ফেসবুক আইডির নাম মিলিয়ে রাখা সম্পর্কে শরয়ী বিধান
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি আমার ফেসবুক আইডির নাম "ফিদায়ী ফুল" রেখেছি। এই নামটি আমি একজন আপুর আইডিতে দেখে পছন্দ করে রেখেছিলাম। পরে তিনি বলেছেন যে, এই নামটি তিনি নিজে বানিয়েছেন এবং আমি কেন তাঁর নাম ব্যবহার করেছি, আর এই নাম দিয়ে সে লেখালেখি করে, তার মতে মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে,
তবে আমি লক্ষ্য করেছি যে ফেসবুকে "ফিদায়ী ফুল" নামে আরও অনেক আইডি রয়েছে। আমার উদ্দেশ্য তাঁর পরিচয় ব্যবহার করা বা কাউকে বিভ্রান্ত করা ছিল না; শুধু নামটি ভালো লাগার কারণে রেখেছিলাম। এমনকি আমার প্রোফাইল ও তার প্রোফাইলের সাথে মিল নাই।
এক্ষেত্রে আমার দ্বারা কি তাঁর কোনো হক নষ্ট হয়েছে বা আমি কোনো গুনাহের কাজ করেছি?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো—আপনি ফেসবুকে "ফিদায়ী ফুল" নামটি পছন্দ করে রেখেছেন, যা আরেকজন বোন নিজের জন্য বানিয়ে ব্যবহার করছেন। তিনি আপত্তি জানিয়েছেন যে, এতে মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে এবং তিনি নিজেই নামটি তৈরি করেছেন। আপনি জানিয়েছেন যে, আপনার উদ্দেশ্য ছিল না তাঁর পরিচয় ব্যবহার করা বা কাউকে বিভ্রান্ত করা; শুধু নামটি ভালো লাগায় রেখেছিলেন। এখন জানতে চান—এতে কি তাঁর কোনো হক নষ্ট হয়েছে বা আপনি কোনো গুনাহের কাজ করেছেন?
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ
১. নামের মালিকানা ও ব্যবহারের বিধান:
ইসলামী ফিকহে সাধারণভাবে নাম বা উপাধি কারো একক মালিকানায় থাকে না, যদি না তা আইনগতভাবে ট্রেডমার্ককৃত বা বিশেষ স্বত্বাধীন হয়। তবে কোনো ব্যক্তি নিজে কোনো বিশেষ নাম বা উপাধি তৈরি করে ব্যবহার করলে, তা তার জন্য একটি ‘পরিচায়ক’ (identity) হিসেবে গণ্য হয়। শরিয়তে কারো পরিচয় জাল করা, প্রতারণা করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হারাম।
হাদিসে এসেছে,
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا
“যে আমাদেরকে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম, হা: ১০১)
২. আপত্তি উত্থাপিত হওয়ার পর করণীয়:
আপনার নিয়ত সঠিক থাকলেও, যেহেতু সংশ্লিষ্ট বোন আপত্তি জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে, নামটি তিনি নিজে তৈরি করেছেন এবং এতে মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে, তাই এ অবস্থায় নামটি পরিবর্তন করা আপনার জন্য উত্তম। ইসলামে ‘লা দারার ওয়ালা দিরার’ (কোনো ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিশোধও নেওয়া যাবে না) নীতি রয়েছে। অন্য কারো মানসিক অস্বস্তি বা বিভ্রান্তির কারণ হওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
বিশেষ করে ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমে একই নাম থাকলে প্রকৃতপক্ষেই অনেক সময় লোকজন বিভ্রান্ত হয়। যদিও আপনি তা চাননি, তবুও বাস্তবিক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তা পরিহার করাই শ্রেয়।
৩. পূর্বেকার ব্যবহারের বিধান:
আপনি যখন নামটি রেখেছিলেন তখন আপনি জানতেন না যে এটি কারো তৈরি ও একক ব্যবহারের জন্য। সুতরাং সেটি রাখার কারণে আপনার ওপর কোনো গুনাহ হবে না, ইনশাআল্লাহ। তবে এখন যখন বিষয়টি আপনার জানা গেছে এবং ওই বোন আপত্তি জানিয়েছেন, তখন নামটি পরিবর্তন করে অন্য কোনো ভালো নাম রাখা জরুরি।
৪. হক নষ্ট হওয়ার প্রশ্ন:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনি ওই বোনের প্রোফাইল বা পরিচয়ের সাথে মিলিয়ে কিছু করেননি, এবং আপনার প্রোফাইল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই তাঁর কোনো নির্দিষ্ট ‘হক’ (স্বত্ব) নষ্ট হয়েছে, তা বলা যাবে না। তবে ‘হক’ বলতে যদি বোঝানো হয় অন্যায়ভাবে তার সৃষ্ট নাম ব্যবহার করে মানসিক কষ্ট দেওয়া, তাহলে তা থেকে বাঁচার জন্য নাম পরিবর্তন করাই উত্তম।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেছেন:
لا يجوز التصرف في مال الغير بغير إذنه
“অন্যের সম্পদে তার অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা জায়েজ নয়।” (রদ্দুল মুহতার, ৪/৫০৩)
নাম সম্পদ না হলেও, এটি তার পরিচয়ের অংশ। তাই তাকে কষ্ট দেওয়া বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা জায়েজ নয়।
ফতোয়া ও নির্দেশনা
১. আপনি যদি এখনো নামটি পরিবর্তন না করে থাকেন, তবে অতি শীঘ্রই এটি পরিবর্তন করুন। তা না করলে ভবিষ্যতে ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি সৃষ্টির গুনাহ হতে পারে।
২. নাম পরিবর্তন করে এমন একটি নাম রাখুন যা সাধারণ ও অন্যদের সাথে সাদৃশ্যহীন—যাতে কোনো বিভ্রান্তি না হয়। যেমন—“ফুল” বা “ফিদায়ী” যেকোনো একটি শব্দ বদলে অন্য কিছু রাখতে পারেন।
৩. ওই বোনের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিন এবং বুঝিয়ে বলুন যে, আপনার কোনো দুরভিসন্ধি ছিল না। ইসলাম ভাই-বোনের মধ্যে সম্প্রীতি ও ক্ষমা স্থাপনকে উৎসাহিত করে।
হানাফি কিতাবের রেফারেন্স
- ফতোয়া উসমানী, ২/২৬৯: “কারো নাম বা উপাধি নকল করা যদি বিভ্রান্তির কারণ হয় তবে তা নাজায়েজ।”
- ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/২২৮: “নিয়ত ভালো থাকলেও যে কাজ অন্যের ক্ষতি বা অস্বস্তির কারণ হয়, তা পরিহার করা ওয়াজিব।”
- বাহিশ্তি জেওর, ২/৪৫: “মুসলিমের উচিত অন্যদের কষ্ট না দেওয়া, এমনকি নামের মাধ্যমেও নয়।”
সারকথা: আপনার পূর্বের কাজ গুনাহ ছিল না, কিন্তু এখন ওই বোনের আপত্তির পর নামটি পরিবর্তন করে নেওয়া জরুরি। তাহলে আপনি কোনো গুনাহ থেকে বেঁচে যাবেন এবং ভ্রাতৃত্বের হকও আদায় হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তওফিক দিন। (আমিন)