বিশ্বকাপ খেলা দেখা কি জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: বিশ্বকাপ খেলা দেখা কি জায়েজ? (Hanafi মাযহাব অনুযায়ী)
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين
সাধারণভাবে ফুটবল খেলা দেখা যেতে পারে যদি তাতে কোনো নিষিদ্ধ কাজ না থাকে। কিন্তু বিশ্বকাপসহ বর্তমান যুগের পেশাদার ফুটবল ম্যাচ দেখার সাথে অনেক নিষিদ্ধ বিষয় জড়িত। সেগুলোর কারণে এটি দেখা জায়েজ নয় বরং গুনাহের কাজ। নিচে হানাফি ফিকহের কিতাব ও উলামায়ে কেরামের মতামতের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
১. কোরআন ও হাদিসের দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ
"এবং তোমরা মিথ্যা কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকো।" (সূরা হজ: ৩০)
অনেক ফুটবল ম্যাচে মিথ্যা, ধোঁকা, প্রতারণা (ডাইভিং, সিমুলেশন) থাকে, যা এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ لَعِبَ بِالنَّرْدَشِيرِ فَكَأَنَّمَا غَمَسَ يَدَهُ فِي لَحْمِ الْخِنْزِيرِ
"যে নারদশীর (পাশার খেলা) খেলে, সে যেন তার হাত শূকরের গোশতে ডুবালো।" (সহিহ মুসলিম)
কিন্তু ফুটবল খেলায় জুয়া ও বাজি (বেটিং) খুবই সাধারণ ব্যাপার। বিশ্বকাপের সময় বিশ্বব্যাপী বিলিয়ন ডলারের বাজি ধরা হয়। এমন পরিবেশে খেলা দেখা জুয়া ও হারামকে সমর্থন করার শামিল।
আরেক হাদিসে এসেছে:
إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ الْخَمْرَ وَالْمَيْسِرَ وَالْكُوبَةَ
"নিশ্চয় আল্লাহ মদ, জুয়া, দাফ ইত্যাদি হারাম করেছেন।" (সুনানে আবু দাউদ)
"কূবা" শব্দ দ্বারা অনেক মুফাসসির লটারি, খেলার বাজি ও মিউজিক বোঝান। ফুটবল ম্যাচে মিউজিক, জাতীয় সঙ্গীত বাজানো ও অন্যান্য অশ্লীলতা থাকে।
২. হানাফি ফিকহের কিতাবের দলিল
ফতোয়ায়ে উসমানী:
মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম ফুটবলসহ পেশাদার খেলা দেখার ব্যাপারে লিখেছেন:
"আজকাল অধিকাংশ খেলার সাথে গান-বাজনা, মেয়েদের অশ্লীল পোশাক, জুয়া, সময় নষ্ট ও নামাজের ব্যাপারে উদাসীনতা জড়িত। তাই মুসলমানের জন্য এগুলো দেখা জায়েয নয়।" (ফতোয়ায়ে উসমানি, ২/২৯৮)
ইমদাদুল ফতোয়া:
আশরাফ আলী থানভি রহ. লিখেছেন:
"যে খেলায় শরয়ি কোনো গন্ডি লঙ্ঘিত হয় না এবং না হয় ওয়াজিব ত্যাগ করার কারণ হয়, তাহলে তা জায়েয। কিন্তু বর্তমানের খেলাগুলোতে এসব পাওয়া যায় না।" (ইমদাদুল ফতোয়া, ৫/৪৫৫)
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন):
ইমাম ইবনে আবেদিন রহ. বলেছেন:
"যে খেলা দ্বীনি ফরজ থেকে গাফিল করে দেয় এবং গুনাহের কাজে লিপ্ত করে, তা হারামের কাছাকাছি।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৪৬৮)
বেহেশতি জেওর:
মাওলানা আশরাফ আলী থানভি রহ. স্পোর্টস দেখার অনুমতি দিয়েছেন শুধু যদি সেটা শরীরচর্চার জন্য হয় ও কোনো শরয়ি বিধান ভঙ্গ না হয়। বিশ্বকাপ দেখা সে শর্ত পূরণ করে না।
ফতোয়ায়ে আলমগিরি (হিন্দিয়া):
এতে বলা হয়েছে:
"যদি কোনো খেলা দেখার কারণে নামাজ কাযা হয় বা গুনাহের কাজ হয়, তাহলে তা দেখা জায়েয নয়।" (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, ৫/৩৫২)
৩. বিশ্বকাপ দেখার সাথে জড়িত হারাম উপাদানসমূহ
১. জুয়া ও বাজি (বেটিং): অধিকাংশ ম্যাচেই বাজি ধরা হয়। এতে সরাসরি গুনাহ।
২. গান-বাদ্য ও মিউজিক: মাঠে ও সম্প্রচারে মিউজিক বাজে, যা হারাম।
৩. অশ্লীল পোশাক ও দৃশ্য: মাঠে ও সম্প্রচারে মেয়েলোকের অশ্লীল পোশাক দেখা যায়।
৪. সময়ের অপচয়: ফরজ নামাজ, পরিবারের হক, ইলম অর্জন ইত্যাদি থেকে গাফেল করে।
৫. জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা ও ক্রোধ: অনেক খেলায় ঝগড়া-বিবাদ, গালিগালাজ হয়।
৬. নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা: স্টেডিয়ামে ও টিভি পর্দায় নারী-পুরুষের অশোভন মিশ্রণ দেখা যায়।
এসব কারণে দুনিয়ার অধিকাংশ হানাফি মুফতি ও আলেম বিশ্বকাপ ফুটবল দেখা নাজায়েজ বলেছেন।
৪. ব্যতিক্রম কী হতে পারে?
যদি কোনো চ্যানেলে একেবারেই মিউজিক না থাকে, বাজি না থাকে, বিজ্ঞাপনে অশ্লীলতা না থাকে, এবং দর্শক নিজের নামাজ ও ফরজ দায়িত্ব অক্ষুণ্ন রাখেন—তবে শুধু খেলার দৃশ্য দেখা জায়েজ হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে তা সম্ভব নয়।
এজন্য ইমাম আবু হানিফা রহ. ও ইমাম কাজী খান রহ. বলেছেন:
كَرِهُوا النَّظَرَ إِلَى لَعِبِ الصِّبْيَانِ بِالْجَوْزِ وَالْخُصَى إِذَا كَانَ فِيهِ ضَرْبٌ وَجِدَالٌ فَكَيْفَ بِمَا هُوَ أَعْظَمُ
"শিশুদের জুয়া ও কলহের খেলা দেখাও মাকরুহ, তাহলে আরো বড় খেলার কী অবস্থা হবে?" (আল-ফতোয়াল হিন্দিয়া, ৫/৩৫৪)
৫. সঠিক সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ
সুতরাং হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী বিশ্বকাপ ফুটবল দেখা জায়েজ নয়। কেননা এতে নিশ্চিতরূপে নিষিদ্ধ উপাদান বিদ্যমান। মুসলমানের উচিত এ ধরনের খেলা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা। বরং সময় ও শক্তিকে দ্বীনি ইলম অর্জন, পরিবারের দায়িত্ব পালন এবং হালাল বিনোদনে ব্যয় করা।
নিম্নোক্ত হানাফি স্কলাররা এর পক্ষে মত দিয়েছেন:
- মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ.
- মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.
- মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ.
- মুফতি তাকি উসমানী দামাত বারাকাতুহুম
- মুফতি রশীদ আহমদ লুধিয়ানবী রহ.
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের পথে চলার তাওফিক দান করুন।
والله أعلم بالصواب