কাঁজি কি মদসদৃশ? হানাফি ফিকহ অনুযায়ী কাঁজি পান করা কি হালাল?
Food and Drink · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: কাঁজি পান করা হালাল কিনা ?
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على رسوله الأمين
প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
কিছু পরিমাণ ভাতের সাথে পানি মিশিয়ে একটি মাটির হাঁড়িতে ৩/৪ দিন কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখলে যে পানীয় তৈরি হয় তাকে ‘কাঁজি’ বলে। এতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া জন্মায় এবং চিকিৎসকের মতে এটি পেটের সমস্যার প্রাকৃতিক সমাধান। প্রশ্ন হলো— এই কাঁজি কি মদসদৃশ? এটি পান করা কি হালাল?
ইসলামি বিধান
ইসলামে মদ (খামর) ও যে কোনো নেশা-উদ্রেককারী পানীয় হারাম। হাদিসে এসেছে:
«كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ، وَكُلُّ خَمْرٍ حَرَامٌ»
“প্রত্যেক নেশা-উদ্রেককারী বস্তুই মদ, আর প্রত্যেক মদই হারাম।” (সহিহ মুসলিম, ২০০৩)
তবে ‘কাঁজি’ সরাসরি আঙ্গুর বা খেজুর থেকে তৈরি হয় না; এটি চালের পানি থেকে তৈরি হয়। তাই এটি ‘নাবীয’ (গম, যব, চাল, মধু ইত্যাদি থেকে তৈরি গাঁজানো পানীয়) শ্রেণিভুক্ত।
হানাফি ফিকহের মূলনীতি
হানাফি মাজহাবে নাবীয সম্পর্কে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত হলো— যদি তা নেশাগ্রস্ত না করে (অর্থাৎ অল্প পান করলে নেশা না হয় এবং বেশি পান করলেও নেশা না হয়) তবে তা হালাল। কিন্তু যদি বেশি পান করলে নেশা হয়, তবে সেই নাবীয পান করা হারাম, যদিও অল্প পরিমাণে নেশা না হয়। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার, ৬/৪৫২)
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, যে কোনো প্রকার নেশা-উদ্রেককারী পানীয় (সেটি আঙ্গুরের হোক বা অন্য কিছুর) অল্প-বিস্তর সব পরিমাণেই হারাম। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৭১)
পরবর্তী হানাফি ফকিহগণ (যেমন ইবনে আবিদিন) তাকওয়া ও সতর্কতার ভিত্তিতে ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪৫২)
কাঁজির বাস্তব অবস্থা
কাঁজি সাধারণত ৩-৪ দিনের গাঁজন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়। এতে অ্যালকোহলের পরিমাণ খুবই নগণ্য (প্রায় ০.৫-১% পর্যন্ত হতে পারে)। স্বাভাবিকভাবে এটি পান করলে নেশা হয় না—এমনকি বেশি পরিমাণ পান করলেও সাধারণত নেশা হয় না (যদি না অতিমাত্রায় অভ্যস্ত হয়)। তবে নির্দিষ্ট শর্তে (যেমন দীর্ঘ সময় ফার্মেন্টেশন করলে) অ্যালকোহলের পরিমাণ বাড়তে পারে এবং তা নেশাজনক হতে পারে।
হানাফি ফিকহের আলোকে ফয়সালা
১. যদি কাঁজি এমন হয় যে তা সাধারণত নেশা সৃষ্টি করে না (অর্থাৎ বেশি পরিমাণ পান করলেও মানুষ নেশাগ্রস্ত হয় না), তবে তা হালাল এবং পান করা জায়েজ। এক্ষেত্রে এটি মদসদৃশ নয়। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৫২২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩৫)
২. যদি কাঁজি এমন ঘনত্বের হয় যে তা বেশি পান করলে নেশা হয় (যেমন দীর্ঘদিন গাঁজানো হলে), তবে তা হারাম। অল্প পরিমাণেও পান করা জায়েজ হবে না। (আল-হিদায়া, ৪/৯৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৭০)
৩. চিকিৎসার প্রয়োজনে নেশাজনক না হলে পান করা জায়েজ। নেশাজনক হলে চিকিৎসার জন্যও তা গ্রহণ হারাম, যদি বিকল্প ওষুধ থাকে। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪৫৩)
মাসআলা: সাধারণভাবে বাজারে প্রচলিত কাঁজি (যা ২-৪ দিনের গাঁজনে তৈরি) নেশা করে না, তাই তা পান করা হালাল বলে অভিমত দেওয়া যায়। তবে নিজে বানালে সময় কম রাখা (২-৩ দিন) উচিত, যাতে অ্যালকোহল তৈরি না হয়।
উপসংহার
কাঁজি নিজে মদসদৃশ নয়; এটি একটি গাঁজানো পানীয়। হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে—
- যদি তা নেশা-উদ্রেক না করে, হালাল।
- যদি নেশা করে, হারাম।
উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য এটি পান করা জায়েজ, যতক্ষণ পর্যন্ত তা নেশাজনক না হয়। ডাক্তারের পরামর্শ ও স্বাভাবিক ব্যবহারে তা নিরাপদ এবং হালাল। তবে সতর্কতা হিসেবে নেশা ঘটার সম্ভাবনা থাকলে তা পরিহার করাই উত্তম।
والله أعلم بالصواب
রেফারেন্স:
- আল-হিদায়া (৪/৯৩)
- রদ্দুল মুহতার (৬/৪৫২-৪৫৩)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩৭০-৩৭১)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩৫)
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৫২২)
- সহিহ মুসলিম (২০০৩)