হায়েজ শেষে হালকা রক্ত ইস্তিহাযা কিনা, ইস্তিহাযা অবস্থায় নামায পড়ার নিয়ম।
Taharah Purity · Hanafi
Question
আমার শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে সবসময়ই অল্প ব্লিডিং থাকে। ওষুধ খেলে গত মাসের শেষে বন্ধ হলে, এ মাসের ১ তারিখ থেকে হায়েজ হয় । কিন্তু, হায়েজ শেষে ৭ম দিন থেকেই এখনো অব্দি অল্প কালচে ব্লিডিং সবসময়ই দেখা দেয়। এখন ডাক্তার ওষুধ দিয়েছেন, বলেছেন এর কারণে কয়দিন পর পিরিয়ড শুরু হবে। অর্থাৎ এখন তো হালকা ব্লিডিং হচ্ছে সেটা চলমান। পরে প্রোপারলি ব্লিডিং হবে যেটা আসলেই পিরিয়ড। এখন আমার প্রশ্ন হলো আমার পিরিয়ড পরবর্তী ১৫ দিন অতিক্রম হয়ে গেছে। তাই এখন কি আমি পিরিয়ড হিসেবে ধরে নিব? নাকি কিছুদিন পর স্বাভাবিক পিরিয়ডকেই ধরব। আমি আলাদা করে সে সময়টা বুঝতে পারি কারণ সেসময় অতিরিক্ত ব্লিডিং, পেট ব্যাথাসহ এই লক্ষণ গুলো থাকে।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনার মাসিকের স্বাভাবিক নিয়ম হলো: প্রতি মাসের ১ তারিখ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত হায়েজ হয়। তারপর ওষুধ সেবনের কারণে কিছু দিন বন্ধ থাকে। বর্তমানে গত মাসের শেষে ওষুধ খেয়ে হায়েজ বন্ধ হওয়ার পর এ মাসের ১ তারিখ থেকে আবার হায়েজ শুরু হয়েছে (সম্ভবত ৭ দিন স্থায়ী ছিল)। হায়েজ শেষ হওয়ার ৭ম দিন অর্থাৎ প্রায় ১৪ তারিখ থেকে এখন পর্যন্ত হালকা কালচে রক্তস্রাব চলছে। ডাক্তার বলেছেন, ওষুধের প্রভাবে কয়েকদিন পর প্রকৃত পিরিয়ড (প্রচুর রক্ত ও ব্যথাসহ) শুরু হবে। এখন আপনার প্রশ্ন: যেহেতু শেষ পিরিয়ডের (১-৭ তারিখ) পর ১৫ দিন অতিক্রম করেছে, তাই কি বর্তমান হালকা স্রাবকে পিরিয়ড গণ্য করবেন? নাকি অপেক্ষা করে অতিরিক্ত রক্ত ও ব্যথাসহ আসল পিরিয়ডকেই ধরবেন?
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
- হায়েজের ন্যূনপরিমাণ: ৩ দিন, সর্বোচ্চ: ১০ দিন। এর বেশি রক্তস্রাব ইস্তিহাযা (অজু ভঙ্গের কারণ, কিন্তু নামায-রোযা বাধ্যতামূলক)।
- পবিত্রতার ন্যূনপরিমাণ (তুহর): দুটি হায়েজের মাঝে কমপক্ষে ১৫ দিন সম্পূর্ণ পবিত্র থাকতে হবে। যদি ১৫ দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই রক্ত দেখা যায়, তা ইস্তিহাযা বলে গণ্য।
- অভ্যাস (আদাত): যে নারীর মাসিকের একটি নির্দিষ্ট অভ্যাস আছে (যেমন প্রতি মাসে নির্দিষ্ট তারিখে নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত হায়েজ হয়), তার জন্য সেই অভ্যাসই মান্য হবে। হায়েজের অভ্যাসের দিনগুলোতে রক্ত আসুক বা না আসুক, সেগুলো হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে এবং বাকি দিনের রক্ত ইস্তিহাযা।
- তাময়িজ (পার্থক্য): যদি নির্দিষ্ট অভ্যাস না থাকে অথবা অভ্যাস বিনষ্ট হয়ে যায়, তাহলে রক্তের গুণাগুণ (ঘন/পাতলা, কালো/লাল, দুর্গন্ধ/গন্ধহীন) দেখে হায়েজ ও ইস্তিহাযা আলাদা করা যায়। তবে অভ্যাস থাকলে তাময়িজ নয়, অভ্যাসই প্রাধান্য পায়। (রদ্দুল মুহতার, ১/৪৪০; ফাতাওয়া উসমানী, ১/২২৭; বেহেশতি জেওর, ২য় খণ্ড)
আপনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ:
- আপনার অভ্যাস অনুযায়ী প্রতি মাসের ১-৭ তারিখ পর্যন্ত হায়েজ হয়। এই মাসেও ১-৭ তারিখ হায়েজ হয়েছে বলে ধরে নিচ্ছি (যেহেতু আপনি ৭ তারিখে হায়েজ শেষ হওয়ার কথা বলেছেন)।
- হায়েজ শেষ হওয়ার ৭ম দিন (অর্থাৎ ১৪ তারিখ) থেকে হালকা কালচে রক্ত আসা শুরু হয়েছে। এটি ইস্তিহাযা। কারণ:
- এটি আপনার অভ্যাসের দিন (১-৭) নয়।
- এটি পূর্ববর্তী হায়েজের (১-৭) পরবর্তী পবিত্রতার দিনগুলোতে পড়েছে, কিন্তু যেহেতু আপনি পুরোপুরি পবিত্র ছিলেন না (হালকা রক্ত আসছে), তাই পবিত্রতার ১৫ দিন পূর্ণ হয়নি। তাই এই রক্ত নতুন হায়েজ হতে পারে না।
- ডাক্তারের মতে ভবিষ্যতে যে ভারী রক্ত ও ব্যথাসহ পিরিয়ড হবে, সেটিও হায়েজ নয় যদি তা আপনার অভ্যাসের দিনের বাইরে ঘটে এবং পূর্ববর্তী হায়েজের পর ১৫ দিন পূর্ণ পবিত্রতা না থাকে। বরং সেটিও ইস্তিহাযা।
- কিন্তু যদি আপনার অভ্যাস পরিবর্তন হয়ে যায় (যেমন ওষুধের কারণে ৭ তারিখের পর আরও রক্ত আসে এবং তা টানা ১০ দিন পর্যন্ত হয়ে যায়), তাহলে নতুন করে অভ্যাস নির্ধারণ করতে হবে। তবে আপনার বর্ণনায় অভ্যাস এখনও বিদ্যমান (১-৭ তারিখ হায়েজ হয়েছে)।
সুতরাং আপনার করণীয়:
- বর্তমান হালকা স্রাবকে পিরিয়ড গণ্য করবেন না। এটি ইস্তিহাযা। তাই আপনি নামায পড়বেন, রোযা রাখবেন, কুরআন তিলাওয়াত করতে পারবেন। প্রত্যেক ফরয নামাযের জন্য নতুন অজু করতে হবে।
- অভ্যাস (১-৭ তারিখ) অনুযায়ীই হায়েজ গণ্য করুন। অর্থাৎ আপনি এই মাসের ১-৭ তারিখ পর্যন্ত হায়েজ হিসেবে বিবেচনা করবেন। এরপরের সব রক্ত ইস্তিহাযা।
- ভবিষ্যতে ডাক্তারের দেওয়া ওষুধের পর যে ভারী রক্ত ও ব্যথা হবে, সেটি সম্ভবত প্রকৃত পিরিয়ড নয়; বরং ইস্তিহাযা। তবে যদি ওই রক্ত আসার পর তা টানা ৩ দিন থেকে ১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং পূর্ববর্তী হায়েজ শেষে আপনি ১৫ দিন সম্পূর্ণ পবিত্র (কোনো রক্ত নেই) থাকতে পারেন, তাহলেই কেবল সেটি নতুন হায়েজ হবে। যেহেতু বর্তমানে আপনি সম্পূর্ণ পবিত্রতা পাচ্ছেন না (হালকা রক্ত চলছে), তাই এই ভারী রক্তও ইস্তিহাযা।
- যদি আপনার অভ্যাস অনিয়মিত হয়ে যায় (যেমন পরবর্তী মাসে ১ তারিখে রক্ত না এসে অন্য সময় আসে), তাহলে আপনি রক্তের গুণাগুণ (ভারী/হালকা, ব্যথাসহ/নির্বিকার) ও অভ্যাসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করবেন। এ জন্য একজন আলিমের পরামর্শ নিন।
সংক্ষেপে: বর্তমান হালকা কালচে স্রাব ইস্তিহাযা। আপনি আপনার অভ্যাস (প্রতি মাসের ১-৭ তারিখ) অনুযায়ী হায়েজ গণ্য করুন। ডাক্তারের কথিত আসল পিরিয়ডের জন্য অপেক্ষা করে তা হায়েজ ধরবেন না; বরং অভ্যাসই মান্য করুন। যদি অভ্যাস পরিবর্তন হয়, তবে তাময়িজ (পার্থক্য) ও অভ্যাসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবেন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার, ১/৪৪০-৪৪১
- ফাতাওয়া উসমানী, ১/২২৭-২৩০
- বেহেশতি জেওর, ২য় খণ্ড (হায়েজ ও ইস্তিহাজার অধ্যায়)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/১৬৮