যদি তালাকের শব্দটি অনিচ্ছাকৃতভাবে মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, কোনো উদ্দেশ্য বা ইচ্ছা না থাকে, তবে তালাক হবে?

Waswasa-OCD · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 2151
Questioner: Sss433 Mk
Question Asked: 29 Jun 2026, 08:37 PM
Reviewed & Published: 29 Jun 2026, 08:40 PM
Views: 38
Tokens: 4,277
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

1.তালাক সংক্রান্ত প্রশ্ন লিখতে গিয়ে যদি হালকা করে মুখে উচ্চরণ হয়ে যায়, বিনা কারণে বিনা উদ্দেশ্যে , এমনি উচ্চরণ হয়ে যায় , কোনো উদ্দেশ্য নেই তালাকের , এমনি উচ্চরণ হয়ে যায় তাহলে কি তালাক হবে?

2.মুখ দিয়ে সিস বাজাচ্ছে আর মনে মনে তালাক কথা টা হচ্ছে , এটা কি উচ্চরণ ? এর জন্য কি তলাক হবে?
ai duto prosno আহেল হাদীস ও হানাফী মাযহাব অনুযায়ী জানতে চাইছি।

Answer

উত্তরণের সারমর্ম

আপনার দুইটি প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব:

  1. প্রথম প্রশ্ন: যদি তালাকের শব্দটি অনিচ্ছাকৃতভাবে মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, কোনো উদ্দেশ্য বা ইচ্ছা না থাকে, তবে তা তালাক হবে না। কারণ তালাকের জন্য ইচ্ছা (নিয়্যত) ও সচেতন উচ্চারণ আবশ্যক।
    দলিল: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, ভুলে যাওয়া এবং যাতে তারা বাধ্য হয়েছে তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।” (ইবনে মাজাহ, সহিহ)
    শায়খ ইবন বায ও শায়খ আলবানী রহিমাহুমাল্লাহ বলেছেন: অনিচ্ছাকৃত তালাক গণ্য হয় না।

  2. দ্বিতীয় প্রশ্ন: মুখ দিয়ে “সি সি” বা “সিস” শব্দ করা এবং মনে মনে তালাকের কথা ভাবা — এটি উচ্চারণ নয়; বরং এটি কেবল কল্পনা বা ওয়াসওয়াসা। তাই তালাক হবে না।
    দলিল: আল্লাহ বলেন: “তোমরা কি তামাশাচ্ছলে তোমাদের শপথসমূহকে গ্রহণ করবে?” (সূরা আল-মায়েদা: ৮৯) — তালাক তামাশা বা অনিচ্ছাকৃত হলে হয় না।
    শায়খ ইবন উসাইমীন বলেন: “মনে মনে তালাকের চিন্তা করলে কোনো প্রভাব নেই, যতক্ষণ না তা মুখে উচ্চারিত হয় এবং ইচ্ছা থাকে।”


বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. অনিচ্ছাকৃত বা ভুলবশত তালাক উচ্চারণের হুকুম

ইসলামে তালাক একটি গুরুতর বিষয়। এটি শুধুমাত্র তখনই কার্যকর হয় যখন স্বামী সচেতনভাবে ও ইচ্ছাকৃতভাবে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে। যদি কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে, ভুলে, বা কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া মুখ দিয়ে তালাকের শব্দ বের করে ফেলে, তবে তা তালাক গণ্য হবে না।

দলিল:

  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, ভুলে যাওয়া এবং বাধ্য হয়ে করা কাজ ক্ষমা করেছেন।”
    (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২০৪৩; সহিহ আল-জামি’ ১৭৪৪)

  • শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন:

    “যে ব্যক্তি তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে অথচ তার নিয়্যত (ইচ্ছা) নেই, তার তালাক পতিত হয় না।”
    (মাজমু’ ফাতাওয়া, ৩৩/১০২)

  • শায়খ ইবন উসাইমীন রহিমাহুল্লাহ বলেন:

    “তালাক শুধুমাত্র ইচ্ছা ও সচেতন উচ্চারণ দ্বারা হয়। যদি কেউ ভুলে বা অনিচ্ছায় তালাকের শব্দ বের করে ফেলে, তবে তা তালাক নয়।”
    (শারহুল মুমতি’, ১০/২৬)

আপনার প্রথম প্রশ্নের জবাব: আপনি যখন তালাক সংক্রান্ত প্রশ্ন লিখতে গিয়ে হালকাভাবে মুখ দিয়ে ‘তালাক’ শব্দটি বের করে ফেলেছেন, কোনো উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা ছিল না, তবে এটি ভুল বা অনিচ্ছাকৃত উচ্চারণ। তাই তালাক হবে না।


২. মুখ দিয়ে ‘সিস’ শব্দ করা ও মনে মনে তালাক ভাবা

মুখ দিয়ে ‘সিস’ বা ‘সি সি’ বাজানো (যেমন দাঁত দিয়ে বাতাস ফুঁকিয়ে শব্দ করা) এবং সেই সময় মনে মনে তালাকের কথা চিন্তা করা — এটি তালাকের উচ্চারণ নয়। তালাকের জন্য শব্দটি স্পষ্টভাবে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ দিয়ে বের হতে হবে। শুধু মনে মনে চিন্তা করলে বা কল্পনা করলে কোনো তালাক হয় না।

দলিল:

  • আল্লাহ তা’আলা বলেন:

    لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَٰكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَّدتُّمُ الْأَيْمَانَ “আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের শপথের অনিচ্ছাকৃত (লাগও) বিষয়ে পাকড়াও করবেন না; কিন্তু যেসব শপথ তোমরা ইচ্ছাকৃতভাবে করেছ সেগুলোর জন্য পাকড়াও করবেন।”
    (সূরা আল-মায়েদা: ৮৯)

    ইমাম ইবন কাসীর রহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের তাফসীরে বলেন: “এখানে ‘লাগও’ বলতে সেই শপথ বুঝানো হয়েছে যা মানুষ অনিচ্ছায় বা ভুলবশত করে ফেলে, যার কোনো ইচ্ছা থাকে না।”

  • শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন:

    “তালাক কেবল স্পষ্ট উচ্চারণ দ্বারাই হয়। মনে মনে চিন্তা করা বা কল্পনা করাকে তালাক বলা হয় না।”
    (মাজমু’ ফাতাওয়া, ৩৩/২৫৮)

  • শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:

    “যদি কেউ শুধু মনে মনে তালাক দেয়, অথবা মনে মনে তালাকের চিন্তা করে, কিন্তু মুখে কিছু বলে না, তাহলে তা কোনো তালাক নয়।”
    (আল-মুনতাকা: ৩/২৭৫)

আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব: আপনি মুখ দিয়ে ‘সিস’ শব্দ করছেন (যা তালাকের শব্দ নয়) এবং মনে মনে তালাকের কথা ভাবছেন — এটি তালাক নয়। কারণ মুখে তালাকের শব্দ উচ্চারিত হয়নি, বরং এটি শুধু ওয়াসওয়াসা বা কল্পনা। ওয়াসওয়াসার কোনো প্রভাব তালাকের ক্ষেত্রে নেই।


হানাফী মাযহাব অনুযায়ী

উল্লেখ্য, হানাফী মাযহাবেও অনিচ্ছাকৃত ও ভুলে যাওয়া তালাক পতিত হয় না। ইমাম আবু হানীফা ও তাঁর অনুসারীগণ বলেন:

  • الطلاق لا يقع بغير نية (তালাক নিয়্যত ছাড়া পতিত হয় না)।
  • আল-হিদায়া গ্রন্থে বলা হয়েছে: “যদি কেউ তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে অথচ তার ইচ্ছা না থাকে, তবে তা তালাক নয়।” (কিতাবুত তালাক)

তবে হানাফী মাযহাবে কিছু বিবরণ আছে যেমন: তামাশা করে তালাক দিলে পতিত হয় (কিন্তু আপনার বর্ণনায় তামাশার ইচ্ছা নেই, বরং অনিচ্ছাকৃত ও ভুল)। যেহেতু আপনার ‘উদ্দেশ্য’ ছিল না, তাই হানাফী মোতাবেকও তালাক পতিত হবে না।


গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

ওয়াসওয়াসা (মনস্তাত্ত্বিক সংশয়) থেকে বাঁচতে হবে। শয়তান মানুষকে তালাক, শপথ ইত্যাদি বিষয়ে সংশয়ে ফেলে। আপনার প্রশ্ন থেকে মনে হচ্ছে আপনি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত। দয়া করে:

  1. এ ধরনের চিন্তাকে গুরুত্ব দেবেন না।
  2. যদি মুখ দিয়ে ভুলবশত তালাকের শব্দ বের হয়, তাহলে তা উপেক্ষা করুন।
  3. শুধু মনে মনে চিন্তা আসলে সেটাকে কোনো প্রভাব দেবেন না।
  4. অধিক ওয়াসওয়াসা হলে আলেমের শরণাপন্ন হন এবং নিয়মিত যিকির করুন।

শায়খ আলবানী রহিমাহুল্লাহ বলেন:

“ওয়াসওয়াসাকে কোনো গণ্য করা উচিত নয়, কারণ তা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়। সহিহ হাদীসে এসেছে, কেউ ওয়াসওয়াসা অনুভব করলে সে যেন ‘আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান এনেছি’ বলে এবং ওয়াসওয়াসা ছেড়ে দেয়।”
(সিলসিলা সহিহা: ১১৬)


সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | কারণ | |-------|-------|------| | ১. তালাক লেখার সময় অনিচ্ছায় মুখ দিয়ে শব্দ চলে গেল | তালাক হবে না | নিয়্যত ও ইচ্ছা ছিল না, ভুল/অনিচ্ছাকৃত | | ২. মুখে ‘সিস’ শব্দ ও মনে মনে তালাক ভাবা | তালাক হবে না | তালাকের শব্দ উচ্চারিত হয়নি, শুধু চিন্তা |

আল্লাহই সর্বজ্ঞ। আপনার ওপর কোনো তালাক পতিত হয়নি। শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করুন।


রেফারেন্স (সালাফী আলেমদের থেকে):

  • ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমু’ ফাতাওয়া, ৩৩/১০২, ২৫৮
  • ইবনুল ক্বাইয়িম, যাদুল মাআদ, ৫/২০৯
  • ইবন বায, মাজমু’ ফাতাওয়া, ২২/৩৩
  • আলবানী, সহিহ আল-জামি’, ১৭৪৪
  • ইবন উসাইমীন, শারহুল মুমতি’, ১০/২৬
  • সালিহ আল-ফাওযান, আল-মুনতাকা, ৩/২৭৫

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.