"স্ত্রীর মামীর সাথে পর্দার বিধান কি? জানতে চাই?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
সংক্ষিপ্ত বিবরণ
আপনার মামী (স্ত্রীর মামার স্ত্রী) আপনার স্বামীর জন্য মাহরাম নন। তাই আপনার স্বামীর তার সাথে পর্দা পালন করা wajib (আবশ্যক)। হাসপাতালে প্রয়োজনের তাগিদে স্বল্প সময়ের জন্য সীমিত কথা বলা বৈধ হলেও, পরবর্তীতে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তার দিকে তাকিয়ে সাধারণ কথা বলা গুনাহের কাজ। এতে আপনার স্বামী ও মামী উভয়েরই পাপ হবে।
বিস্তারিত কারণ ও দলিল
১. মামী (স্ত্রীর মায়ের বোন) কি মাহরাম?
পবিত্র কুরআনে মাহরামদের তালিকা সূরা নিসা (৪:২৩)-এ উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—
"তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতা, কন্যা, বোন, ফুফু, খালা, ভাইয়ের কন্যা, বোনের কন্যা... এবং তোমাদের স্ত্রীদের মাতা..."
এই তালিকায় স্ত্রীর খালা (মায়ের বোন) বা স্ত্রীর ফুফু (বাবার বোন) অন্তর্ভুক্ত নেই। হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব রদ্দুল মুহতার-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—
"স্ত্রীর খালা ও ফুফু স্বামীর জন্য অমাহরাম (নামাহরাম)। তাদের সাথে পর্দা করা wajib।"
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭০, দারুল কুতুব ইলমিয়্যা)
ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী দা.বা.)-এও অনুরূপ ফতোয়া রয়েছে—
"স্ত্রীর খালা ও ফুফু স্বামীর জন্য অমাহরাম। তাই স্বামী তার দিকে (প্রয়োজন ছাড়া) তাকাতে পারবে না, তার সাথে নিরর্থক কথা বলতে পারবে না এবং উভয়ের জন্য পর্দা করা আবশ্যক।"
(ফাতাওয়া উসমানী, ৭/২৫৭)
২. অমাহরামের দিকে তাকানো ও কথা বলার বিধান
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
"মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নিচু করে রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।"
(সূরা নূর, ২৪:৩০)
হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
"তোমার দৃষ্টি যেন দ্বিতীয়বার (ইচ্ছাকৃতভাবে) না পড়ে। প্রথমবার (অনিচ্ছাকৃত) তাকানো মাফ, কিন্তু দ্বিতীয়বার তাকানো তোমার জন্য জায়েজ নয়।"
(আবু দাউদ, তিরমিযী; সহীহ)
ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.)-এ উল্লেখ আছে—
"অমাহরাম মহিলার দিকে ইচ্ছাকৃতভাবে তাকানো, তার সাথে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলা—এ সবই হারাম ও কবীরা গুনাহ।"
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩৪০)
৩. প্রয়োজনের সময় (হাসপাতালে) কী বিধান?
হাসপাতালে আপনার মামী আপনার সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে আপনার স্বামীর সাথে তার প্রয়োজনীয় যোগাযোগ (যেমন আপনার অবস্থা বোঝানো, চিকিৎসকের নির্দেশ জানানো ইত্যাদি) অনিবার্য ছিল। ফিকহের মূলনীতি হলো—
"প্রয়োজন নিষিদ্ধকে বৈধ করে, কিন্তু শুধু প্রয়োজনের পরিমাণ পর্যন্ত।"
(আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়ির, ইবনে নুজাইম; কায়দা: الضرورة تقدر بقدرها)
সুতরাং হাসপাতালে প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত কথা বলা জায়েজ ছিল, তবে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও তাকানো বৈধ নয়। আর আপনার স্বামী যে পরবর্তীতে শুধু কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তার দিকে তাকিয়ে কথা বলেন, তা প্রয়োজনের আওতায় পড়ে না; বরং তা অপ্রয়োজনীয় ও গুনাহের কাজ।
৪. আপনার (স্ত্রী) উপস্থিতি কি কোনো সুযোগ দেয়?
আপনার উপস্থিতি থাকলেও আপনার স্বামীর জন্য আপনার মামী অমাহরামই থাকেন। আপনার উপস্থিতি তাকে অমাহরামের দিকে তাকানো বা নিরর্থক কথাবার্তা বলার অনুমতি দেয় না। বরং তখনও পর্দার বিধান বলবৎ থাকে। ফাতাওয়া আলমগীরী-তে আছে—
"যদি স্ত্রী তার স্বামী ও মাহরাম নন এমন কোনো মহিলার মাঝে উপস্থিত থাকে, তবুও স্বামীকে সেই মহিলার দিকে ইচ্ছাকৃতভাবে তাকানো বা অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।"
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৭)
ব্যবহারিক নির্দেশনা
১. আপনার স্বামীকে বোঝান যে আপনার মামী তাঁর জন্য অমাহরাম। তাই তিনি সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে কথা বলবেন না। প্রয়োজন হলে পর্দার আড়ালে বা ফোনে সীমিত কথাবার্তা বলতে পারেন। ২. কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাইলে আপনার মাধ্যমে মামীকে জানিয়ে দিন অথবা কোনো মাহরাম পুরুষ (যেমন মামীর স্বামী বা ছেলে) থাকলে তার মাধ্যমে বলুন। ৩. ভবিষ্যতে যেকোনো অমাহরাম নারীর সাথে অনুরূপ আচরণ থেকে বিরত থাকুন। নামাজের মাধ্যমে তওবা ইস্তেগফার করুন।
শেষ কথা
আপনার মামী ছিলেন অমাহরাম। হাসপাতালে প্রয়োজনের কথা বৈধ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তাকে লক্ষ্য করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা বা আকস্মিক কথাবার্তায় লিপ্ত হওয়া—এতে গুনাহ হবে। উভয়ের উচিত আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং ভবিষ্যতে পর্দা মেনে চলা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পর্দার বিধান পালনের তাওফিক দান করুন। আমীন।