অন্যের লেখা কপি করা সম্পর্কে প্রশ্ন

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2104
Questioner: Mohammad Masum
Question Asked: 28 Jun 2026, 08:31 AM
Reviewed & Published: 28 Jun 2026, 08:56 AM
Views: 59
Tokens: 5,055
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একটা কিতাব লেখা শুরু করেছি। তো ওইখানে একটা গল্প আনতে চাচ্ছি যেটা কুরআনে বর্ণিত আছে। এবং উক্ত ঘটনা ইউটিউবে এবং google এ বিভিন্ন জায়গায় আছে। তো আমি উক্ত লেখাটি গুগলের কোন একজনের লেখা থেকে কপি করতে চাচ্ছি। মানে youtube ভিডিও দেখে নিজের লেখা অনেক সময় ব্যাপার তাই। এখন এই ঘটনা তো সব জায়গায় এভেইলেবল। আবার যে ওয়েবসাইট থেকে নিতে চাচ্ছি সেখানে রেস্ট্রিকশন দেওয়া নেই আর রেস্ট্রিকশন দেয়াই বা থাকবে কেন এই ঘটনা তো তার নিজের না। আবার আমার কিতাবের শুরুতে আমি এটা লিখে দিয়েছি যে এই কিতাবে সবকিছুই আমার নিজের বলার কোন অপশন নেই কারণ এখানকার অনেক তথ্য আমি বিভিন্ন জায়গা থেকে কালেকশন করে তারপর এক জায়গা করার চেষ্টা করেছি।
এখন এভাবে যদি আমি ওই ঘটনাটি ওইখান থেকে কপি করে কিতাবে উল্লেখ করি তাহলে কি সমস্যা হবে?

Answer

উত্তর

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক। আপনি একটি কিতাব লেখা শুরু করেছেন এবং সেখানে কুরআনে বর্ণিত একটি ঘটনা অন্য একটি ওয়েবসাইট থেকে হুবহু কপি করে নিতে চাচ্ছেন। আপনি আপনার কিতাবের শুরুতে এও লিখে দিয়েছেন যে, এখানকার অধিকাংশ তথ্য বিভিন্ন জায়গা থেকে সংকলিত। এখন এই কাজটি শরীয়তের দৃষ্টিতে কেমন হবে, তা নিয়ে আপনার দ্বিধা।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ

ইসলামী শরীয়তে অন্য কারো লেখা, গবেষণা বা মেধাস্বত্ব (Intellectual Property) সম্মানিত ও সংরক্ষিত। হানাফী ফিকহের বিশিষ্ট ইমামগণ যেমন ইমাম আবু হানীফা (রহ.), ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর নীতি অনুসারে, কোনো ব্যক্তির পরিশ্রম ও মেধার ফল অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা জায়েয নয়। যদিও কুরআনের ঘটনা বা ঐতিহাসিক তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত, কিন্তু কেউ যদি সেই ঘটনাকে নিজের ভাষায়, নিজের বিন্যাসে, নিজের বিশ্লেষণসহ লিখে প্রকাশ করে, তাহলে সেই নির্দিষ্ট লেখাটি তার মেধাস্বত্বের আওতায় চলে আসে।

আপনার প্রশ্নের বিশ্লেষণ

১. ঘটনাটি কুরআনে বর্ণিত: এটি সত্য। তবে ওয়েবসাইটে যেভাবে লেখাটি সাজানো হয়েছে, সেটি নির্দিষ্ট একজন লেখকের পরিশ্রমের ফসল। তিনি ঘটনাটিকে নিজের ভাষায় লিখেছেন, হয়তো কিছু ব্যাখ্যা বা টীকা যোগ করেছেন। তাই সেই নির্দিষ্ট লেখাটি তার নিজস্ব সম্পদ।

২. ওয়েবসাইটে কোনো রেস্ট্রিকশন নেই: শুধুমাত্র স্পষ্টভাবে 'কপিরাইটেড' লেখা না থাকলেই যে তা নেওয়া জায়েয হবে, তা নয়। ইসলামী নীতি হলো, কোনো বস্তু তার মালিকের অনুমতি ছাড়া নেওয়া জায়েয নয়। অনেক ওয়েবসাইটে রেস্ট্রিকশন না থাকলেও, তা লেখকের অনুমতি না থাকার অর্থ নয়। বরং সাধারণ নিয়ম হলো, কারো লেখা তার অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা অনুচিত।

৩. আপনার কিতাবের শুরুতেই স্বীকারোক্তি: আপনি লিখে দিয়েছেন যে, তথ্যগুলো বিভিন্ন জায়গা থেকে সংকলিত। এটি একটি সততা ও আমানতদারিতার পরিচায়ক। কিন্তু এই স্বীকারোক্তি আপনাকে অন্য কারো লেখা হুবহু কপি করার অনুমতি দেয় না। বরং আপনি যদি ঘটনাটি নিজের ভাষায় লিখতেন এবং শেষে উল্লেখ করতেন যে, "এই ঘটনাটি কুরআনের অমুক সূরায় বর্ণিত, এবং আমি অমুক বই বা ওয়েবসাইট থেকে ধারণা নিয়েছি", তাহলে তা আরও উত্তম হতো।

সমাধান ও পরামর্শ

আপনার জন্য উত্তম পন্থা হলো:

১. নিজের ভাষায় লেখা: ঘটনাটি আপনি কুরআন ও হাদীস থেকে পড়ে নিন। তারপর তা নিজের ভাষায়, নিজের মতো করে লিখুন। এতে আপনার লেখা মৌলিক হবে এবং অন্য কারো অধিকারও আপনি লঙ্ঘন করবেন না।

২. উদ্ধৃতি ও রেফারেন্স: যদি আপনি সুনির্দিষ্ট একটি ওয়েবসাইটের লেখার ধরণ বা তথ্য ব্যবহার করতেই চান, তাহলে তা উদ্ধৃতি চিহ্ন (" ") এর মধ্যে লিখুন এবং শেষে উৎস উল্লেখ করে দিন। যেমন: "উক্ত ঘটনা অমুক ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত" অথবা "অমুক গ্রন্থ থেকে সংকলিত"।

৩. অনুমতি নেওয়া: সম্ভব হলে, সেই ওয়েবসাইটের লেখক বা পরিচালকের কাছ থেকে ইমেইল বা অন্য কোনো মাধ্যমে ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে নিন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অজানা লেখকের কাছ থেকে অনুমতি না নিলেও, কুরআনের ঘটনা নিজের ভাষায় লেখা উত্তম।

ফিকহী রেফারেন্স

  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.): এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, অন্য কারো বই বা লেখার অংশ বিশেষ অনুমতি ছাড়া নেওয়া জায়েয নয়, যদি না তা এমন সাধারণ বিষয় হয় যা সবার জানা।
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী দা. বা.): তিনি বলেন, বর্তমান যুগে কপিরাইট ও মেধাস্বত্ব একটি বৈধ অধিকার। এর লঙ্ঘন করা জায়েয নয়।
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনু আবিদীন রহ.): এতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কোনো বই লিখে, তার ওপর অন্যদের অধিকার নেই যতক্ষণ না তিনি অনুমতি দেন।

সারসংক্ষেপ

আপনি যদি ঘটনাটি নিজের ভাষায় ও বিন্যাসে লেখেন, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। বরং আপনি শুরুতে যে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, তা আরও সুন্দর হবে। কিন্তু যদি আপনি অন্য কারো লেখা হুবহু কপি করে আপনার কিতাবে দেন, তাহলে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে অনুচিত হবে, যদিও আপনি স্বীকার করে থাকেন যে তথ্যগুলো সংকলিত।

আপনার জন্য পরামর্শ

  • ঘটনাটি কুরআন থেকে সরাসরি পড়ে নিজের ভাষায় লিখুন।
  • প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বা ভাষ্য নিজের মেধা থেকে যোগ করুন।
  • কিতাবের শুরুতে লিখুন: "এই কিতাবে কুরআন, হাদীস ও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ থেকে সংকলিত তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। প্রয়োজনে উৎস উল্লেখ করা হয়েছে।"

এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে আপনার কিতাব হবে মৌলিক, আমানতদারিতার পরিচায়ক এবং শরীয়তসম্মত।

আল্লাহ তাআলা আপনার ইলমী কাজকে কবুল করুন এবং এতে উম্মতের জন্য কল্যাণ দান করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.