক্ষা দিতে পারে।

মহিলা উস্তাযা কি ইজাযা দিতে পারেন?
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই পারেন। হাদিস ও ফিকহের ইতিহাসে বহু মহিলা মুহাদ্দিসা ও কারিয়া ছিলেন, যারা ইজাযা প্রদান করেছেন। যেমন:

  • উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) তাবেয়ীদের হাদিসের ইজাযা দিয়েছেন।
  • সৈয়দা নাফিসা (রহ.) ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-কে ইজাযা দিয়েছেন বলে জানা যায়।

হানাফি ফিকহেও মহিলাদের জন্য ইলম শিক্ষা ও শিক্ষাদান বৈধ, তবে অমাহরম পুরুষকে শিক্ষাদানে পর্দার শর্ত আরোপিত। ইজাযা প্রদান একটি সনদ বা অনুমতি মাত্র – সুতরাং এটি মহিলা উস্তাযাও দিতে পারেন, বিশেষ করে মহিলা শিক্ষার্থীদের জন্য। পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য মহিলা উস্তাযা থেকে ইজাযা গ্রহণ করা জায়েজ, তবে তা সরাসরি (দেখা-দেখি বা কণ্ঠ শোনার) মাধ্যমে নয় বরং পর্দার আড়ালে বা লিখিতভাবে হতে পারে। তবে উত্তম হলো পুরুষ শিক্ষার্থী পুরুষ উস্তাদ থেকে ইজাযা গ্রহণ করা।

ইজাযা কেবল পুরুষ উস্তাদই দিবেন – এ ধারণা ভুল।
মহিলা উস্তাযাও ইজাযা দিতে পারেন, বিশেষত পর্দা ও শিষ্টাচার বজায় রাখলে। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন স্বীকৃত কিরআত প্রতিষ্ঠানে মহিলা শিক্ষিকাগণও ইজাযা প্রদান করেন।


সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ:

  • পুরুষ উস্তাদের কাছে মেয়েদের পড়া দেওয়া: গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে সরাসরি কণ্ঠ উঁচু করে কুরআন পড়া বা পড়ানো ফিতনার আশঙ্কায় জায়েজ নয়। জরুরি প্রয়োজনে পর্দার ব্যবস্থা করে অডিও বা পর্দার আড়ালে পড়া যেতে পারে, কিন্তু সাধারণ প্রতিষ্ঠানে এ পদ্ধতি গ্রহণ করা উচিত নয়। বরং মেয়েদের জন্য মহিলা শিক্ষিকার ব্যবস্থা করাই ইসলামের দৃষ্টিতে নিরাপদ।
  • ইজাযা প্রদানে পুরুষ-নারী নির্বিশেষে যোগ্যতা: একজন যোগ্য মহিলা কারিয়া বা আলেমাও ইজাযা দিতে পারেন, বিশেষত মহিলা শিক্ষার্থীদের জন্য। পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্যও তিনি ইজাযা দিতে পারেন, তবে তার ক্ষেত্রে পর্দা ও লিখিত মাধ্যম গ্রহণীয়।

প্রাসঙ্গিক গ্রন্থ:

  • রাদ্দুল মুহতার (১/৪০৬) – কণ্ঠের বিধান
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩২৮) – নারীর কণ্ঠ ও পর্দা
  • ফাতাওয়া উসমানি (২/২৫১) – মুফতি তাকি উসমানির ফতোয়া
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩৩৫) – মাওলানা আশরাফ আলী থানভির মত
  • বেহেশতি জেওর (দশম অধ্যায়) – নারী ও ইলম শিক্ষা

উত্তম পন্থা: প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেয়েদের শিক্ষার জন্য নারী শিক্ষিকা নিয়োগ করা এবং কোর্স শেষে ইজাযাও তাদের থেকে গ্রহণ করা। এতে শরয়ি বিধান লঙ্ঘিত হবে না। আল্লাহ তাআলা তাওফিক দিন।

আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.