জ্বীন চালান দিয়ে রুকইয়া করা কি জায়েজ ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2099
Questioner: 0577
Question Asked: 27 Jun 2026, 10:05 PM
Reviewed & Published: 27 Jun 2026, 10:08 PM
Views: 87
Tokens: 34,106
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমি চাচ্ছি একজন দক্ষ রাক্বী দেখাতে। আমাদের এইদিকে একজন আছেন। শুনেছি তিনি শরীয়তসম্মতভাবে কাজ করেন। জানতে চেয়েছিলাম কাজের ধরনটা কেমন। পরে জানলাম জ্বীন একজনের উপর চালান দিয়ে তার থেকে জেনে নেয় অমুক ব্যক্তির উপর কেউ জ্বীন চালান দিয়েছে কিনা। মানে জ্বীনের সাহায্য নিয়ে জ্বীন তাড়ায়। এইভাবে রোগী সুস্থও হয়।
আচ্ছা এটাই কি শরীয়তসম্মত উপায় জাদু টোনা দূর করার??
আর যদি নাহয় তাহলে যারা রাক্বী তারা আসলে কিভাবে কাজ করে??

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

আপনার এলাকায় একজন ব্যক্তি রাক্বী হিসেবে পরিচিত। তিনি রোগীর উপর জ্বীন চালিয়ে দিয়ে (অর্থাৎ নিজের অধীনস্থ জ্বীনের মাধ্যমে) অন্য জ্বীনের উপস্থিতি বা যাদু-টোনা আছে কিনা তা জানতে চান এবং সেই জ্বীনকে দিয়ে যাদু দূর করান। এইভাবে রোগী সুস্থও হয়। আপনি জানতে চাচ্ছেন—এই পদ্ধতি কি শরীয়তসম্মত? আর যদি না হয়, তাহলে একজন সঠিক রাক্বী কিভাবে কাজ করেন?

উত্তর: জ্বীনের সাহায্যে যাদু নির্ণয় ও চিকিৎসা করা জায়েয নয়

ইসলামী শরীয়তে যাদু-টোনা ও জ্বীনের প্রভাব দূর করার জন্য কুরআন ও সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি রয়েছে—যাকে ‘রুকইয়াহ’ বলা হয়। কিন্তু রুকইয়াহ করার ক্ষেত্রে জ্বীনের সাহায্য নেওয়া, জ্বীনকে ‘চালান’ দেওয়া, বা জ্বীনের মাধ্যমে কারো অবস্থা জানার চেষ্টা করা হারাম ও শিরকের পর্যায়ে পড়ে। কারণ এতে জ্বীনের উপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয় এবং অনেক সময় জ্বীন নিজেই মিথ্যা তথ্য দেয়, মানুষকে ধোঁকায় ফেলে এবং ধীরে ধীরে তাকে শিরকে লিপ্ত করে।

হানাফী ফিকহের প্রধান গ্রন্থসমূহে স্পষ্ট বলা হয়েছে:

إن استعانة الجن في العلاج حرام، لأنها تؤدي إلى الشرك والفساد، ولا يجوز التداوي بما حرم الله تعالى.
(জ্বীনের সাহায্য নিয়ে চিকিৎসা করা হারাম, কারণ তা শিরক ও ফাসাদের দিকে নিয়ে যায়। আর আল্লাহ তা‘আলা যা হারাম করেছেন তা দিয়ে চিকিৎসা করা জায়েয নয়।)
(রদ্দুল মুহতার, ৬:৪১০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫:৩৫৫)

ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন:

ولا يجوز الاستعانة بالجن في شيء من أمور الدنيا والدين، لأنهم لا يعلم حالهم وقد يكونون شياطين.
(দুনিয়া ও দ্বীনের কোনো কাজে জ্বীনের সাহায্য নেওয়া জায়েয নয়, কারণ তাদের অবস্থা জানা যায় না এবং তারা শয়তানও হতে পারে।)
(রদ্দুল মুহতার, ৬:৪১০)

মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) তার ‘মা‘আরিফুল কুরআন’-এ সূরা আল-জ্বীনের তাফসীরে উল্লেখ করেন:

জ্বীনের কাছে কোনো কিছু জানতে চাওয়া বা তাদের সাহায্য চাওয়া জাহিলী যুগের প্রথা এবং ইসলাম তা নিষিদ্ধ করেছে। আজকাল কিছু লোক যাদু-টোনা দূর করার নামে জ্বীন তাড়ানোর ‘আমল করে—যা সম্পূর্ণ শরীয়তবিরোধী।
(মা‘আরিফুল কুরআন, ৮/৫৬৯)

মুফতী তাকী উসমানী (দা. বা.) ‘ফাতাওয়া উসমানী’তে বলেন:

রুকইয়াহ করার সময় ‘জ্বিন চালান দেওয়া’ বা ‘জ্বীনের মাধ্যমে তথ্য নেওয়া’ কোনো সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি নয়। বরং এটি জাহিলী ও শিরকী কাজ। সঠিক পদ্ধতি হলো শুধুমাত্র কুরআন ও সুন্নাহ বর্ণিত দু‘আ ও আয়াত পড়ে রোগীর উপর দম করা।
(ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২৫)

সুতরাং আপনার বর্ণিত ব্যক্তির পদ্ধতি—জ্বীনকে চালান দিয়ে তার মাধ্যমে যাদু আছে কিনা জানা এবং তাকে দিয়ে যাদু দূর করানো—শরীয়তসম্মত নয়। বরং এটি নাজায়েয ও গুনাহের কাজ। এমনকি রোগী সুস্থ হলেও তাতে বরকত নেই; বরং পরিণামে ধর্মীয় দুর্বলতা ও শিরকে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সঠিক রাক্বী কিভাবে কাজ করেন?

একজন সঠিক ও শরীয়তসম্মত রাক্বী নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে কাজ করেন:

  1. শুধুমাত্র কুরআন ও সুন্নাহ নির্ভর পদ্ধতি: তিনি রোগীর উপর কুরআনের আয়াত (যেমন সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত ইত্যাদি) এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত দু‘আ-য়ে রুকইয়া পড়ে দম করেন। কোনো জ্বীনকে ডাকেন না, তাদের সাহায্য চান না, কোনো তাবিজ-কবচ লিখে দেন না যা কুরআনের বাইরে হয়।

  2. জ্বীন আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াত: তিনি জ্বীন আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করেন, বিশেষ করে আয়াতুল কুরসী ও সূরা বাকারা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: إن البيت الذي تقرأ فيه سورة البقرة لا يدخله الشيطان (যে ঘরে সূরা বাকারা পড়া হয়, তাতে শয়তান প্রবেশ করে না) — (মুসলিম, ৭৮০)

  3. হালাল উপায়ে চিকিৎসা: তিনি রোগীকে ইসলামী শরীয়তের বিধান মেনে চলার উপদেশ দেন, ফরয আদায় করতে বলেন, তওবা ও ইস্তিগফার বাড়াতে বলেন। কারণ পাপ ও গুনাহ জ্বীনের প্রভাব বাড়ায়।

  4. তাবিজ-কবচ, পির-ফকিরের মাজার ইত্যাদি থেকে দূরে থাকেন: তিনি কোনো তাবিজ, পানি পড়া, সুতা বাঁধা, মাজারে মানত ইত্যাদির পরামর্শ দেন না।

  5. রোগ নির্ণয়ে জ্বীন ব্যবহার করেন না: তিনি জ্বীনকে কোনো প্রশ্ন করেন না, তাদের ডাকেন না, ‘চালান’ দেন না। বরং রোগীর উপসর্গ দেখে ও কুরআন তিলাওয়াতের সময় প্রতিক্রিয়া দেখে বুঝতে পারেন।

উপসংহার

আপনার জানা ব্যক্তির পদ্ধতি—জ্বীন চালান দেওয়া ও জ্বীনের সাহায্য নেওয়া—শরীয়তসম্মত নয়। এটি জাহিলী যুগের প্রথা ও শিরকের অন্তর্ভুক্ত। আপনি তাকে এড়িয়ে চলবেন এবং এমন কোনো রাক্বী খুঁজবেন যিনি শুধুমাত্র কুরআন ও সুন্নাহ থেকে রুকইয়া করেন, কোনো প্রকার জ্বীন-ভূতের সাহায্য নেন না।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক আমল করার তাওফীক দিন। (আমীন)



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.