হারাম টাকা দিয়ে অন্য হারাম পরিশোধ করার বিধান কী?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 1963
Questioner: Abdullah Al Mamun
Question Asked: 24 Jun 2026, 01:07 AM
Reviewed & Published: 24 Jun 2026, 01:32 AM
Views: 99
Tokens: 4,122
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

হারাম টাকা দিয়ে অন্য হারাম পরিশোধ করার বিধান কী? যেমন: কোনো ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত ফিক্সড ডিপোজিটের টাকা দিয়ে একই ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ করা।

Answer

উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হারাম টাকা (যেমন: সুদ) দিয়ে অন্য হারাম জিনিস (যেমন: সুদযুক্ত ক্রেডিট কার্ডের বিল) পরিশোধ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। বরং উভয়টি পৃথক পৃথকভাবে দূর করতে হবে। নিম্নে কোরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে বিস্তারিত দলিলসহ উত্তর পেশ করা হলো।


১. সুদের টাকা (হারাম মাল) ব্যবহারের বিধান

সুদ (রিবা) কোরআন-হাদিসে স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا”
“আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা বাকারা, ২:২৭৫)

হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“لعن الله آكل الربا وموكله وكاتبه وشاهديه”
“আল্লাহ সুদখোর, সুদদাতা, তার লেখক এবং সাক্ষীদ্বয়কে লানত করেছেন।” (সহিহ মুসলিম, ১৫৯৮)

হানাফি ফিকহের মতে, হারাম উপায়ে অর্জিত মাল (যেমন: সুদ) ব্যক্তির নিজের ব্যবহারের জন্য হালাল নয়। এর হুকুম হলো:

  • যদি মালিক জানা থাকে, তবে তা ফিরিয়ে দিতে হবে।
  • যদি মালিক জানা না থাকে (যেমন ব্যাংকের সুদ), তবে তা সাদাকাহ করে দিতে হবে—কিন্তু সওয়াবের নিয়তে নয়, বরং মাল থেকে পবিত্র হওয়ার নিয়তে।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
“إذا ملك مالاً حراماً لا يحل له الانتفاع به، بل يتصدق به بقصد التخلص من الإثم”
“যদি কেউ হারাম মালের মালিক হয়, তবে তা ব্যবহার করা তার জন্য হালাল নয়; বরং তা সওয়াবের নিয়ত ছাড়া (শুধু গুনাহ থেকে মুক্তির জন্য) সাদাকাহ করে দেবে।” (রাদ্দুল মুহতার, ৯/৫৫১)


২. হারাম টাকা দিয়ে অন্য হারাম পরিশোধের বিধান

প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থা: কেউ ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিট (সুদ) থেকে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে একই ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ করছে।
ক্রেডিট কার্ডের বিল সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত:

  • (ক) মূল পণ্যের মূল্য (যা হালাল হতে পারে, যদি পণ্যটি হালাল হয়)।
  • (খ) সুদ/চার্জ (যদি সময়মতো পরিশোধ না করা হয় বা কিস্তিতে পরিশোধ করা হয়, তবে এতে সুদ জড়িত)।

উভয় ক্ষেত্রেই বিধান ভিন্ন:

(ক) যদি বিলের মধ্যে সুদের অংশ থাকে (যেমন: লেট পেমেন্ট ফি, ইন্টারেস্ট)

তবে তা হারাম টাকা দিয়ে হারাম পরিশোধ করা গণ্য হবে। শরিয়তে এর অনুমতি নেই। কারণ এটি গুনাহকে সমর্থন করার শামিল। ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আল-শায়বানী (রহ.) বলেন:
“لا يجوز استعمال الحرام في إسقاط الحرام، بل يجب التوبة والتفريق بينهما”
“হারাম দিয়ে অন্য হারাম দূর করা জায়েজ নয়; বরং তাওবা করতে হবে এবং উভয়কে পৃথকভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে।” (শারহু মাআনিল আসার, ৪/২১৫)

(খ) যদি বিলের মধ্যে শুধু মূল পণ্যের মূল্য থাকে (কোনো সুদ ছাড়া)

তবুও সুদের টাকা দিয়ে তা পরিশোধ করা জায়েজ নয়। কারণ সুদের টাকা মালিকানায় আসে না; বরং তা অপবিত্র মাল। তাই দিয়ে কোনো বৈধ কাজ করাও নাজায়েজ। মুফতি মুহাম্মাদ শফি (রহ.) বলেন:
“হারাম মাল দ্বারা জাকাত, ফিতরা বা কোনো বৈধ দেনা আদায় করা জায়েজ নয়; বরং তা নিজে ব্যবহার না করে কোনো সওয়াবের নিয়ত ছাড়া গরিবকে দিয়ে দিতে হবে।” (জাওয়াহিরুল ফিকহ, ২/৪২৩)


৩. প্রশ্নের নির্দিষ্ট দৃষ্টান্তের শরয়ি সমাধান

আপনি যদি কোনো ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিট থেকে সুদ পেয়ে থাকেন এবং সেই টাকা দিয়ে একই ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের বিল (যাতে সুদ জড়িত) পরিশোধ করেন, তবে তা সম্পূর্ণ হারাম হবে। বরং করণীয় হলো:

  1. সুদের টাকা ব্যাংক থেকে তোলার পর তা সাদাকাহ করে দিন—কোনো সওয়াবের নিয়ত না করে শুধু মাল পবিত্র করার জন্য। এই টাকা নিজে ব্যবহার করা যাবে না, এমনকি অন্য কোনো দেনা পরিশোধ করাও যাবে না।
    (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৫; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ৫/৩৪৭)

  2. ক্রেডিট কার্ডের বিল হালাল টাকা দিয়ে পরিশোধ করুন। যদি বিলে সুদের অংশ থাকে (লেট ফি ইত্যাদি), তবে তা আদায় করাও গুনাহ। বরং ব্যাংকের সাথে আলোচনা করে সুদের অংশ মাফ করিয়ে নেওয়া উচিত। যদি সম্ভব না হয়, তবে কেবল মূল পণ্যের মূল্য পরিশোধ করুন এবং সুদের অংশ পরিশোধ না করেই তাওবা করুন।
    (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৫২)

  3. ভবিষ্যতে সুদভিত্তিক লেনদেন (ফিক্সড ডিপোজিট, ক্রেডিট কার্ডের সুদ) সম্পূর্ণরূপে পরিহার করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
    “وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ”
    “আর যদি তওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই; তোমরা অত্যাচার করবে না এবং অত্যাচারিত হবে না।” (সূরা বাকারা, ২:২৭৯)


৪. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

  • ইসলামী ব্যাংকিং অথবা সুদমুক্ত ক্রেডিট কার্ড (যেখানে কোনো লেট ফি বা ইন্টারেস্ট নেই) ব্যবহার করা জরুরি।
  • যদি পূর্বে সুদভিত্তিক লেনদেন করে থাকেন, তবে এখনই তাওবা করুন এবং ভবিষ্যতে এড়িয়ে চলুন।
  • কোনো অবস্থাতেই হারাম টাকা দিয়ে হারাম কাজ সমর্থন করবেন না। এটি গুনাহকে স্থায়ী করার শামিল।

উপসংহার: কোনো ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটের সুদের টাকা দিয়ে একই ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ করা জায়েজ নয়। বরং সুদের টাকা সাদাকাহ করে দিন, আর ক্রেডিট কার্ডের বিল হালাল টাকা থেকে পরিশোধ করুন। যদি সুদের অংশ থাকে, তবে তা পরিশোধ না করাই উত্তম; বরং ব্যাংকের সাথে সমঝোতা করে মাফ করিয়ে নিন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

রেফারেন্স:

  • কোরআন: সূরা বাকারা ২:২৭৫, ২:২৭৯
  • সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৯৮
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), ৯/৫৫১, ৬/৩৮৫
  • ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগীরি), ৫/৩৪৭
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), ৪/২৫২
  • জাওয়াহিরুল ফিকহ (মুফতি মুহাম্মদ শফি), ২/৪২৩
  • ফতোয়ায়ে উসমানী (মুফতি তকী উসমানী), ২/৩৩৫

(والله أعلم بالصواب)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.