পড়ালেখার জন্য শারীরিক ভাবে শাস্তি দেওয়া।

Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 1930
Questioner: Hasan
Question Asked: 23 Jun 2026, 10:05 AM
Reviewed & Published: 23 Jun 2026, 10:09 AM
Views: 75
Tokens: 7,287
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একটি বালক মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করি। যেখানে নূন্যতম একটা সম্মানী/ বেতন দেওয়া হয় আমাকে। আমার মূল উদ্দেশ্য দ্বীনের খেদমত করা। কিন্তু সেখানে শিক্ষকতা করতে গিয়ে দেখলাম, স্টুডেন্ট আমার সাবজেক্টে পড়া পাড়ছে না। অনান্য সাবজেক্টে যে খুব একটা পারছে, তেমন নয়। তবে অনান্য শিক্ষকরা স্টুডেন্টদের শারীরিক ভাবে শাস্তি দেয়, এজন্য তাদের পড়া কিছুটা পারে। কিন্তু আমার সাবজেক্টে খুব কম পারে। আমি তাদের শারীরিক ভাবে শাস্তি না দিয়ে চেষ্টা করেছি, কিন্তু তারা আমার পড়া দিতে পারে না। তবে, শারীরিক ভাবে একটু বেশি শাস্তি দিলে তাঁরা পড়া দিতে পারে। এই বাচ্চাদের বয়স ১০-১৩ বছর। এভাবে কি শারীরিক ভাবে শাস্তি দিয়ে পড়া আদায়ের শরিয়াতের নূন্যতম অনুমতি রয়েছে? আমি কি চাকরিটা ছেড়ে দিব? এভাবে বাচ্চাদের শারীরিক ভাবে শাস্তি দেওয়া আমার জন্য কতটা অপরাধ? এটা কি তাদের প্রতি যুলুম? উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠানের কিছু নিয়ম-কানুন পরিবর্তন করলে হয়তোবা, শারীরিক ভাবে শাস্তি না দিয়ে পড়া আদায় করা যেত। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নিয়ম কানুন পরিবর্তনের সুযোগ আমার নেই। সর্বোপরি, এখন আমার করনীয় কি?

Answer

উত্তর: শারীরিক শাস্তি দিয়ে পড়া আদায়ের শরিয়তের বিধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
আপনি একটি বালক মাদ্রাসায় শিক্ষক, বেতন নেন, কিন্তু আপনার বিষয়ে ছাত্ররা পড়া আয়ত্ত করতে পারছে না। অন্যান্য শিক্ষক শারীরিক শাস্তি দিয়ে পড়া আদায় করেন, যা ফলপ্রসূ হচ্ছে। আপনি শাস্তি না দিয়ে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সফল হননি। বাচ্চাদের বয়স ১০-১৩ বছর। জানতে চান: শারীরিক শাস্তি দিয়ে পড়া আদায় করা কি শরিয়তসম্মত? এটি কি যুলুম? আপনার করণীয় কী?


১. শারীরিক শাস্তির শরিয়তের অনুমতি ও শর্তাবলী

ইসলামে শাস্তি হিসেবে মারধর করা নিষেধ নয়, তবে তা নির্দিষ্ট শর্তে এবং নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সীমিত। কেবলমাত্র ধর্মীয় ফরজ ও ওয়াজিব কাজে অবহেলার জন্য হালকা মারধরের অনুমতি রয়েছে, যেমন সালাত ত্যাগের ক্ষেত্রে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ، وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرٍ» “তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে সালাতের আদেশ দাও, এবং দশ বছর বয়সে (সালাত না পড়লে) তাদের প্রহার কর।”
(আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৯৫; আলবানী সহীহ বলেছেন)

এটি শুধু সালাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সাধারণ পড়াশোনা বা একাডেমিক বিষয়ের জন্য নয়। অন্যান্য ধর্মীয় দায়িত্ব (যেমন কুরআন শেখা, মৌলিক ফরজ ইলম) ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য হতে পারে যদি তা অবহেলা করা হয়, তবে তার জন্যও মারধর করা সর্বশেষ পদক্ষেপ।

মূলনীতি: শারীরিক শাস্তি তখনই জায়েয, যখন তা শিক্ষাদানের শেষ উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এবং নিম্নলিখিত শর্তসমূহ পালন করা হয়:

১. শাস্তির কারণ হতে হবে শরিয়ত সম্মত (যেমন ফরজ ত্যাগ, প্রকাশ্য নাফরমানি), পড়া না পারা বা মেধার ঘাটতি নয়।
আলোচ্য ক্ষেত্রে ছাত্ররা আপনার বিষয় পড়তে পারছে না, কিন্তু তারা অন্য বিষয়ে কিছুটা পারছে। এটি মেধা বা আগ্রহের অভাব, ইচ্ছাকৃত অবহেলা নয়। তাই শাস্তি দেওয়া যুলুম হবে।

২. শাস্তি হতে হবে মৃদু ও অহানিকর, চেহারায় বা স্পর্শকাতর অঙ্গে নয়।
ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
“শিক্ষক ছাত্রকে শাস্তি দিলে তা যেন তিনটি সীমানা অতিক্রম না করে:
(ক) খুব বেশি না হয় যাতে ক্ষতি হয়,
(খ) ক্রোধের বশবর্তী হয়ে না হয়,
(গ) যেন তাকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে হয়।”

(মাজমু‘ ফাতাওয়া, ২৮/৩০০)

৩. শাস্তি দানকারীর নিয়ত হতে হবে সংশোধন, প্রতিশোধ বা ক্ষোভ নয়।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন:
“শিশুদের শাসনে মূলনীতি হলো ভদ্রতা ও নম্রতা। প্রহার তখনই করবে যখন নরম পদ্ধতি কাজ না করে। আর প্রহারও হবে মৃদু, জখম না করে।”
(تحفة المودود ص ২৩১)

৪. শাস্তি দেওয়ার পর শিশুর মন তিক্ত না হয় বরং ভালোবাসা বজায় থাকে।

আপনার ক্ষেত্রে ছাত্রদের বয়স ১০-১৩ বছর। তাদেরকে শারীরিক শাস্তি দিয়ে পড়া আদায় করা শরিয়তের নীতির পরিপন্থী, কারণ:

  • এটি ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতা নয়, বরং শিক্ষণীয় অক্ষমতা/অনীহা।
  • এটি যুলুম, কারণ তাদের প্রতি জোরজবরদস্তি করা হচ্ছে এমন বিষয়ে যা তারা আয়ত্ত করতে পারছে না।
  • আপনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে শাস্তি দেওয়া আপনার জন্য অস্বস্তিকর এবং আপনি চান না। যদি বাধ্য হয়ে শাস্তি দেন, তবে তা হবে অন্যায়।

২. প্রতিষ্ঠানের নিয়মের প্রশ্ন ও আপনার করণীয়

আপনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম পরিবর্তনের সুযোগ নেই। কিন্তু আপনি যদি মনে করেন শাস্তি দেওয়া জরুরি এবং তা ছাড়া পড়া আদায় অসম্ভব, তবে আপনার উচিত:

ক) ছাত্রদের প্রতি দয়া ও терпение (ধৈর্য) সহকারে শিক্ষাদানের পদ্ধতি পরিবর্তন করা।

  • পড়ানোর পদ্ধতি আকর্ষণীয় করুন, গল্প, উদাহরণ, পুরস্কার দিন।
  • ছাত্রদের মানসিক অবস্থা বুঝে ধীরে ধীরে পড়ান।
  • ক্লাসের বাইরে আলাদাভাবে দুর্বলদের সময় দিন।

খ) শারীরিক শাস্তি ছাড়া অন্যান্য কার্যকর পদ্ধতি ব্যবহার করা, যেমন:

  • তিরস্কার (মৃদু),
  • বিশেষ কাজ দেওয়া,
  • মাতা-পিতাকে জানানো,
  • ভালো ছাত্রদের সম্মানিত করা।

গ) যদি প্রতিষ্ঠানের নিয়ম আপনাকে শাস্তি দিতে বাধ্য করে এবং আপনি তা এড়াতে না পারেন, তাহলে চাকরি ছেড়ে দেওয়া উত্তম, কারণ শারীরিক শাস্তি দেওয়া আপনার জন্য ক্রমাগত গুনাহের কারণ হবে।
রাসূল ﷺ বলেছেন:
«لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ»
“নিজের বা অন্যের ক্ষতি করা জায়েয নয়।”
(ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৩৪১; সহীহ)

আপনার মূল উদ্দেশ্য দ্বীনের খেদমত। যদি এই প্রতিষ্ঠানে থেকে খেদমত আদায় করতে গিয়ে আপনাকে শরিয়তবিরোধী কাজ করতে হয়, তাহলে অন্য কোনো উপায়ে দ্বীনের খেদমত করা ভালো। আল্লাহ অন্য পথ খুলে দেবেন।


৩. এটি কি যুলুম?

হ্যাঁ, একে যুলুম বলা হবে। কারণ:

  • ছাত্ররা স্বেচ্ছায় অলস বা অবাধ্য নয়; তারা আপনার বিষয়ে দুর্বল।
  • শাস্তি দেওয়ার নিয়ত থাকতে হবে সংশোধন, কিন্তু আপনি এখানে চাইছেন শুধু পড়া আদায় – যা সম্পূর্ণ একাডেমিক বিষয়।
  • অন্যান্য শিক্ষক যেভাবে শাস্তি দেয়, তা নবী ﷺ এর দেখানো পথ নয়। বরং শিক্ষায় ধৈর্য, দয়া ও উৎসাহের নির্দেশ আছে।

আল্লাহ বলেন:
«وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ»
“কেউ অন্যের পাপ বহন করবে না।”
(সূরা ফাতির ৩৫:১৮)

অর্থাৎ, আপনি যদি অন্যায় পদ্ধতি অবলম্বন করেন, তার দায়ভার আপনার ওপরই বর্তাবে।


৪. সালাফি/আহলে হাদীস আলেমদের ফাতাওয়া

শাইখ ইবন বাজ (রহ.) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: শিক্ষার্থীদের পড়া না পারলে প্রহার করা জায়েয কি? তিনি বলেন:
“প্রহার করা জায়েয নয়, বরং শিক্ষক উচিত ধৈর্য ধরা এবং শিক্ষার পদ্ধতি সহজ করা। যদি ছাত্র অবাধ্য হয় তবে হালকা শাস্তি দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু পড়া না পারার জন্য নয়।”
(মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবন বাজ, ৬/৩৯৭)

শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন:
“শিক্ষকের জন্য জায়েয নয় যে ছাত্রকে প্রহার করবে কেবলমাত্র পড়া না পারার কারণে। কারণ পড়া না পারা দুর্বলতার পরিচায়ক, অপরাধ নয়। বরং সে ছাত্রকে সাহায্য করা উচিত।”
(লিকা শাহরিয়yah, ২৬/৪২)

শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন:
“শাস্তি কেবল তখনই, যখন ছাত্র ফরজ বা ওয়াজিব ত্যাগ করে। পড়া না বুঝতে পারলে শাস্তি দেওয়া নয়, বরং তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে।”
(আল-মুনতাকা, ২/৩২৪)


৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও করণীয়

| করুন | করবেন না | |------|----------| | ১. শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ পরিহার করুন। | ১. শাস্তি দিয়ে পড়া আদায় করার চেষ্টা করবেন না। | | ২. পড়ানোর পদ্ধতি উন্নত করুন, দোয়া করুন, терпение করুন। | ২. প্রতিষ্ঠানের নিয়মের অজুহাতে অন্যায় চালিয়ে যাবেন না। | | ৩. প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের সাথে নরমভাবে কথা বলুন নিয়ম পরিবর্তনের জন্য। | ৩. নিজেকে বোঝাবেন না যে ‘সবাই করে তাই আমিও করি’। | | ৪. যদি নিয়ম পরিবর্তন সম্ভব না হয় এবং আপনাকে বাধ্য করা হয়, তাহলে চাকরি ছেড়ে দিন। | ৪. যুলুম করে ধর্মীয় খেদমতের নাম করবেন না। | | ৫. মনে রাখবেন, দ্বীনের খেদমত অনেক পথে সম্ভব। আল্লাহ আপনার নিয়্যত দেখবেন। | ৫. ছাত্রদের প্রতি রাগ ও হিংসা পোষণ করবেন না। |

সর্বোপরি: আপনার বিবেক যদি বলে এটি ঠিক নয়, এবং আপনি যদি শাস্তি না দিয়েই পড়াতে চান, তবে সেটিই ইসলামের পথ। আল্লাহ বলেন:
«وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا»
“যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন।”
(সূরা তালাক ৬৫:২)

আপনার মূল উদ্দেশ্য দ্বীনের খেদমত। আপনি যদি ন্যায় ও দয়ার পথে অটল থাকেন, আল্লাহ আপনার কাজে বারাকাহ দেবেন।

সংক্ষেপে
শারীরিক শাস্তি দিয়ে পড়া আদায় করা শরিয়তের দৃষ্টিতে অনুমোদিত নয়, বিশেষ করে যখন পড়া না পারা ইচ্ছাকৃত নয় বরং অক্ষমতা। এটি যুলুম। আপনি শাস্তি না দিয়ে শিক্ষাদানের বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করুন। প্রতিষ্ঠানের নিয়ম পরিবর্তন না হলে চাকরি ছেড়ে দেওয়া উত্তম, কারণ অন্যায় কাজে অংশগ্রহণ করা আপনার জন্য গুনাহ হবে। আল্লাহ ভয় করুন এবং ধৈর্য ধারণ করুন।

ওয়াল্লাহু আ‘লাম।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.