মাযহাব পরিবর্তন করলে কি আবারও নতুন করে ফতোয়া নিতে হবে?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
১. আমি যখন হানাফী মাযহাব অনুসরণ করতাম সেই সময় আমার জীবনে যত সমস্যা এসেছে আমি আমি হানাফী মাযহাব এর ফতোয়া নিয়ে চলেছি। হানাফী থাকা কালীন স্ত্রী কে একসঙ্গে 6 বার তালাক বলেছিলাম । তার পর অনেক আলেম কে জিজ্ঞাসা করছি , এবং হাদীস এর দলিল দেখে আমি আহেল হাদীস এর মত গ্রহন করেছি এটা আমার কাছে হালাল ও ঠিক মনে হয়েছে , এবং স্ত্রী কে ফিরে পেয়েছি। আলেম দের পরামর্শে আমি এখন সংসার করছি। আলহামদুলিল্লাহ্।
তো যখন হানাফী ছিলাম তখন আমার জীবনে যত মাসায়েল এসেছে সবকিছুই আমি হানাফী ফতোয়া মেনে কাজ করেছি । এখন আমি আহলে হাদীস অনুযায়ী চলছি তাই আমাকে কি আবারও নতুন করে আগের সব মাসায়েল এর ফতোয়া নিতে হবে? নাকি এখন থেকে যা ঘটবে সেই গুলো আহেল হাদীস অনুযায়ী নিতে হবে?
2. আগের যত মাসায়েল ছিল সেইগুলো নিয়ে আর কি ভাবতে হবে? নতুন করে কি ফতোয়া নিতে হবে আহলে হাদীস অনুযায়ী?
3. শায়েখ আমি কি নিশ্চিন্তে সংসার করতে পারি? এর জন্য আখিরাতের কোনো দায় থাকবে না তো?
4.শায়েখ আমার বিষয় টা দেখেন আমাকে কি আপনাদের এইখান কার ফতোয়া নেওয়ার পর আমি সেই আমল করতে পারি? আর কোনো আলেম কে না জিজ্ঞাসা করলেও তো হবে তাই না?
Answer
মাযহাব পরিবর্তনের পর পূর্বের মাসআলাগুলোর ফতোয়া পুনরায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা
উত্তর:
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
১. পূর্বের মাসআলাগুলোর ফতোয়া পুনরায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা
আপনি যখন হানাফী মাযহাব অনুসরণ করতেন, তখন আপনি আপনার জ্ঞান ও বিশ্বাস অনুযায়ী সে মাযহাবের ফতোয়া অনুযায়ী আমল করেছেন। এখন আপনি আহলে হাদীস (সালাফী) পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। এই ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত নীতিমালা প্রযোজ্য:
পূর্বের আমলগুলো পুনরায় করার প্রয়োজন নেই যদি সেগুলো বৈধ ছিল এবং আপনি সঠিক বিশ্বাসে আমল করে থাকেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا" "আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের অধিক বোঝা চাপান না।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৮৬)
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যে ব্যক্তি ইজতিহাদ বা তাকলীদের ভিত্তিতে কোনো আমল করেছে, পরে তার কাছে যদি প্রমাণিত হয় যে তা সঠিক নয়, তবে তাকে পূর্বের আমল পুনরায় করতে হবে না, যদি না তা বাতিল হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ২২/২৬৯)
বিশেষ করে তালাকের বিষয়টি: হানাফী মাযহাব অনুযায়ী একসঙ্গে ছয় তালাক বললে তা তিন তালাক হিসেবে গণ্য হয় এবং তাদের মতে এই তালাক কার্যকর হয়। আপনি আহলে হাদীসের মত গ্রহণ করেছেন এবং আলেমদের পরামর্শ নিয়ে স্ত্রীকে ফিরে পেয়েছেন। যদি আপনি বাস্তবেই দলীল প্রমাণের মুজবুতির দরুণ মাযহাব পরিবর্তন করে থাকেন, তাহলে আপনার সিদ্ধান্ত সঠিক হয়েছে। তবে কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে আপনি মাযহাব পরিবর্তন করে থাকলে আপনার কাজটি সঠিক হয়নি।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"এক মজলিসে তিন তালাক দেওয়া এক তালাকই গণ্য হবে, যদি না তা পৃথক পৃথকভাবে দেওয়ার নিয়ত থাকে।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ৩৩/৩৪)
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যে ব্যক্তি তার মাযহাব পরিবর্তন করে, তার পূর্বের আমলগুলো পুনরায় করার প্রয়োজন নেই, কারণ সে তখন তার জ্ঞান ও বিশ্বাস অনুযায়ী আমল করেছে।" (ফাতাওয়া নূরুন আলা-দারব)
সুতরাং, এখন থেকে ভবিষ্যতে যা ঘটবে সেগুলো আপনি আহলে হাদীস (সালাফী) পদ্ধতি অনুযায়ী করবেন। পূর্বের মাসআলাগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে না।
২. পূর্বের মাসআলাগুলো নিয়ে আর চিন্তা করার প্রয়োজন নেই
আপনি পূর্বে হানাফী ফতোয়া অনুযায়ী যেসব আমল করেছেন, সেগুলো যদি হালাল ও বৈধ পদ্ধতিতে হয়ে থাকে, তবে সেগুলো নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। শাইখ আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে তার সামর্থ্য অনুযায়ী আমল করে, আল্লাহ তার কাছ থেকে তা গ্রহণ করবেন। মাযহাব পরিবর্তনের কারণে পূর্বের বৈধ আমলগুলো বাতিল হয়ে যায় না।" (সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান-নূর)
৩. নিশ্চিন্তে সংসার করা ও আখিরাতের দায়িত্ব
আপনি আলেমদের পরামর্শ নিয়ে এবং হাদীসের দলিল দেখে স্ত্রীকে ফিরে পেয়েছেন এবং এখন সংসার করছেন। এটি সঠিক সিদ্ধান্ত। আপনার জন্য নিশ্চিন্তে সংসার করা জায়েয। কারণ:
- আপনি ইজতিহাদ ও দলীলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন
- আপনি আলেমদের পরামর্শ নিয়েছেন
- আপনার নিয়ত ছিল সঠিক পথ অনুসরণ করা
শাইখ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যে ব্যক্তি সঠিক পথ গ্রহণ করে এবং তার পূর্বের ভুল বুঝতে পেরে তা সংশোধন করে, আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন। কোনো ব্যক্তি যদি ইজতিহাদ বা তাকলীদের মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্ত নেয় এবং পরে সঠিক পথ জানতে পেরে তা গ্রহণ করে, তবে আল্লাহ তার পূর্বের আমল গ্রহণ করবেন।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ২২/২৭৫)
৪. এখান থেকে ফতোয়া নেওয়া ও অন্য আলেমকে না জিজ্ঞাসা করা
আপনি যদি নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে ফতোয়া নেন এবং আপনার কাছে তা দলীল-ভিত্তিক মনে হয়, তবে আপনি সেই অনুযায়ী আমল করতে পারেন। তবে সাধারণ নীতি হলো:
"الفتوى مبنية على العلم والتحقيق" "ফতোয়া জ্ঞান ও নিশ্চিততার ভিত্তিতে দেওয়া হয়।"
শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:
"একজন সাধারণ মুসলিমের জন্য উচিত, সে যেন নির্ভরযোগ্য আলেমদের কাছ থেকে ফতোয়া গ্রহণ করে। যদি সে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে ফতোয়া পেয়ে থাকে, তবে তার জন্য সেই অনুযায়ী আমল করা জায়েয।" (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান, ১/৪২)
তবে ভালো হবে যদি আপনি আরও আলেমদের কাছ থেকে মতামত নেন, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
"المستشار مؤتمن" "যার পরামর্শ নেওয়া হয়, সে আমানতদার।" (আবু দাউদ, হাদীস নং ৫১২৮)
উপসংহার: আপনি নিশ্চিন্তে সংসার করতে পারেন। আল্লাহ আপনার পূর্বের আমলগুলো কবুল করুন এবং ভবিষ্যেবীতে আপনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আপনার জন্য কোনো আখিরাতের দায়িত্ব থাকবে না, ইনশাআল্লাহ।
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا "হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুল করি, তবে আপনি আমাদের পাকড়াও করবেন না।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৮৬)
আল্লাহু আলাম।