জন্মদিনে রোজা রাখা জায়েজ কি, ইসলামে জন্মদিন পালনের বিধান,
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার মেয়ের ১বছর পূর্ণ হবে সে উপলক্ষে আমি রোজা রাখতে চাইছি সাথে বাসায় খাবার বানিয়ে এতিমদের খাওয়াতে চাইছি।সেরকম কি করা যাবে?
Answer
প্রশ্ন: আমার মেয়ের ১ বছর পূর্ণ হবে সে উপলক্ষে আমি রোজা রাখতে চাইছি সাথে বাসায় খাবার বানিয়ে এতিমদের খাওয়াতে চাইছি। সেরকম কি করা যাবে?
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আপনার মেয়ের ১ বছর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে আপনি রোজা রাখা এবং এতিমদের খাওয়ানোর যে ইচ্ছা পোষণ করছেন, এ সম্পর্কে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে নিম্নরূপ বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
জন্মদিন পালনের ইসলামি বিধান
ইসলামে জন্মদিন বা বার্ষিকী উদযাপনের কোনো নির্দিষ্ট বিধান নেই। সাহাবায়ে কেরাম ও সালফে সালেহীন থেকে জন্মদিন পালনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে যদি কোনো ব্যক্তি শুকরিয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে নফল ইবাদত (রোজা, দান-সদকা) করে, তাহলে তা ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় হতে পারে, তবে শর্ত হলো তা কোনো বিশেষ দিনকে উৎসব হিসেবে পালন করার নিয়তে না করা।
রোজা রাখা প্রসঙ্গে
আপনি আপনার মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষ্যে নফল রোজা রাখতে চান। ইসলামে নফল রোজা রাখার জন্য বছরের নির্দিষ্ট কিছু দিন (যেমন: সোমবার ও বৃহস্পতিবার, আইয়ামে বীজের রোজা, শাওয়ালের ছয় রোজা, আশুরার রোজা প্রভৃতি) ছাড়াও সাধারণভাবে যেকোনো দিন (নিষিদ্ধ দিন ব্যতীত) নফল রোজা রাখা জায়েজ আছে।
তবে এখানে মনে রাখতে হবে যে, রোজাটি যেন শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও শুকরিয়া আদায়ের জন্য হয়। একে "জন্মদিনের রোজা" হিসেবে নামকরণ না করাই উত্তম। বরং আপনি নিছক নফল রোজা হিসেবে রাখবেন।
হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি একদিন নফল রোজা রাখে, আল্লাহ তার ওপর জাহান্নামের আগুন থেকে সত্তর বছরের দূরত্ব সৃষ্টি করে দেন।" (বুখারি, মুসলিম)
এতিমদের খাওয়ানো প্রসঙ্গে
এতিমদের খাওয়ানো অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা এতিমদের প্রতি সদয় আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন:
﴿فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ﴾ (সূরা আদ-দুহা: ৯) অর্থ: "সুতরাং এতিমের প্রতি তুমি কঠোর হয়ো না।"
এবং হাদিসে এসেছে: "আমি এবং এতিমের তত্ত্বাবধায়ক জান্নাতে এভাবে (দুই আঙুল মিলিয়ে দেখিয়ে) থাকব।" (বুখারি)
সুতরাং, আপনি নিম্নোক্তভাবে করতে পারেন:
১. আপনার মেয়ের ১ বছর পূর্ণ হওয়ায় আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায়ের নিয়তে একটি নফল রোজা রাখতে পারেন। একে "জন্মদিনের রোজা" না বলে শুধু নফল রোজা মনে করবেন।
২. এতিমদের খাওয়ানো একটি উত্তম কাজ। আপনি বাসায় খাবার বানিয়ে এতিমদের খাওয়াতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন, এটি যেন কোনো উৎসব বা আনন্দ উদযাপনের চেহারা না নেয়, বরং এটি যেন শুকরিয়া ও সওয়াবের নিয়তে হয়।
তবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি:
১. জন্মদিন পালনকে কোনো ধর্মীয় উৎসব বা ইবাদতের অংশ মনে করা যাবে না। ২. বড় ধরণের আয়োজন বা খরচ করা ঠিক হবে না। ৩. শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য শুকরিয়া স্বরূপ এ কাজগুলো করা ভালো। ৪. জন্মদিনের কেক কাটা, মোমবাতি নেভানো ইত্যাদি অমুসলিমদের সংস্কৃতি থেকে আগত রীতিনীতি পরিহার করা উচিত।
ফাতাওয়া ও হানাফি কিতাবের আলোকে মতামত
ফাতাওয়া উসমানি (১/৪২৮)-তে উল্লেখ আছে: "জন্মদিন উদযাপন করা বিদআত বা হারাম হওয়ার তেমন কোনো প্রমাণ নেই, তবে একে উৎসব হিসেবে পালন করা এবং এতে অমুসলিমদের অনুকরণ করা মাকরুহ (অপছন্দনীয়)। কিন্তু শুকরিয়া আদায়ের জন্য দান-সদকা ও নফল ইবাদত করা জায়েজ আছে।"
রদ্দুল মুহতার (১/৫৫২)-এ উল্লেখ আছে: "নফল রোজা যেকোনো দিন রাখা জায়েজ, তবে এমন দিনে রাখা মাকরুহ যেদিন রোজা রাখা নিষিদ্ধ (যেমন: ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, আইয়ামে তাশরিক)।"
উপসংহার
আপনার মেয়ের ১ বছর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের জন্য রোজা রাখা এবং এতিমদের খাওয়ানো ইসলামি দৃষ্টিতে জায়েজ ও প্রশংসনীয়। তবে খেয়াল রাখবেন, এ যেন কোনো উৎসব বা নবপ্রবর্তিত রীতি হিসেবে না হয়, বরং এটি যেন শুধুমাত্র আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হয়।
والله تعالى أعلم بالصواب