সুদী লেনদেনে শুধু আসল টাকা পরিশোধে সাহায্য করা জায়েজ কি?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 2219
Questioner: Sonali Islam 0084
Question Asked: 02 Jul 2026, 02:09 PM
Reviewed & Published: 02 Jul 2026, 02:14 PM
Views: 52
Tokens: 4,541
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,
কিস্তি মানে (সুদ) এর যে অংশ টা আসল থাকে ওই টা শোধ করতে সাহায্য করতে তো কোনো সমস্যা নাই?
৪০০০ টাকা নিছে সুদ সহ ৪০০০+ টাকা দিতে হবে।
আমি যদি ৪০০০ পর্যন্ত টাকা দিতে সাহায্য করি। মানে ১ম দিক এ টাকা গুলো দেই যখন আসল শেষ তখন আর ইনভলভ হবো না?
এইটা কী করা যাবে?
যদিও ১ম দিনে সুদ আসল টাকার সাথে যোগ করা থাকে?

Answer

উত্তর

وعلیکم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো: কেউ যদি ৪০০০ টাকা সুদের ভিত্তিতে ধার নেয় এবং সুদসহ মোট ৪০০০+ টাকা ফেরত দিতে বাধ্য থাকে, তাহলে আপনি যদি শুধু আসল ৪০০০ টাকা পরিশোধে সাহায্য করেন (অর্থাৎ প্রথমে আসল টাকা পরিশোধ করে দেন) এবং সুদের অংশে জড়িত না হন, তাহলে এটা কি জায়েজ হবে? বিশেষ করে যখন প্রথম দিনেই সুদ আসলের সাথে যোগ করা থাকে।

এই প্রসঙ্গে ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত স্পষ্ট। সুদ (রিবা) হারাম এবং এর সাথে যেকোনো প্রকার লেনদেন, সাহায্য বা অংশগ্রহণও হারাম। নিম্নে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের কিতাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।

১. সুদের সাথে সম্পর্কিত সকল কাজই হারাম

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

"তোমরা সুদ খেয়ো না, যা বহুগুণে বর্ধিত করা হয়।" (সূরা আলে ইমরান: ১৩০)

হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"সুদখোর, সুদদাতা, এর লেখক ও এর সাক্ষী—এদের সকলকেই আল্লাহ তা'আলা অভিশাপ দিয়েছেন।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৫৯৮)

এই হাদীস থেকে স্পষ্ট যে, সুদের লেনদেনে শুধু খোদ সুদখোর ও সুদদাতাই গুনাহগার নয়, বরং যারা এতে কোনো প্রকার সাহায্য করে, যেমন লেখক, সাক্ষী বা টাকা আদায়ে সহায়তাকারী—তারাও একই গুনাহের অংশীদার।

২. আসল টাকা পরিশোধে সাহায্য করলেও সমস্যা

আপনি যদি শুধু আসল ৪০০০ টাকা পরিশোধে সাহায্য করতে চান, কিন্তু পুরো লেনদেনটি একটি সুদী চুক্তির ভিত্তিতে হচ্ছে, তাহলে আপনার সাহায্য ওই সুদী চুক্তি সম্পন্ন করতে সহায়তা করছে। কারণ, ওই ঋণগ্রহীতা সুদের বোঝা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না, বরং আপনার দেওয়া টাকার মাধ্যমে সে সুদসহ পুরো টাকা পরিশোধের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করছে। ফলে আপনিও সুদী লেনদেনের সহায়ক হিসেবে গণ্য হবেন।

হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব রদ্দুল মুহতার (কিতাবুল বুয়ু') -এ বলা হয়েছে:

"সুদী লেনদেনে কোনো প্রকার সাহায্য করা, যেমন টাকা পৌঁছে দেওয়া বা আদায় করা—সবই হারাম। কারণ, এটি গুনাহের কাজে সহযোগিতা করার শামিল।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/১৮৭)

একইভাবে, ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৩/২১৪)-তেও উল্লেখ আছে যে, সুদের অর্থ আদায়ে সাহায্য করা জায়েজ নয়।

৩. "আসল শেষ হলে আর ইনভলভ হবো না" – এই ধারণাটি ভুল

আপনি বলেছেন: "আমি যদি ৪০০০ পর্যন্ত টাকা দিতে সাহায্য করি, মানে ১ম দিকে টাকাগুলো দেই, যখন আসল শেষ তখন আর ইনভলভ হবো না।" কিন্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে, আপনি যখনই প্রথম কিস্তিতে টাকা দিচ্ছেন, আপনি ওই সুদী লেনদেনের একটি অংশ হয়ে যাচ্ছেন। আপনার দেওয়া টাকা ঋণগ্রহীতা সুদসহ পুরো টাকা পরিশোধে ব্যবহার করছে।

মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) তাঁর তাফসীর মা'আরিফুল কুরআন-এ (সূরা বাকারার ২৭৫-২৭৯ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়) বলেন:

"সুদের লেনদেনে যেকোনো প্রকার অংশগ্রহণ, এমনকি যদি কেউ শুধু সুদী চুক্তি সম্পাদনে কলম ধরে, তাও হারাম। কারণ, এটি গুনাহের কাজে সহযোগিতা।"

৪. প্রথম দিনে সুদ আসলের সাথে যোগ করা থাকলে করণীয়

আপনি লিখেছেন: "যদিও ১ম দিনে সুদ আসল টাকার সাথে যোগ করা থাকে?" — এটিই মূল সমস্যা। যখন সুদ আসলের সাথে মিশে যায়, তখন পুরো টাকাই সুদী লেনদেনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। তাই শুধু আসল টাকা আলাদা করে পরিশোধের কোনো সুযোগ নেই। শরীয়তের দৃষ্টিতে, এই ধরনের লেনদেন থেকে সম্পূর্ণভাবে দূরে থাকতে হবে।

উত্তর: আপনার কী করা উচিত?

আপনার জন্য এই লেনদেনে কোনো প্রকার সাহায্য করা জায়েজ হবে না। আপনার কর্তব্য হলো:

  1. ঋণগ্রহীতাকে উপদেশ দেওয়া: তাকে বুঝিয়ে বলুন যে, সুদী লেনদেন হারাম এবং তিনি যেন আল্লাহর কাছে তাওবা করেন।
  2. সুদী চুক্তি বাতিল করার প্রচেষ্টা: তাকে পরামর্শ দিন যে, তিনি ঋণদাতার সাথে শুধু আসল টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করুন এবং সুদের অংশ মাফ করিয়ে নিন।
  3. নিজে সাহায্য না করা: আপনি যদি তাকে সরাসরি টাকা দেন, তবে সেটি সুদী লেনদেন সম্পন্ন করতে সহায়তা করার নামান্তর হবে। তাই আপনি টাকা দিয়ে সাহায্য করতে পারবেন না। বরং আপনি তাকে অন্য কোনো বৈধ উপায়ে সাহায্য করতে পারেন, যেমন তাকে হালাল রিজিকের পথ দেখানো বা দোয়া করা।

হযরত মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহ) তাঁর ফাতাওয়া উসমানী (২/৪২৭)-এ বলেন:

"সুদী লেনদেনে কোনো প্রকার সাহায্য করা, যেমন টাকা আদায়ে সহায়তা করা, সম্পূর্ণরূপে হারাম। বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়-স্বজন হলেও এই ধরনের লেনদেনে অংশ নেওয়া জায়েজ নয়।"

উপসংহার

  • আপনার প্রস্তাবিত পদ্ধতি (শুধু আসল টাকা পরিশোধে সাহায্য করা) জায়েজ হবে না। কারণ, এটি একটি সুদী চুক্তি সম্পন্ন করতে সহায়তা করার শামিল।
  • সুদী লেনদেন থেকে পুরোপুরি দূরে থাকুন এবং ঋণগ্রহীতাকে সুদ থেকে তাওবা করার ও হালাল উপায়ে ঋণ পরিশোধের উপদেশ দিন।
  • হালাল উপায়ে সাহায্য করুন: তাকে উপদেশ, দোয়া বা অন্য কোনো বৈধ পন্থায় সহায়তা করুন, তবে সরাসরি অর্থ দিয়ে সুদী লেনদেন সম্পন্ন করতে সাহায্য করবেন না।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সুদ ও অন্যায় লেনদেন থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.