ব্যাংকিং সিস্টেম নিয়ে কিছু প্রশ্ন
Halal and Haram · Hanafi
Question
১। আমি যদি ১লক্ষ টাকা কোনো ব্যাংকে ইনভেস্ট করি আর সেখান থেকে মাসে মাসে যদি আমাকে কোণো লাভ ডেওয়া হয় ১লাখের উপর তাহলে কি তা সুদ হবে?কারন আমি ১ লাখ ইনভেস্ট করেছি।
২। যদি এমনটা করা যায় তাহলে আমাকে কিছু ইসলামি শরিয়াভিত্তক কিছু ব্যাংকের তালিকা দিলে ভালো হতো।
৩। যদি ব্যাংক থেকে এভাবে মাসে মাসে টাকা নেয়া হারাম হয় তাহলে কি আমি কোনো ব্যবসায় ইনভেস্ট করতে পারবো আর সেখান থেকে মাসে মাসে টাকা নিতে পারবো কি?
Answer
উত্তর: ব্যাংকিং সিস্টেম নিয়ে প্রশ্ন
১. ব্যাংকে টাকা রেখে মাসিক লাভ নেওয়ার বিধান
উত্তর: আপনি যদি কোনো প্রচলিত (কনভেনশনাল) ব্যাংকে ১ লক্ষ টাকা জমা রাখেন এবং ব্যাংক আপনাকে নির্দিষ্ট হারে মাসিক লাভ (যেমন: ৬% বা ৭% হারে) দেয়, তাহলে তা সুদ (রিবা) হিসেবে গণ্য হবে এবং তা হারাম। কারণ ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট হারে পূর্বনির্ধারিত লাভ নেওয়া স্পষ্ট সুদ।
দলিল:
- কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: "আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং দান-সদকাকে বৃদ্ধি করেন" (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৬)।
- হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "সুদের সব রূপই হারাম" (সহিহ মুসলিম)।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, নির্দিষ্ট হারে পূর্বনির্ধারিত লাভ (Fixed Return) সুদের অন্তর্ভুক্ত এবং তা হারাম (রদ্দুল মুহতার, ৪/১৮৭)।
স্পষ্টীকরণ: আপনি যখন ব্যাংকে টাকা রাখেন, তখন ব্যাংক আপনার টাকা ব্যবহার করে এবং আপনাকে নির্দিষ্ট হারে লাভ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এটি মূলত ঋণ (Qard) যা লাভের শর্তে দেওয়া, যা স্পষ্ট সুদ। আপনার মূলধন ১ লক্ষ টাকা এবং এর উপর অতিরিক্ত কিছু নেওয়া সুদ।
২. ইসলামী শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকের তালিকা
প্রচলিত ব্যাংকে টাকা রেখে সুদ নেওয়া হারাম, তবে ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত ব্যাংকে (Islamic Bank) বিনিয়োগ করতে পারেন, যেখানে লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্ব (Mudaraba/Musharaka) ভিত্তিতে কাজ করা হয়। নিচে কিছু ইসলামী ব্যাংকের নাম দেওয়া হলো:
| ক্রম | ব্যাংকের নাম | |------|-------------| | ১ | ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড | | ২ | শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড | | ৩ | ফার্স্ট সিকিউরিটিজ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড | | ৪ | সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড | | ৫ | আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড | | ৬ | ইউনিয়ন ব্যাংক (ইসলামিক উইন্ডো) | | ৭ | সিটি ব্যাংক (ইসলামিক উইন্ডো) | | ৮ | ব্যাংক এশিয়া (ইসলামিক উইন্ডো) |
সতর্কতা: ইসলামী ব্যাংক হলেও নিশ্চিত হতে হবে যে তারা পুরোপুরি শরিয়াহ কমপ্লায়েন্ট কিনা এবং তাদের লেনদেন প্রকৃত মুদারাবা/মুশারাকা ভিত্তিক কিনা। অনেক সময় ইসলামী ব্যাংকের নাম থাকলেও বাস্তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে শরিয়াহ লঙ্ঘন হতে পারে।
৩. ব্যবসায় ইনভেস্ট করে মাসিক লাভ নেওয়ার বিধান
উত্তর: হ্যাঁ, আপনি কোনো হালাল ব্যবসায় (যেমন: দোকান, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি) ইনভেস্ট করতে পারেন এবং সেখান থেকে মাসিক লাভ নিতে পারেন, তবে শর্ত হলো:
- লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্ব: বিনিয়োগের উপর নির্দিষ্ট হারে লাভ (যেমন: মাসে ৫% ফিক্সড) নেওয়া যাবে না। বরং প্রকৃত লাভের একটি অংশ (Percentage) নির্ধারণ করে নিতে হবে।
- মুদারাবা/মুশারাকা চুক্তি: আপনি যদি কোনো ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করেন এবং ব্যবসা পরিচালনা করেন অন্য কেউ, তবে লাভের শতাংশ নির্ধারণ করে দেওয়া বৈধ। কিন্তু লোকসান হলে আপনি বহন করবেন, ব্যবসায়ী নয় (সে তার শ্রমের বিনিময় পাবে না)।
- গ্যারান্টি নয়: মাসিক নির্দিষ্ট টাকা নেওয়ার গ্যারান্টি দেওয়া যাবে না। বরং প্রকৃত লাভের ভিত্তিতে টাকা দিতে হবে। যদি মাসিক আয় ফিক্সড হয় এবং লোকসানের ঝুঁকি না থাকে, তাহলে তা সুদের মতো হয়ে যাবে।
দলিল:
- কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: "আল্লাহ ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন" (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫)।
- হাদিসে নবী (সা.) বলেছেন: "লাভ নির্ধারিত হবে চুক্তি অনুযায়ী" (সুনান আবু দাউদ)।
- ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে, মুদারাবা চুক্তিতে লাভের শতাংশ নির্ধারণ করা বৈধ (কিতাবুল আসল, ৩/৩০)।
সুন্নাহ সম্মত বিকল্প পদ্ধতি
আপনি যদি মাসিক আয় চান, তাহলে নিম্নলিখিত পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন:
- ইসলামী ব্যাংকের মুদারাবা সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্ট: এখানে লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে কাজ করা হয়, নির্দিষ্ট লাভ নয়।
- রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ: দোকান বা বাড়ি কিনে ভাড়া দেওয়া, যা মাসিক আয় দেয় এবং এটি হালাল।
- হালাল ব্যবসায় অংশীদারিত্ব: কোনো কোম্পানির শেয়ার ক্রয় যেখানে লভ্যাংশ (Dividend) দেওয়া হয় প্রকৃত লাভের ভিত্তিতে।
উপসংহার
- প্রচলিত ব্যাংকে টাকা রেখে নির্দিষ্ট হারে মাসিক লাভ নেওয়া হারাম (সুদ)।
- ইসলামী ব্যাংক বাছাই করার সময় শরিয়াহ কমপ্লায়েন্ট কিনা যাচাই করুন।
- ব্যবসায় ইনভেস্ট করে মাসিক আয় নেওয়া জায়েজ যদি এটি অংশীদারিত্ব ভিত্তিক হয় এবং নির্দিষ্ট ফিক্সড রিটার্ন না হয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিকের পথে চলার তাওফিক দান করুন।