সূরা কাফিরুন ও ইখলাসের ফজিলত, বিদেশে যাওয়ার জন্য মিথ্যা কথা বলা

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2198
Questioner: Sajeda Akhtar
Question Asked: 01 Jul 2026, 11:44 PM
Reviewed & Published: 01 Jul 2026, 11:50 PM
Views: 77
Tokens: 8,011
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
১. মাগরিবের২ রাকাত নামাজে সূরা কাফিরুন ও ইখলাস পড়া সম্পক্ক্রিত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত? উক্ত হাদিসের মান কি?

২. আমার বিদেশে যাওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই কারণ দেশে কিছু করতে চাইলে ফ্যামিলি থেকে টাকাও দেবে না, আর ইনকাম না করলে ভবিষ্যতে বিয়ে, ক্যারিয়ার কিচ্ছুই হবে না। দেশে ব্যবস্যা করেছিলাস লসও হইছে আর এখন কিছু করার উপায়ও নেই.. এমতাবস্থায় এম্বাসিতে কিছু মিথ্যা ডকুমেন্টস দেয়া লাগে।। এখন যদি যদি মিথ্যা ডকুমেন্টস না দেখাই ভিসা হবে না! আবার দেশে থাকলে আয় রোজগারের সুযোগ নেই। এখন কি মিথ্যা বলা আমার জন্য রুখসত আছে?

৩. কুরআন খতমের সুন্নাহ গুলা কি কি?

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم
উত্তর প্রদানে আমি হানাফি মাযহাবের কিতাব ও নির্ভরযোগ্য ফতোয়ার আলোকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।


১. মাগরিবের সুন্নাতের (২ রাকাত) নামাযে সূরা কাফিরুন ও ইখলাস পড়া কি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত? তার মান কী?

উত্তর:
হ্যাঁ, মাগরিবের ফরজের পরের ২ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা নামাযে সূরা কাফিরুন ও সূরা ইখলাস পড়া হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।

হাদিসটি:
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত,

"كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَقْرَأُ فِي الرَّكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْمَغْرِبِ: {قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ} وَ {قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ}" অর্থাৎ, "রাসূলুল্লাহ ﷺ মাগরিবের পরের দুই রাকাতে (সুন্নাতে) سورَةُ الْكَافِرُونَ এবং سورَةُ الْإِخْلَاصِ পড়তেন।"
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১১৬৬; সুনানে তিরমিযী, হাদিস: ৪৩১)

হাদিসটির মান:
ইমাম তিরমিযী এই হাদিসকে হাসান বলেছেন। ইমাম হাকিম (রহ.) একে সহীহ বলেছেন। অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে এটি হাসান লিগাইরিহী পর্যায়ের, যা আমলযোগ্য।

হানাফি কিতাবের বক্তব্য:

  • রদ্দুল মুহতার (১/৪৬৭) এবং ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/১১৭) তে মাগরিবের সুন্নাতে এই দুই সূরা পড়া মুস্তাহাব বলা হয়েছে।
  • বাহিশ্তি জেওর (১ম খণ্ড, নামাযের মাসায়েল)-এ মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) লেখেন:

    "মাগরিবের সুন্নতে প্রথম রাকাতে سُورَةُ الْكَافِرُونَ এবং দ্বিতীয় রাকাতে سُورَةُ الْإِخْلاَصِ পড়া সুন্নত।"

সারসংক্ষেপ:
এটি সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, আমলযোগ্য এবং ফযিলতপূর্ণ। নিয়মিত পড়লে অনেক সওয়াব রয়েছে।


২. বিদেশে যাওয়ার জন্য মিথ্যা দলিল (ডকুমেন্ট) দেওয়া কি জায়েজ?

উত্তর:
স্পষ্টভাষায় বলছি: মিথ্যা বলা ও জাল দলিল তৈরি করা ইসলামে হারাম এবং কবিরা গুনাহ।
তবে আপনার অবস্থা অত্যন্ত সংকটপূর্ণ – দেশে আয়ের কোনো উপায় নেই, পরিবার সহায়তা করবে না, ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এক্ষেত্রে ফিকহের ‘দারুরাহ’ (چا ضرورة) তথা চরম প্রয়োজনীয়তার নীতি বিবেচনা করা যেতে পারে, কিন্তু তা অত্যন্ত সীমিত শর্তে।

শরয়ী নীতিমালা:

  • হারাম কাজ শুধু সেই পরিমাণে জায়েজ হয়, যতটুকু দারুরাহ মিটে, তার বেশি নয়।
  • জাল দলিল তৈরি করা প্রতারণা, যা রাষ্ট্রের সাথে প্রতারণা ও আইন ভঙ্গের শামিল; এটি অন্যদের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।
  • হানাফি ফিকহে ‘দারুরাহ’ এর জন্য স্পষ্ট শর্ত: প্রাণ বাঁচানো, অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন (খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা) ইত্যাদি। আয়-রোজগার বেড়ে যাওয়া বা ক্যারিয়ার গড়া ‘দারুরাহ’-র পর্যায়ে পড়ে না বরং ‘হাজাত’-এর অন্তর্ভুক্ত।

ফাতাওয়া থেকে দলিল:

  • ফাতাওয়া উসমানী (২/২৭৫):

    "মিথ্যা বলা অত্যন্ত কঠিন গুনাহ। চাকরি, ভিসা বা ব্যবসার জন্য মিথ্যা বলা জায়েজ নয়, যদিও তাতে খুবই প্রয়োজন হয়।"

  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/২৪৪):

    "জাল ডকুমেন্ট তৈরি করে ভিসা নেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহর উপর তওয়াক্কুল করে হালাল উপায়ে চেষ্টা করতে হবে।"

  • দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া (নং: ১৪৪০০-৪২১৭৭):

    "অভিবাসনের জন্য মিথ্যা তথ্য দেওয়া জায়েজ নয়, যদিও দেশে আয়-রোজগার না থাকে।"

তবে আপনার মত অবস্থায় কি কোনো সুযোগ আছে?
কিছু হানাফি ফকিহ ‘তাওরিয়া’ (অর্থাৎ সত্যের গোপন রাখার জন্য অস্পষ্ট কথা বলা) কে মিথ্যার বিকল্প হিসেবে অনুমতি দিয়েছেন একান্ত প্রয়োজনে। যেমন – ভিসা অফিসারকে সরাসরি মিথ্যা না বলে এমন শব্দ ব্যবহার করা যার দ্বারা আপনার উদ্দেশ্য স্পষ্ট না হয়। কিন্তু জাল ডকুমেন্ট (মিথ্যা কাগজপত্র) তৈরি করা সরাসরি প্রতারণা, তাওরিয়ার সুযোগ এখানে নেই।

আপনার করণীয়:

  1. আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং হালাল উপায়ে চেষ্টা চালিয়ে যান। পুনরায় ব্যবসার চেষ্টা করুন, অল্প হলেও হালাল রিজিক নিয়ে সন্তুষ্ট থাকুন।
  2. আপনার ফ্যামিলির সাথে কথা বলুন – যদি তারা সত্যিকার অর্থে সাহায্য না করে, তবে অন্য আত্মীয় বা সমাজের সাহায্য নিন।
  3. ভিসার জন্য সত্যিকারের ডকুমেন্ট জোগাড় করুন – আইনগত চেষ্টা করুন। অনেক দেশে সত্যতা ছাড়াও অন্যান্য উপায়ে ভিসা মেলে।
  4. ইসতিখারা করুন এবং বিশেষ কোনো মুফতির সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলুন – আপনার অবস্থা পুরোপুরি না জানলে পূর্ণ ফতোয়া দেওয়া কঠিন। তবে শুধুমাত্র ‘অভাব’ মিথ্যার অনুমতি দেয় না।

সতর্কতা:

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ﴾ (التوبة: ১১৯)
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।”
মিথ্যার পরিণাম ভয়ংকর। হাদিসে এসেছে: “মিথ্যা কথা পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ জাহান্নামের দিকে।” (সহীহ বুখারী)

সারমর্ম:
মিথ্যা দলিল দেওয়া জায়েজ নয়। আপনার সমস্যা কঠিন, কিন্তু গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়া সমাধান নয়। বরং ধৈর্য ধরে হালালের পথ খুঁজুন, আল্লাহ পথ খুলে দেবেন।


৩. কুরআন খতমের সুন্নাতগুলো কী কী?

উত্তর:
পবিত্র কুরআন খতম করার পর নিম্নলিখিত কাজগুলো সুন্নাত বা মুস্তাহাব বলে হানাফি ফকিহগণ উল্লেখ করেছেন (আল-হিদায়া, রদ্দুল মুহতার, বাহিশ্তি জেওর):

১. খতমের সময় কুরআনকে সান্ত্বনা দিয়ে নতুন করে শুরু করা:
সাধারণত সূরা ফাতিহা ও সূরা বাকারার প্রথম পাঁচ আয়াত পড়ে খতম সম্পন্ন করা সুন্নাত। এর মাধ্যমে বুঝানো হয়, কুরআন তিলাওয়াত কখনো শেষ হয় না।

২. খতমের পর বিশেষ দুআ করা:

  • হাদিসে এসেছে: “যে ব্যক্তি কুরআন খতম করে, তার দুআ কবুল হয়।” (তিরমিযী, হাসান)
  • খতমের দুআ পড়া মুস্তাহাব (বাহিশ্তি জেওর, ১ম খণ্ড)।

৩. খতমের সময় পরিবারকে একত্রিত করা:
হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ খতমের সময় পরিবারবর্গকে ডেকে দুআ করতেন। (সুনানে দারিমী)

৪. খতমের দিন রোযা রাখা:
হযরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) খতমের দিন রোযা রাখতেন। (মুসলিম, বায়হাকী)

৫. সাদকাহ (দান-খয়রাত) করা:
খতমের দিন গরীব-মিসকিনদের খাবার পরিবেশন করা বা সাদকাহ দেওয়া নবী করীম ﷺ ও সাহাবাদের আমল ছিল।

৬. খতমের পর মসজিদে সম্মিলিত দুআ করা:
আনাস (রা.) বলেন, “খতমের সময় মসজিদে আলোকসজ্জা করা হত।” (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা)

৭. কুরআন তিলাওয়াত অব্যাহত রাখা:
খতম শেষ করে কিছুক্ষণ পর পুনরায় তিলাওয়াত শুরু করা।

বিস্তারিত দলিল:

  • বেহেশতি জেওর (১ম খণ্ড, কুরআন তিলাওয়াতের মাসায়েল):

    “কুরআন খতমের পর সূরা ফাতিহা ও সূরা বাকারার প্রথম কয়েক আয়াত পড়া সুন্নাত। খতমের দুআ কবুল হওয়ার জন্য বিশেষ ইতিকাদ রাখা উচিত।”

  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/১২৩):

    “খতমের দিন পরিবারকে খাওয়ানো, দুআ করা এবং সাদকাহ দেওয়া মুস্তাহাব।”

আপনার করণীয়:

  • খতমের পর উল্লেখিত সুন্নাতগুলো পালনের চেষ্টা করুন।
  • মনে রাখবেন, খতমের আসল উদ্দেশ্য কুরআনের অর্থ বোঝা ও আমল করা। খতমের আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে তিলাওয়াতের ধারাবাহিকতা ও চিন্তা-গবেষণা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বশেষ উপদেশ:
প্রথম প্রশ্নের উত্তর অনুযায়ী মাগরিবের সুন্নাতে কাফিরুন ও ইখলাস পড়া ফযিলতের কাজ। দ্বিতীয় প্রশ্নে মিথ্যার অনুমতি নেই – আল্লাহর উপর ভরসা রেখে হালাল পথে চেষ্টা চালিয়ে যান, ইনশাআল্লাহ রিজিক আসবে। তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরে কুরআন খতমের সুন্নাতগুলো মেনে চললে বরকত হবে।

اللهم اجعلنا من الصادقين المتقين
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন।

Reference Sources:

  • সহীহ মুসলিম, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ
  • সুনানে দারিমী, বায়হাকী
  • রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া হিন্দিয়া
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, ফাতাওয়া উসমানী
  • বাহিশ্তি জেওর
  • দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.