স্বপ্নে সমুদ্র দেখার পর ইউটিউবের ভিডিওতে "জাহান্নামে যাবে" শুনে ভীত? ইসলাম কী বলে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন যে, স্বপ্নে সমুদ্র দেখার পর একটি ইউটিউব ভিডিওতে শুনেছেন যে, সমুদ্র দেখার অর্থ মৃত্যুর পর জাহান্নামে যাওয়া—এতে তিনি ভীত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এরপর তিনি জানতে চান, যদি কেউ স্বপ্নের মাধ্যমে জাহান্নামে যাওয়ার ইঙ্গিত পায়, তাহলে তার কী করা উচিত?
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, স্বপ্নের ব্যাখ্যা একটি অনুমানমূলক বিষয়, নিশ্চিত জ্ঞান নয়। ইসলামী শরিয়ত স্বপ্নের ব্যাখ্যাকে এমন কোনো কঠিন ও চূড়ান্ত বিধান দেয়নি যা দ্বারা কেউ তার ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলবে। বরং স্বপ্নের ব্যাখ্যা নির্ভর করে ব্যক্তির অবস্থা, সময়, এবং ব্যাখ্যাকারীর জ্ঞানের ওপর। অনেক স্বপ্নের একাধিক অর্থ হতে পারে।
হাদিস শরিফে এসেছে:
"স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি প্রদর্শন, এবং (৩) মানুষের নিজের মনের কল্পনা।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৯২)
অতএব, কোনো স্বপ্ন দেখার পর তাৎক্ষণিকভাবে একটি নেতিবাচক ব্যাখ্যা গ্রহণ করে ভীত হওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে ইউটিউব বা সামাজিক মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত অপ্রমাণিত ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
সমুদ্র দেখার স্বপ্নের ব্যাপারে ইবনে সিরিন (রহ.)-এর মতো প্রসিদ্ধ মুফাসসিরিনের মতে:
- সমুদ্র দেখার বহু অর্থ হতে পারে: যেমন বাদশাহ, আলিম, দুনিয়া, সমৃদ্ধি, বা বড় বিপদ।
- কেউ কেউ বলেন, সমুদ্রে ডুবে যাওয়া পাপের ইঙ্গিত, কিন্তু তা চূড়ান্ত নয়।
- ইমাম ইবনে সিরিন (রহ.) স্বপ্নের ব্যাখ্যা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: "সমুদ্র রাজা বা শক্তিশালী শাসকের প্রতীক; আর যে কেউ সমুদ্রে ডুবে গেল, সে পাপাচারে নিমজ্জিত হবে।" (তাফসিরুল আহলাম, ইবনে সিরিন)
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, কেউ শুধু সমুদ্র দেখলেই সে জাহান্নামি হবে। বরং স্বপ্নের ব্যাখ্যা ব্যক্তির অবস্থা ও স্বপ্নের বিস্তারিত বিবরণের ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় সমুদ্র দেখার অর্থ হয় ইলম, সম্পদ, অথবা ভ্রমণ।
হানাফি ফিকহের আলোকে বিধান:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তার অনুসারীদের মতে, স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়া একটি বিশেষ জ্ঞান, যা সবাই করতে পারে না। সাধারণ মানুষের উচিত স্বপ্নের ব্যাখ্যার জন্য আলিম বা অভিজ্ঞ ব্যক্তির কাছে যাওয়া।
- হানাফি ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ "রদ্দুল মুহতার" -এ এসেছে: "স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কে কথা বলা জায়েজ, তবে তা নিশ্চিত জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে হতে হবে। যে ব্যক্তি স্বপ্নের ব্যাখ্যার জ্ঞান রাখে না, তার পক্ষে ব্যাখ্যা দেওয়া হারাম।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৫২)
সুতরাং, ইউটিউবের একটি ভিডিওতে একজন অজ্ঞ ব্যক্তি যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা বিশ্বাস করা বা ভয় পাওয়া উচিত নয়।
যদি কেউ স্বপ্নে ভীতিকর কিছু দেখে, তাহলে তার করণীয়:
১. আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়া: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যদি কেউ অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে, তাহলে সে যেন বাম দিকে থুতু ফেলে এবং আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় চায়। আর সে যেন কাউকে তা না বলে। তাহলে তা তার কোনো ক্ষতি করবে না।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫৮৪)
২. নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার দুআ পড়া: "বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মা'আসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামায়ি ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম" ইত্যাদি।
৩. নেক আমল বৃদ্ধি করা: বেশি বেশি নফল নামাজ, দান-সদকা, কুরআন তিলাওয়াত করা।
৪. আয়াতুল কুরসি ও সূরা আল-ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ে নিজের ঘর ও দেহে ফুঁ দেয়া।
৫. মনের ভয় দূর করার জন্য আলিমের কাছে সঠিক ব্যাখ্যা জানা।
সারকথা:
আপনার দেখা স্বপ্নের এই নেতিবাচক ব্যাখ্যা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে আসেনি। স্বপ্নে সমুদ্র দেখার অর্থ জাহান্নাম - এটি একটি ভুল ও ভীতিপ্রদ ব্যাখ্যা মাত্র। আপনি এতে ভয় পাবেন না। বরং উপরে বর্ণিত আমলগুলো করুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। আল্লাহ তাআলা বলেন: "যারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তাদের জন্য তিনিই যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক, ৬৫:৩)
উল্লেখযোগ্য হানাফি কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলি থানভি)
- বেহেশতি জেওর (মুফতি থানভি)
- তা’লিমুল ইসলাম (হানাফি ফিকহ)