কখন হাদিস আমল করা সুন্নাহ বা মুস্তাহাব হবে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২. যখন কোন আমল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুয়ালাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্পর্কে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়নি তবে সাহাবী বা সালাফের আমলে সহিহ সনদ পাওয়া যায় তাহলে এর হুকুম কি সুন্নাহ, মুস্থাহাব, জায়েজ?
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
১. শুক্রবারে নখ ও গোঁফ কাটার বিধান
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে শুক্রবারে নখ ও গোঁফ কাটার আমল সহীহ সনদে প্রমাণিত। তবে এ দিনে কাটার বিশেষ ফজীলত সম্পর্কে সরাসরি কোনো মারফু‘ হাদীস (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত) সহীহ সনদে পাওয়া না গেলেও, সাহাবীর এই আমল নিজেই একটি দলীল। হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, সাহাবীর আমল যদি কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীত না হয় এবং ক্বিয়াসের (যুক্তির) বিরোধী না হয়, তবে তা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) হিসেবে গ্রহণযোগ্য। ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) ও তার শিষ্যদের মতে, সাহাবীর কথা ও কাজ অপ্রমাণিত না হলে তা হুজ্জাত (প্রমাণ) হিসেবে গণ্য হয়।
শুক্রবারের ফজীলত সম্পর্কে বর্ণিত কিছু হাদীস (যেমন: "যে ব্যক্তি শুক্রবারে নখ কাটে, আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করেন") দুর্বল হলেও, হানাফী ফুকাহায়ে কিরাম শুক্রবারে নখ-গোঁফ কাটাকে মুস্তাহাব বলেছেন। কারণ এটি জুমু‘আর দিনের পরিচ্ছন্নতা ও সাজসজ্জার অন্তর্ভুক্ত। ইবনে আবেদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’-এ উল্লেখ করেছেন, জুমু‘আর দিন নখ কাটা, গোঁফ ছাটা ও মিসওয়াক করা মুস্তাহাব। (রদ্দুল মুহতার, ২/১৫৮)
সুতরাং, এই আমল ‘সুন্নাহ’ (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি সম্পৃক্ত সুন্নাত) নয় বরং ‘মুস্তাহাব’ (সাহাবীর আমলের ভিত্তিতে পছন্দনীয়) হিসেবে গণ্য হবে। তবে কেউ যদি একে ‘সুন্নাহ’ বলে অভ্যস্ত হন, তাহলে সেটি ‘সুন্নাতে সাহাবী’ বা ‘সুন্নাতে যায়েদা’-র অর্থে হতে পারে, যা তাকওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশংসনীয়।
২. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর থেকে প্রমাণিত না হলেও সাহাবী বা সালাফের আমল সহীহ সনদে থাকলে তার হুকুম
হানাফী মাযহাবে যদি কোনো আমল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ সনদে প্রমাণিত না হয়, কিন্তু কোনো সাহাবী বা বড় তাবিয়ী (সালাফ) থেকে সহীহ সনদে তা বর্ণিত হয়, তাহলে সেই আমলের বিধান নিম্নরূপ:
- সুন্নাহ নয়: এটি নবী (সা.)-এর সুন্নাত হিসেবে গণ্য হবে না, কারণ সুন্নাহ বলতে শরী‘আতে মূলত নবী (সা.)-এর কথা, কাজ ও অনুমোদনকে বোঝায়।
- মুস্তাহাব: যদি আমলটি ইসলামের সাধারণ শিক্ষা ও নৈতিকতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় (যেমন: সৌন্দর্য, পবিত্রতা, ইবাদতের প্রস্তুতি), তাহলে তা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ সাহাবী ও সালাফের আমল দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য, কিন্তু তা নবী (সা.)-এর সুন্নাতের সমান মর্যাদার নয়। ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর মতে, সাহাবীর কথা ও কাজ যদি কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীত না হয়, তবে তা অনুসরণ করা উচিত। (উসুলুশ শাশী, ১/৩৪৮; ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/১৭)
- জায়েয (অনুমোদিত): অন্তত এটি জায়েয, অর্থাৎ করলে কোনো গুনাহ নেই, বরং সওয়াবের আশা করা যায়। তবে যদি আমলটি বিদ‘আত না হয় এবং শারঈ কোনো নিষেধ না থাকে, তাহলে তা জায়েয ও উত্তম।
নির্দিষ্ট উদাহরণ: শুক্রবারে নখ-গোঁফ কাটার ক্ষেত্রে আমরা উপরে বলেছি, এটি মুস্তাহাব। কারণ সাহাবীর আমলটি সহীহ, এবং জুমু‘আর দিন পরিচ্ছন্নতা ইসলামে প্রশংসিত।
সারকথা
১. শুক্রবারে নখ ও গোঁফ কাটা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়), সুন্নাতে মুআক্কাদা বা ওয়াজিব নয়। ২. সাহাবী বা সালাফ থেকে সহীহ সনদে প্রমাণিত আমল সাধারণত মুস্তাহাব বা জায়েয হয়; তা সুন্নাহ (নবীগত) হিসেবে গণ্য হবে না, তবে অনুসরণযোগ্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদের আমলকে কবুল করুন এবং সঠিক পথে চলার তাওফীক দিন।
রেফারেন্স:
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), ২/৩৯
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন), ২/১৫৮ (কিতাবুস সালাহ, বাবুল জুমু‘আ)
- ফাতাওয়া আলমগীরী (আল-ফাতাওয়া আল-হিনদিয়্যাহ), ৫/৩৫৮
- উসুলুশ শাশী, ১/৩৪৮ (মাসআলাতু ক্বাওলিস সাহাবী)