মুতাওয়াতির হাদীস কয়টি? খবরে ওয়াহেদ কি ফিকহে কাজে লাগে? মেরাজের রাতে নবী কি আল্লাহকে দেখেছেন?
Faith and Belief · Hanafi
Question
২.মেরাজের রাতে আল্লাহ তালাকে স্বচক্ষে দেখার ব্যাপারে ইবনে আব্বাস এবং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর মাঝে আকিদাগত দ্বন্দ্ব ছিল তাই আমাদেরও আকিদাগত মতপার্থক্য কি সহিহ? কোন আকিদাগত বিভক্তি শরীয়তসম্মত?
৩. হাদিস থেকে পাওয়া দাজ্জাল কোনো দ্বীপে বাঁধা আছে এটা কি শিওর?
৪. কৌশলগত হিসেবে কাফেরের কোনো মতাদর্শ বা উপকরণ মুসলিমদের বিজয় অর্জনের পথ হিসেবে ব্যবহারের উসূল কি কি? গণতন্ত্রকে কেন ব্যবহার করা যাবে
Answer
আকীদা সংক্রান্ত জিজ্ঞাসার উত্তর | الأسئلة العقائدية
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রশ্ন ১: হাদীসের শ্রেণীবিভাগ ও ফিকহী মাসায়েল
মুতাওয়াতির ও মাশহুর হাদীসের সংখ্যা
মুতাওয়াতির হাদীস: ইসলামী পরিভাষায় মুতাওয়াতির হাদীস বলতে সেই হাদীসকে বোঝায় যা এত অধিক সংখ্যক বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন যে, তাদের মিথ্যার উপর একত্রিত হওয়া অসম্ভব। হানাফী মাযহাবের উসূলবিদদের মতে, মুতাওয়াতির হাদীসের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) তাঁর 'আল-আযহার' গ্রন্থে মুতাওয়াতির হাদীসের সংখ্যা মাত্র ১১৩টি উল্লেখ করেছেন। তবে অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ এর চেয়ে কম বা বেশি সংখ্যা উল্লেখ করেছেন।
মাশহুর হাদীস: মাশহুর হাদীস হলো সেই হাদীস যা প্রথম যুগে দুই বা ততোধিক বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন, কিন্তু পরবর্তীতে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। "৯৯% হাদীস খবরে ওয়াহেদ পর্যায়ের"—এই কথাটি সঠিক নয়। বরং সহীহ হাদীসের একটি বড় অংশ খবরে ওয়াহেদ হলেও, অনেক হাদীস মাশহুর ও মুতাওয়াতির পর্যায়েরও রয়েছে।
ফিকহী মাসায়েল ও হাদীসের প্রকার
হানাফী মাযহাবের উসূলুল ফিকহ অনুযায়ী, ফিকহী মাসায়েল প্রধানত তিন ধরনের হাদীস থেকে নেওয়া হয়:
- মুতাওয়াতির হাদীস - যা ইলমে ইয়াকীন (নিশ্চিত জ্ঞান) প্রদান করে
- মাশহুর হাদীস - যা ইলমে ইয়াকীনের কাছাকাছি জ্ঞান প্রদান করে
- খবরে ওয়াহেদ - যা জন্নে গালিব (প্রবল ধারণা) প্রদান করে
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, খবরে ওয়াহেদ আমলের জন্য যথেষ্ট এবং ফিকহী মাসায়েলের ক্ষেত্রে তা গ্রহণযোগ্য। তবে আকীদার ক্ষেত্রে খবরে ওয়াহেদ যথেষ্ট নয়; আকীদার জন্য মুতাওয়াতির বা মাশহুর হাদীস প্রয়োজন।
খবরে ওয়াহেদ কি ফিকহের উসূলী ফায়দা দেয়?
হ্যাঁ, খবরে ওয়াহেদ ফিকহের উসূলী ফায়দা দেয়। ইমাম আবু হানীফা (রহ.), ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এবং ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-সহ হানাফী ফকীহগণ খবরে ওয়াহেদকে ফিকহী মাসায়েলের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তবে তারা এর গ্রহণের জন্য কিছু শর্ত আরোপ করেছেন:
- বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত ও ধার্মিক হতে হবে
- বর্ণনাটি কুরআন ও মুতাওয়াতির সুন্নাহর বিপরীত না হওয়া
- সাধারণ জ্ঞান ও কিয়াসের বিপরীত না হওয়া
খবরে ওয়াহেদ বাতিল মনে করার সুযোগ:
সহীহ সনদে বর্ণিত খবরে ওয়াহেদকে বাতিল মনে করা বা অস্বীকার করা জায়েয নয় যদি তা সহীহ সনদে বর্ণিত হয় এবং কুরআন ও সুন্নাহর কোন সুস্পষ্ট দলীলের বিপরীত না হয়। তবে যদি কোন হাদীস কুরআন বা মুতাওয়াতির হাদীসের বিপরীত হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা যাবে না।
ইবনে আবেদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতারে উল্লেখ করেছেন:
"الخبر الواحد إذا لم يعارض نصاً قاطعاً يجب العمل به في الأحكام" "খবরে ওয়াহেদ যদি কোন কাটেয়ী নাসের (সুস্পষ্ট দলীলের) বিপরীত না হয়, তাহলে আহকামে (ফিকহী বিধানে) তা গ্রহণ করা ওয়াজিব।"
(রদ্দুল মুহতার, ১/৪৪)
প্রশ্ন ২: মেরাজের রাতে আল্লাহকে দেখা সংক্রান্ত মতপার্থক্য
ইবনে আব্বাস (রা.) ও আয়েশা (রা.)-এর মতভেদ
মেরাজের রাতে নবী করীম (সা.) আল্লাহকে দেখেছেন কিনা—এই বিষয়ে সাহাবীদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল:
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মত: তিনি বিশ্বাস করতেন যে, নবী করীম (সা.) মেরাজের রাতে স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখেছেন। এ ব্যাপারে তাঁর দলীল হলো আল্লাহর বাণী:
"وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى" (সূরা আন-নাজম: ১৩) "আর তিনি তাকে আরেক বার দেখেছিলেন।"
হযরত আয়েশা (রা.)-এর মত: তিনি বিশ্বাস করতেন যে, নবী করীম (সা.) আল্লাহকে দেখেননি। তাঁর দলীল হলো আল্লাহর বাণী:
"لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ" (সূরা আল-আন'আম: ১০৩) "দৃষ্টিসমূহ তাকে পায় না, আর তিনি দৃষ্টিসমূহকে পেয়ে যান।"
সমাধান ও করণীয়
এই বিষয়ে উভয় মতই সম্মানিত সাহাবীদের থেকে প্রমাণিত। ইমাম তহাবী (রহ.) তাঁর 'শারহুল আকীদাতিত তহাবীয়্যাহ'-তে উল্লেখ করেছেন:
এবং নবী (সা.)-এর মেরাজের রাতে আল্লাহকে দেখা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে আমরা এ বিষয়ে চুপ থাকাই উত্তম মনে করি এবং এ ব্যাপারে গভীর আলোচনা না করাই সঙ্গত।
সঠিক মত হলো, নবী করীম (সা.) মেরাজের রাতে আল্লাহকে দেখেছেন, তবে তা চোখ দিয়ে নয় বরং হৃদয় দিয়ে দেখেছেন। এটাই সালাফে সালেহীনের অধিকাংশের মত।
আমাদের করণীয়: সাহাবীদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ ছিল, কিন্তু তারা কেউ কাউকে গোমরাহ বলেননি। আমাদের উচিত এই বিষয়ে গভীর তর্ক-বিতর্ক না করে উভয় মতের সমন্বয় করা এবং সাহাবীদের প্রতি সম্মান বজায় রাখা।
মুফতী শফী উসমানী (রহ.) মা'আরিফুল কুরআনে উল্লেখ করেছেন:
"এ বিষয়ে কঠোর মতপার্থক্য না করাই উত্তম। বরং বলা উচিত যে, নবী করীম (সা.)-কে তাঁর রবের দর্শন লাভ হয়েছিল, কিন্তু তা কীভাবে হয়েছিল, তা আমরা জানি না।"
প্রশ্ন ৩: দাজ্জাল কোন দ্বীপে বাঁধা আছে—এটি কি নিশ্চিত?
হাদীসে দাজ্জাল সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে এসেছে:
حَدَّثَنَا فَاطِمَةُ بِنْتُ قَيْسٍ قَالَتْ: سَمِعْتُ مُنَادِيَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُنَادِي: "الصَّلَاةَ جَامِعَةً" فَخَرَجْتُ فَصَلَّيْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا قَضَى الصَّلَاةَ قَالَ: "إِنِّي قَدْ حَبَسْتُ عَلَيْكُمْ تَمِيمًا الدَّارِيَّ وَكَانَ نَصْرَانِيًّا فَجَاءَ فَبَايَعَ وَأَسْلَمَ وَحَدَّثَنِي حَدِيثًا وَافَقَ الَّذِي كُنْتُ أُحَدِّثُكُمْ عَنْ مَسِيحِ الدَّجَّالِ" ... (صحيح مسلم، كتاب الفتن، حديث رقم 2942)
অর্থাৎ, ফাতিমা বিনতে কায়স (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর চাচাতো ভাই আমর ইবনে আসিম (রা.)-এর মাধ্যমে বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন: দাজ্জাল এমন একটি দ্বীপে বন্দী অবস্থায় রয়েছে যেখানে একটি শহর আছে যা "জাসাসা" নামে পরিচিত।
এটি কি নিশ্চিত? হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত, যা সহীহ হাদীসের অন্যতম নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ। ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, সহীহ হাদীসে বর্ণিত বিষয়গুলো বিশ্বাস করা ওয়াজিব। সুতরাং, দাজ্জাল একটি নির্দিষ্ট দ্বীপে বন্দী অবস্থায় আছে—এটি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করতে হবে। তবে দ্বীপটির সঠিক অবস্থান সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই; আল্লাহই ভাল জানেন।
ইমাম নববী (রহ.) শারহে মুসলিমে উল্লেখ করেছেন:
"এই হাদীসটি সহীহ এবং দাজ্জালের অস্তিত্ব ও তার বন্দী অবস্থান সম্পর্কে এটি একটি স্পষ্ট প্রমাণ।"
প্রশ্ন ৪: কাফেরের মতাদর্শ ও উপকরণ ব্যবহার
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কাফেরের কৌশল ও উপকরণ ব্যবহারের নীতি
ইসলামে কাফেরের কৌশল ও উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক নীতি রয়েছে:
১. দুনিয়াবী বিষয়ে গ্রহণযোগ্যতা: ইসলামী শরীয়ত দুনিয়াবী বিষয়ে কাফেরদের কাছ থেকে উপকৃত হতে নিষেধ করে না। যেমন, যুদ্ধের কৌশল, চিকিৎসা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ইত্যাদি। রাসূল (সা.) যুদ্ধের সময় কাফেরদের কাছ থেকে কৌশল গ্রহণ করেছেন।
২. ধর্মীয় বিষয়ে সতর্কতা: যে সকল মতাদর্শ বা পদ্ধতি ইসলামী আকীদা ও শরীয়তের পরিপন্থী, সেগুলো গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। যেমন, শিরকী আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মীয় বিকৃতি ইত্যাদি।
ব্যবহারের শর্তাবলী
১. আকীদার সাথে আপোষ না করা: কাফেরের কোন মতাদর্শ ব্যবহার করলে তাতে ইসলামী আকীদার সাথে আপোষ করা যাবে না। ২. শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন না করা: যে সকল উপকরণ বা পদ্ধতি হারাম কাজে ব্যবহৃত হয়, তা ব্যবহার করা জায়েয নয়। ৩. মাসলাহাত (কল্যাণ) ও মাফসাদাত (অকল্যাণ) বিবেচনা: যে বিষয়ে শরীয়তের স্পষ্ট বিধান নেই, সেখানে কল্যাণ ও অপকারিতা বিচার করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
৩. গণতন্ত্র প্রসঙ্গ:
উক্ত প্রশ্নের উত্তরের জন্য আপনার এলাকার সংশ্লিষ্ট উলামায় কেরামের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা আপনার জন্য কল্যাণকর হবে বলেই আমাদের ধারণা।
তাছাড়া ইলম অর্জনের জন্য সফর করা অত্যান্ত জরুরী। এবং কষ্ট করে ইলম অর্জন করাই আমাদের আকাবির আসলাফদের রীতি ও নীতি। এদিকেই কুরআনের এই আয়াত ইঙ্গিত দিচ্ছে, ۚفَلَوْلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে এবং সংবাদ দান করে স্ব-জাতিকে, যখন তারা তাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, যেন তারা বাঁচতে পারে।(সূরা তাওবাহ-১২২)
সুতরাং আপনাকে বলবো, আপনি বিস্তারিত জানতে স্ব-শরীরে কোনো দারুল ইফতায় যোগাযোগ করবেন। প্রশ্ন করার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।আল্লাহ তা'আলা আপনার ইলম অর্জনের স্পৃহাকে আরো বাড়িয়ে দিক, আমীন।
والله أعلم بالصواب