ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকে কি আমার উপর জুলুম হচ্ছে নাকি আমি উনার উপর জুলুম করছি

Family Life · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 196
Questioner: Najifa Meem
Question Asked: 17 May 2026, 09:13 AM
Reviewed & Published: 17 May 2026, 11:34 AM
Views: 38
Tokens: 3,259
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার শাশুড়ী আম্মু মানুষটা অনেক ভালো | কারো সাতে - পাচে নেই | মানুষের উপকার ছাড়া অপকার করে না | আল্লাহ কে ভয় করে | মন মানসিকতা ভালো | আমাদের বাসায় ছুটা বুয়া রাখা আছে | উনার মাসিক বেতন ৫ হাজার টাকা | এর মধ্যে ২ হাজার টাকা আমি দেই বা কি ৩ হাজার টাকা আমার শশুড় আব্বু দেয় | বলে রাখা ভালো আমি ফ্রিল্যান্সিং করি | আমার শ্বাশুড়ী আম্মুর সব ভালো গুন থাকলেও সে কিন্তু নামায পড়ে না | নামায পড়ার কথা থাকলে বলে সংসারের চাপে আমার আর শরীর চলে না তাই নামায পড়তে পারি না | অথচ কাজের বুয়া সব কাজ করে দিয়ে যায় | রান্নাটা আমি করি | সম্প্রতি আমি গর্ভবতী হওয়ার কারনে , ১৫-২০ দিন যাবৎ সে রান্না করছে অথচ বিয়ের পর থেকে এই ৩ বছরে সে সংসারের কাজের চাপের দোহাই দিয়ে সে নামাজ পড়ে না | এ জন্য সে আমাকে দায়ী করে যে আমি কাজ কর্মে পটু হলে তাকে সংসারের এই চাপটা নেওয়া লাগতো না | আমি কাজ করতে গেলে সে কাজ আমার হাত থেকে নিয়ে যায় এই বলে যে আমি ছোটো মানুষ পারবো না | কিন্তু মানুষ তো কাজ করতে করতেই শেখে ! তারপরও রান্নাটা আমিই করতাম কারণ আমার হাজবেন্ড আমার হাতের রান্না পছন্দ করে | তার আমাকে এই কাজ থেকে দূরে রাখার কারনে আমার শ্বশুর বাড়ির অন্যান্য রা আমাকে খারাপ ভাবে যে আমি আমার শ্বাশুড়ীকে দিয়ে কাজ করাই | আমি এখন কি করবো ? কে এখানে জুলুমের শিকার ?

Answer

উত্তর:
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, নামায ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ত্যাগ করে, তাহলে সে কুফরীর সীমায় পৌঁছে যায়। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮২; ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১০৭৯) শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল ক্বাইয়্যিম, ইবনে বায, আলবানী, উসাইমীন, সালেহ আল-ফাওযান—সকলেই এ বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেন যে, নামায ত্যাগ করা বড় গুনাহ এবং তাওবা ছাড়া মাফ হয় না।

আপনার শাশুড়ি যে ‘সংসারের চাপ’ বা ‘শরীর চলে না’ বলে নামায পড়ছেন না, এটি কোনো গ্রহণযোগ্য ওযর নয়।

  • কাজের বুয়া থাকা সত্ত্বেও তিনি নামায না পড়ার অজুহাত দিচ্ছেন, অথচ তিনি রান্নার কাজও করছেন না (আগে আপনি করতেন, এখন গর্ভবতী হওয়ায় উনি করছেন)। সুতরাং তাঁর কাছে সময় আছে—শুধু ইচ্ছার অভাব।
  • আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয়ই নামায মুমিনদের উপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে।” (সূরা আন-নিসা: ১০৩) সময় ও শারীরিক সক্ষমতা থাকলে নামায পড়তেই হবে। অসুস্থ হলে বসে, শুয়ে, এমনকি ইশারায়ও পড়তে হবে—ছাড় দেওয়া হয়নি। (বুখারি, হাদীস নং ১১১৭)
  • শায়খ ইবনে বায (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি অলসতা বা ব্যস্ততার অজুহাতে নামায ছেড়ে দেয়, সে কাফির হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।” (মাজমু ফাতাওয়া, ১০/৭৪)
  • শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন: “দুনিয়ার কোনো কাজই নামায ত্যাগের অজুহাত হতে পারে না।” (আল-মুলাখ্খাস আল-ফিকহী, ১/১৪৫)

উপরন্তু, আপনার শাশুড়ি আপনাকে দায়ী করছেন যে আপনি ‘কাজে পটু’ হলে তাঁর চাপ কমত—এটা ভুল চিন্তা।

  • আপনি গর্ভবতী হওয়ার আগেও রান্না করতেন, এবং স্বামী আপনার রান্না পছন্দ করেন। তিনি নিজে কাজ না করে বরং আপনার হাত থেকে কাজ কেড়ে নিয়ে বলছেন ‘আপনি ছোটো মানুষ পারবে না’—এটা আসলে তাঁকে অলসতা ও নামায না পড়ার অজুহাত দিচ্ছে।
  • রাসূল (সা.) বলেন: “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (বুখারি, হাদীস নং ৮৯৩)

কে এখানে জুলুমের শিকার?

  • প্রধান জালিম (অত্যাচারী): আপনার শাশুড়ি, কারণ তিনি আল্লাহর হক (নামায) আদায় করছেন না, এবং তাঁর অপারগতার দায় আপনার উপর চাপাচ্ছেন।
  • আপনি (পুত্রবধূ) জুলুমের শিকার হচ্ছেন, কারণ আপনি সৎ ও পরিশ্রমী হওয়া সত্ত্বেও শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য সদস্যদের কাছে ‘শাশুড়িকে দিয়ে কাজ করানো’র অপবাদ পাচ্ছেন। অথচ বাস্তবতা উল্টো—শাশুড়ি আপনার কাছ থেকে কাজ কেড়ে নিচ্ছেন।
  • স্বামীও যদি এ বিষয়ে নীরব থাকেন, তবে তিনিও অত্যাচারীর অংশ। কারণ স্ত্রীকে রক্ষা করা এবং মায়ের অন্যায়কে প্রতিহত করা তাঁর দায়িত্ব।

আপনার করণীয়:

১. শাশুড়িকে নম্রভাবে ইসলামের গুরুত্ব বোঝান। বলুন: “আম্মু, আপনি অনেক ভালো মানুষ, কিন্তু নামায ত্যাগ করা খুব বড় গুনাহ। আল্লাহ আমাদের রিজিক ও স্বাস্থ্য দেন, তাঁর ইবাদতই আসল। কাজের বুয়া থাকা সত্ত্বেও আপনি নামায পড়ছেন না—এটা আল্লাহর কাছে জুলুম।” যদি তিনি না শোনেন, তাহলে স্বামী বা স্থানীয় আলেমের মাধ্যমে বুঝানোর চেষ্টা করুন।

২. স্বামীকে পরিষ্কার জানান: “আমি কাজ করতে চাই, কিন্তু আম্মু বাধা দেন। উনি নামায পড়ছেন না, এটা নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। শ্বশুরবাড়ির লোকজন আমাকে দোষ দিচ্ছে—দয়া করে আপনি সত্যিটা তাদের জানান।” স্বামীকে ইসলামের দৃষ্টিতে মায়ের ভুল সংশোধনের দায়িত্বও নিতে বলুন।

৩. শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সাথে বাস্তবতা শেয়ার করুন (যদি সম্ভব হয় নম্র ও হিকমতের সাথে)। বলুন: “আমি অনেক দিন কাজ করেছি, এখন গর্ভবতী, তাই আম্মু রান্না করছেন। আগেও আমি কাজ করতাম, আম্মু বাধা দিতেন। নামায না পড়ার বিষয়টি ইসলামের দৃষ্টিতে খুবই গুরুতর।”

৪. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: আপনি নিজে নামাযের প্রতি যত্নবান থাকুন। গর্ভবতী অবস্থায়ও নামায কখনো ছাড়বেন না। অসুবিধা হলে বসে বা শুয়েও পড়ুন। আপনার উদাহরণ শাশুড়ির জন্য প্রভাব ফেলতে পারে।

৫. দোয়া করতে থাকুন। আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর যারা ধৈর্য ধারণ করে, আমি তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব।” (সূরা আন-নাহল: ১২৬) ধৈর্য ধরুন, কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন।

উপসংহার:
আপনার শাশুড়ি নামায ত্যাগ করে নিজের ওপর জুলুম করছেন। আবার আপনাকে দায়ী করে তাঁর অন্যায়ের পর্দা করছেন। আপনি ন্যায়পরায়ণ ও পরিশ্রমী, আপনার প্রতি জুলুম হচ্ছে। তবে আপনার চেষ্টা হওয়া উচিত শাশুড়িকে নামাযে ফিরিয়ে আনা এবং নিজেকে অপবাদ থেকে মুক্ত করা। আল্লাহই সর্বোত্তম ফয়সালাকারী।

আল্লাহই তাওফিক দান করেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.