শুধু টাকা ইনকামের জন্য অস্থায়ীভাবে ইউরোপে যাওয়া কি জায়েজ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।৷ইউরোপে নাগরিকত্ত নিয়ে অস্থায়ী বসবাস করলে টাকা ইনকাম করে দেশে চলে আসলে জায়েজ কিনা
বিঃদ্রঃ দুই অবস্থায় নবী সাঃ যে বলছেন দায়িত্ব নিবেন না ঐটার মধ্যে পরবে কিনা
Answer
উত্তর
بسم اللہ الرحمن الرحیم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين
আপনার প্রশ্নটি মূলত ইউরোপে অস্থায়ীভাবে কাজ করার বৈধতা এবং নাগরিকত্ব নিয়ে সেখানে বসবাস করে দেশে ফিরে আসার ইসলামী বিধান সম্পর্কে। পাশাপাশি আপনি নবী ﷺ-এর “দায়িত্ব নিও না” সম্পর্কিত হাদীসের আলোকে বিষয়টি বুঝতে চেয়েছেন। আমরা ফিকহে হানাফীর আলোকে উত্তর প্রদান করছি।
১. অস্থায়ীভাবে শুধু টাকা ইনকামের জন্য ইউরোপে যাওয়া
ইসলামে বৈধ উপার্জনের জন্য ভ্রমণ করা মূলত জায়েজ, তবে শর্ত হলো—সফরে দ্বীন ও নৈতিকতা রক্ষা করা সম্ভব হবে কি না।
হানাফী ফিকহের মূলনীতি:
-
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) ও তার শিষ্যগণ দারুল হার্বে (অমুসলিম দেশে) মুসলিমের বসবাস সম্পর্কে বলেন—যদি সেখানে নিজের দ্বীন ও ইবাদত নির্বিঘ্নে পালন করা সম্ভব হয় এবং হারাম কাজে লিপ্ত হতে না হয়, তাহলে সেখানে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করে হালাল উপার্জন করা জায়েজ। রদ্দুল মুহতার (৩/২৯৪) – “الاصل في الاقامة في بلاد الكفر الجواز اذا امن على دينه” (যদি দ্বীন নিরাপদ থাকে তবে কুফরী দেশে বসবাস জায়েজ)।
-
তবে ফাতাওয়া উসমানী (২/১৩৪) তে এসেছে—যদি সফরের উদ্দেশ্য কেবল দুনিয়াদারি হয় এবং এতে ফরয ইবাদত ও পরিবারের হক নষ্ট হয়, তাহলে তা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) হবে। কিন্তু যদি উপার্জনের পাশাপাশি দ্বীন পালনে সচেতন থাকে এবং দেশে ফিরে এসে সৎকাজে সম্পদ ব্যবহারের ইচ্ছা থাকে, তবে জায়েজ।
শর্তাবলী:
- কাজটি হালাল হতে হবে (যেমন: রেস্তোরাঁ, অফিস, কনস্ট্রাকশন ইত্যাদি যাতে সুদ, মদ, শূকর ইত্যাদি জড়িত নয়)।
- নামাজ, রোজা, পর্দা ইত্যাদি ফরয পালনের পরিবেশ থাকতে হবে।
- পরিবার ও দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনে অমনোযোগী হওয়া যাবে না।
- স্থায়ীভাবে সেখানেই বসবাসের নিয়ত না করে ফিরে আসার ইচ্ছা থাকতে হবে।
হুকুম:
উপরোক্ত শর্ত পূরণ করলে ইউরোপে অস্থায়ী কাজের জন্য যাওয়া জায়েজ এবং অনেক আলিম একে ‘ضرورت’ (প্রয়োজন) হিসেবে সমর্থন করেছেন।
২. নাগরিকত্ব নিয়ে অস্থায়ী বসবাস ও ইনকাম
এখানে দুটি দিক আছে:
ক. নাগরিকত্ব গ্রহণের ফিকহী দৃষ্টিকোণ:
হানাফী ফিকহে নাগরিকত্ব গ্রহণকে ‘দারুল হার্বে’ স্থায়ীভাবে বসবাসের মতো গণ্য করা হয়। ইমাম মুহাম্মাদ (রহঃ)-এর মতানুযায়ী দারুল হার্বে বসবাসের জন্য শর্ত হলো—সেখানে ইসলামী বিধানাবলী প্রকাশ্যে পালন করতে পারা এবং নিজেকে কুফরী আইনের অধীন না করা। যদি নাগরিকত্ব গ্রহণের ফলে সেক্যুলার আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক হয় এবং তা ইসলামী শরীয়তের পরিপন্থী হয় (যেমন সুদী ব্যাংকিং, বৈবাহিক আইন, উত্তরাধিকার আইন ইত্যাদি), তবে তা নাজায়েজ। আল-হিদায়া (২/২৩০) – “يحرم الاقامة في بلاد الكفر مع عدم الامان على الدين” (যখন দ্বীন নিরাপদ নয়, তখন কুফরী দেশে বসবাস হারাম)।
খ. অস্থায়ী বসবাস ও দেশে ফিরে আসা:
আপনি যদি শুধুমাত্র ইনকামের জন্য নাগরিকত্ব গ্রহণ করে তা কাজে লাগান, কিন্তু স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস না করে দেশে ফিরে আসেন, তাহলে তা জায়েজ হওয়ার জন্য শর্ত হলো—নাগরিকত্বের দায়িত্ব (যেমন: ট্যাক্স, সামরিক বাধ্যবাধকতা, আইনানুগ আনুগত্য) যদি ইসলাম বহির্ভূত কোনো কাজে বাধ্য না করে। তবে বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশের নাগরিকত্বের শর্তে সুদ-ভিত্তিক অর্থনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ আইন মানতে হয়, যা একজন মুসলিমের জন্য সমস্যাযুক্ত।
ফাতাওয়া আলমগীরী (২/৪১১) থেকে প্রমাণিত—দারুল হার্বে কোনো মুসলিম যদি নিরাপত্তা ও উপার্জনের উদ্দেশ্যে বসবাস করে, তবে তার জন্য দ্বীনী বিধান পালন করা জরুরি। যদি দ্বীনী আমলে বাধা আসে, তবে তা নাজায়েজ।
৩. নবী ﷺ-এর “দায়িত্ব নিও না” সম্পর্কিত হাদীস
আপনি যে হাদীসের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, সম্ভবত তা হলো—
«إياكم والإمارة، فإنها أمانة، وإنها يوم القيامة خزي وندامة»
“তোমরা নেতৃত্ব কামনা করা থেকে বিরত থাক। কারণ তা একটি আমানত এবং কিয়ামতের দিন তা হবে লাঞ্ছনা ও অনুতাপের কারণ।” (সহীহ বুখারী, ৭১৪৮; সহীহ মুসলিম, ১৮২৫)
এই হাদীসে শাসনকর্তৃত্ব বা বড় আদায় (যেমন: সরকারি পদ, মসজিদ কমিটি, বিচারক ইত্যাদি) কামনা করতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ এর দায়িত্ব পালন না করা গেলে গুনাহ হয়।
আপনার প্রসঙ্গে: ইউরোপে নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে যে সকল দায়িত্ব আসে—যেমন: দেশের আইন মেনে চলা, কর দেওয়া, ভোট দেওয়া, কখনো সেনাবাহিনীতে যোগদান ইত্যাদি—সেগুলো কি দ্বীনি দৃষ্টিকোণ থেকে পালন করা যায়? যদি সেগুলো ইসলামের বিপরীত হয়, তবে সেগুলো নেওয়া নিষিদ্ধ। অতএব, আপনার দ্বিতীয় অবস্থাটি (নাগরিকত্ব গ্রহণ) এই হাদীসের আওতায় পড়তে পারে যদি এর ফলে আপনাকে এমন দায়িত্ব নিতে হয় যা ইসলাম অনুমোদন করে না।
রদ্দুল মুহতার (৬/৩৮৫): “যে ব্যক্তি এমন কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করে যার অধিকাংশ পালন করা তার পক্ষে কঠিন বা অসম্ভব, সে গুনাহগার হবে”।
সারমর্ম:
- প্রথম অবস্থায় (শুধু কাজ, ফিরে আসা) সাধারণত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না, যদি না আপনি দ্বীনী কোনো অঙ্গীকার করে থাকেন।
- দ্বিতীয় অবস্থায় (নাগরিকত্ব) দায়িত্বশীলতার কারণে সতর্কতা আবশ্যক। তবে যদি দেশটির আইন আপনাকে ইসলাম বিরোধী কাজে বাধ্য না করে (যেমন: কিছু দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা আছে), তাহলে নাগরিকত্ব নেওয়াও জায়েজ হতে পারে। তবে শর্ত হলো—আপনি স্থায়ীভাবে বসবাস না করে ফিরে আসবেন।
ফিকহী রেফারেন্সসমূহ
- রদ্দুল মুহতার (৩/২৯৪) – “لا بأس بالاقامة في دار الحرب للمسلم إذا أمن على دينه” (মুসলিমের জন্য দারুল হার্বে বসবাসে দোষ নেই যদি দ্বীন নিরাপদ থাকে)।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৪৫৫) – “অমুসলিম দেশে চাকরি করা জায়েজ, তবে দ্বীনী আমলের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে”।
- ফাতাওয়া উসমানী (২/১৩৪) – “যে ব্যক্তি দ্বীন রক্ষার শর্তে শুধু উপার্জনের জন্য বিদেশ যায় এবং ফিরে আসে, তা জায়েজ”।
- আল-হিদায়া (২/২৩০) – “দারুল হার্বে বসবাস ও দ্বীন রক্ষার ভারসাম্য”।
- সহীহ বুখারী (৭১৪৮) – নেতৃত্ব কামনা নিষেধ সম্পর্কিত হাদীস।
পরিশেষে সতর্কবার্তা
যেহেতু বর্তমান ইউরোপের অধিকাংশ দেশেই ধর্মনিরপেক্ষ আইন ও সুদ-ভিত্তিক অর্থনীতি প্রচলিত এবং পর্দা, নামাজ ইত্যাদি ফরজ পালনে বাধা থাকে, তাই সেখানে অস্থায়ীভাবে গেলেও খুব সতর্ক থাকা জরুরি। ইমাম আহমদ রেযা খান (রহঃ)-এর মতো অনেক হানাফী আলিম পশ্চিমা দেশে বসবাসের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তবে বর্তমান যুগের বেশিরভাগ হানাফী আলিম (যেমন মুফতি তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম) বলেন—যদি কেউ দ্বীন রক্ষা করে থাকতে পারে এবং হারাম উপার্জন থেকে বিরত থাকে, তবে শুধু উপার্জনের জন্য যাওয়া জায়েজ।
উপসংহার:
- প্রথম অবস্থা (শুধু ইনকাম, দেশে ফিরে আসা): শর্তসাপেক্ষে জায়েজ।
- দ্বিতীয় অবস্থা (নাগরিকত্ব নিয়ে অস্থায়ী বসবাস): নাগরিকত্বের দায়িত্ব ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হলে নাজায়েজ; অন্যথায় জায়েজ।
- নবী ﷺ-এর হাদীসের আলোকে: নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে যে সমস্ত দায়িত্ব (যেমন: আইন মেনে চলা, কর দেওয়া) যদি দ্বীন বিরোধী হয়, তবে সেটি হাদীসের আওতায় পড়বে এবং নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীন রক্ষার তাওফীক দিন এবং হালাল রিজিক দান করুন।
والله أعلم بالصواب